বিকল পিএস টার্ণের ২৪ ঘন্টা পর বরিশাল ত্যাগ

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ মেরামত এবং রক্ষনাবেক্ষনে সীমাহীন অবহেলা ও উদাসীনতায় চলা ‘পিএস টার্ণ’ জাহাজটি কারিগরি ত্রুটির কারনে বরিশাল বন্দরে বিকল হয়ে পরার প্রায় ২৪ঘন্টা পরে গতকাল পুনরায় যাত্রী পরিবহনে ফিরেছে। গত রবিবার বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ থেকে বরিশাল হয়ে ঢাকার উদ্যেশ্যে যাত্রা করার পরে নৌযানটির মূল ইঞ্জিনের টার্বো চার্জার অনেকটা অকার্যকর হয়ে পরে। ফলে নৌযানটির যাত্রা সীমিত করে রবিবার সন্ধায় বরিশালেই থামিয়ে দেয়া হয়। এতে করে দক্ষিনাঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক যাত্রী রবিবার চাঁদপুর ও ঢাকায় যেতে পারেন নি। গতরাতে নিয়মিত রকেট স্টিমার বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পরে ‘পিএস টার্ণ’ রাত সাড়ে ৮টার দিকে কিছু যাত্রী নিয়ে রওয়ানা হয়।
তবে রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান-বিঅইডব্লিউটিসি’র এ নৌযানটির সার্ভে সনদের মেয়াদ শেষ হয় গেছে আরো ৪মাস আগে। উপরন্তু গত প্রায় ১৮মাসে নৌযানটির কোন ডকিং করা হয়নি। ফলে দীর্ঘ দিনের পুরনো এ নৌযানটির খোল ও তলার অবস্থা কি তা বলতে পারছেন না সংস্থাটির করিগরি বিভাগও।
একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্বেও সময়মত ডকিং করে সার্ভে সনদ নবায়ন না করেই বিধি বহির্ভূতভাবে পিএস টার্ণ জাহাজটি এখনো যাত্রী পরিবহন করছে। সংস্থাটির অপর ৩টি প্যাডেল জাহাজও প্রায় একইভাবে ডকিং ও সার্ভে সনদ ছাড়াই প্রতিদিন শত শত যাত্রী পরিবহন করছে বলে জানা গেছে। এসব নৌযানে যাত্রী সুবিধাও ক্রমশ তলানীতে ঠেকেছে। অথচ এসব নৌযানের মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষনের পেছনে ব্যয়ের বহর দিন দিন স্ফিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সংস্থার যাত্রী সেবা (?) খাতের আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে এসব নৌযানের কথিত মেরামতের নামে।
অপরদিকে সংস্থাটির কারিগরি বিভাগ তার নৌযানগুলোর নিয়মিত মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষন সহ রুটিন মাফিক ডকিং করার ব্যাপারেও যথেষ্ঠ উদাসীন বলে অভিযোগ রয়েছে। কতিপয় প্রকৌশলী শুধুমাত্র ঢাকা ঘাটে এসব যাত্রীবাহী নৌযান জোড়াতালী দিয়ে সাচ্ছন্দ বোধ করেন সংস্থাটির যাত্রী সেবা ইউনিট সহ কারিগরি পরিদপ্তরও। এমনকি এসব নৌযান ডকিং ও সার্ভে সহ নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষনেও কোন কর্ম পরিকল্পনা নেই কারিগরি পরিদপ্তরের।
অথচ রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ ভ্রমন নিশ্চিত করা বিআইডব্লিউটিসি’র দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে মনে করেন সাধারন যাত্রীগন। সে লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সময়ে সংস্থাটিকে আর্থিক সহায়তাও প্রদান করে আসছে। কিন্তু এর পরেও সম্প্রতিককালে সংস্থাটি যাত্রী পরিবহন সেক্টরের প্রতি যথেষ্ঠ উদাসীন বলে অভিযোগ সাধারন যাত্রীদের।
বিশেষ করে সম্প্রতি বহরে ২টি স্ক্রু-হুইল যাত্রীবাহী নৌযান যুক্ত হবার পরে সংস্থাটির বাণিজ্য ও কারিগরি পরিদপ্তর প্যাডেল ৪টি জাহাজের প্রতি যথেষ্ঠ উদাসীন হয়ে পরেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ এসব প্যাডেল নৌযান বিশ্ব ঐতিহ্যের সমপর্যায়ের। এসব নৌযানের মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষনের পাশাপাশি যাত্রী সুবিধাও ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে। তবে ব্যয়ের বহর হ্রাস পায়নি। প্রতিটি নৌযান ডকিং ও সার্ভে নবায়ন সহ এর উপরি কাঠামোরও ব্যাপক মেরামত জরুরী। পাশাপাশি নৌযানগুলোর বিলুপ্ত যাত্রী সুবিধা সমূহ পুনরুদ্ধারের কোন বিকল্প নেই বলেও মনে করছেন সাধারন যাত্রীগন।
কিন্তু সংস্থার একটি কুচক্রী মহল বার বারই এসব নৌযান বিক্রী করে দেয়ার কথা বলছেন। এমনকি অতি সম্প্রতি পর্যটন করপোরেশনের কাছে একটি প্যডেলে জাহাজ ভাড়া দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানা গেছে। অথচ পিএস অস্ট্রিচ, পিএস লেপচা ও পিএস মাহসুদ জাহাজগুলো ১৯৯৫-৯৬সালে এবং পিএস টার্ণ জাহাজটি ২০০২সালে পূণর্বাসন ও আধুনিকায়ন করা হয়। এখনো এসব নৌযানের মূল ইঞ্জিনে তেমন কোন বড় ধরনের গোলযোগ না থাকলেও সংস্থার কারিগরি পরিদপ্তর সম্প্রতিককালে এসব নৌযান স্ক্রাপ করা সহ তা বন্ধ করে দেয়ার জন্য জোর তৎপড়তা শুরু করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অপরদিকে সম্প্রতি এমভি বাঙালী ও এমভি মধুমতি নামের যে দুটি নতুন যাত্রীবাহী নৌযান সংগ্রহ করা হয়েছে, তার জ্বালানী ব্যয় প্রায় দ্বিগুন, যাত্রী বহন ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। উপরন্তু নৌযান দুটির উপরী কাঠামো যাত্রী বান্ধব নয়। ফলে তাতে ভ্রমনে দিয়ে চালোনোতেই আগ্রহী বলেও অভিযোগ রয়েছে। নৌযানগুলোর পেছনে বিলÑভাউচার তৈরীতেই সাধারন যাত্রীদের আগ্রহও কম।