বিএম কলেজ ছাত্রীর লাশ ফেরিঘাটে ফেলে পালিয়েছে স্বামী

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের মাস্টার্স পরীক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জোহরা নামের এক ছাত্রীর লাশ ফেলে পালিয়েছে তার স্বামী। গত বুধবার দুপুরে মাওয়া ফেরিঘাটে এ্যাম্বুলেন্সে তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর পরই সেখান থেকেই পালিয়ে যান ঠিকাদার স্বামী তারেক সিকদার। ফলে ছাত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে পরিবার ও স্বজনদের মাঝে ব্যাপক রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। আত্মহত্যা নয়, ভাড়া বাসায় আটকে রেখে স্বামী তাকে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ নিহতের স্বজনদের।
এদিকে বুধবার রাত ২টায় এ্যাম্বুলেন্স চালকের সহযোগিতায় নিহতের মরদেহ বরিশালে নিয়ে আসে তার স্বজনরা। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে শেবাচিম হাসপাতালের মর্গে মরদেহ ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ।
নিহত ছাত্রী ফাতেমা তুজ জোহরা বাকেরগঞ্জ উপজেলার উত্তর কাটাদিয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সেলিম মোল্লার মেয়ে। সে বিএম কলেজে বাংলা বিভাগে মাস্টার্স শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিলো।
নিহতের ভাই আমিনুল ইসলাম জানান, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চাঁদকাঠি গ্রামের নাছির সিকদারের ছেলে তারেক সিকদারের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো ফাতেমা তুজ জোহরার। সেই সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে বছর খানেক পূর্বে নাছির ও ফাতেমা পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে করে।
এদিকে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ের সম্পর্ক মেনে নেয়নি ফাতেমা ও নাসিরের পরিবার। সেই সাথে ফাতেমা বরিশাল বিএম কলেজে অধ্যায়নরত থাকায় নগরের কলেজ রো এলাকার একটি ভবনে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত তারা। কিন্তু ফাতেমা ভাড়া বাসায় নিয়মিত বসবাস করলেও তার স্বামী তারেক ঠিকাদারী কাজ করায় মাঝে মধ্যে এখানে এসে থাকতেন।
নিহতের ভাই বলেন, গত ১০ মে মঙ্গলবার রাতে তারেক ভাড়া বাসায় আসে। সেখানে রাতে দু’ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তাদের পারিবারিক বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়। এর পর রাত ২টার দিকে হঠাৎ করেই তারেক মুঠোফোনে শ্বশুর বাড়িতে কল দিয়ে বলে ফাতেমা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। গুরুতর অবস্থায় তাকে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য এখানকার চিকিৎসকরা ফাতেমাকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেছে বলেও তার স্বজনদের জানান তারেক। তবে এর পরে বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারেকের সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি তারা।
তিনি আরো জানান, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সকালের দিকে ফাতেমাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় তারেক এবং তার দুই বন্ধু। মাওয়া ফেরিঘাট যাবার পূর্বে পথেই মৃত্যু হয় ফাতেমার। মাওয়া ফেরিঘাটে পৌঁছে ফাতেমার মৃত্যুর বিষয়টি বুঝতে পারে তার স্বামী সহ বাকি দু’জন। তখন তারা এ্যাম্বুলেন্সে লাশ রেখে পালিয়ে যায়।
বিষয়টি এ্যাম্বুলেন্স চালকের মাধ্যমে জানতে পারে ফাতেমার পরিবার। পরে এ্যাম্বুলেন্স চালকের সহযোগিতায় বুধবার রাত ২টায় ফাতেমার লাশ বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে নিয়ে আসলে জরুরী বিভাগের চিকিৎসক মৃত দেহ ময়না তদন্তের জন্য হাসপাতালের লাশ ঘরে সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।
নিহতের ভাই’র অভিযোগ ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত তার বোন জামাই তারেক ও তার দুই বন্ধু আত্মগোপনে রয়েছে। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরও বন্ধ। এমনকি তারেকের পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করা হলেওতারাও ফাতেমার মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে না। যে কারণে ফাতেমা আত্মহত্যা নয় তাকে গলায় ফাঁস দিয়ে স্বামী তারেক ও তার দুই বন্ধু হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেন নিহতের ভাই আমিনুল। এ ঘটনায় হত্যা মামলা করবেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে কোতয়ালী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইদুল হক বলেন, লাশের সুরত হালের পর ময়না তদন্ত করা হয়েছে। পরে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিহতের গলায় ফাঁসের চিহ্ন থাকলেও শরীরের কোথাও কোন আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার পরেও যেহেতু স্বামী এ্যাম্বুলেন্সে লাশ ফেলে রেখে পালিয়েছে তাই বিষয়টি বেশ সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। তবে ময়না তদন্তের রিপোর্ট পেলে হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। তাছাড়া নিহতের পরিবার থেকে মামলা বা অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহকারি অধ্যাপক ডা. আক্তারুজ্জামান তালুকদার বলেন, বিষয়টি খুবই ঝামেলা পূর্ণ মনে হচ্ছে। তাই প্রাথমিক ভাবে হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা বোঝা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভিসেরা সংরক্ষণ করা হয়েছে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে মৃত্যুর রহস্য বের করতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।