বিএম কলেজ ক্যাম্পাস ছাত্রনেতাদের অস্ত্রাগার

রুবেল খান॥ দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএম কলেজ ক্যাম্পাস অস্ত্রাগারে পরিণত করেছে ছাত্র নেতারা। ক্যাম্পাসে অবস্থিত ছাত্র সংসদ (বাকসু) ভবন থেকে শুরু করে প্রতিটি ছাত্রাবাসে হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ অস্ত্র। প্রশাসনিক সহ যে কোন ঝামেলা এড়াতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রলীগ নেতারা কলেজ ক্যাম্পাসকে নিরাপদ অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই ছোট খাট ঘটনায়ও এসব ভবন থেকে বেরিয়ে আসছে রামদা, ছুরি, চাপাতি সহ নানা ধরনের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই কলেজ প্রশাসনের। তবে কলেজের কতিপয় শিক্ষকের সহযোগিতায় রাজনীতিতে হাতে খড়ি দেয়া ঐতিহ্যবাহী বিএম কলেজকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানাগেছে, বরিশাল সরকারী বিএম কলেজ ছাত্র রাজনীতির বহু ঐতিহ্য বহন করে চলছে। কেননা ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র রাজনীতিতে হাতে খড়ি দেয়া বহু ছাত্রই এখন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। এমপি, মন্ত্রী হয়ে দেশ পরিচালনা করছেন অনেকেই।
যার মধ্যে অন্যতম হিসেবে রয়েছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু-এমপি, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক এলজিইডি প্রতিমন্ত্রী এ্যাড. জাহাঙ্গীর কবির নানক-এমপি, অগ্রনী ব্যাংকের পরিচালক এ্যাড. বলরাম পোদ্দার, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মাহবুবুল হক নান্নু, সাবেক এমপি এ্যাড. বিলকিছ আক্তার জাহান শিরিন সহ আরো অনেকে। বিএম কলেজে এদের ছাত্র রাজনৈতিক বর্ণিল ইতিহাস আজও মানুষের হৃদয়ে সাড়া দিয়ে যাচ্ছে। কেননা সেই সময়কার ছাত্র প্রতিনিধিরা সর্বদা দল এবং শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে কাজ করেছে। ভালো কাজের বিনিময়ে বয়ে এনেছে দলের সুনাম। এসব তুখোড় রাজনীতিবীদরা ছাত্র জীবনে নিজেদের কথা ভাবেননি। ভেবেছেন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কথা। যাননি টেন্ডারবাজি কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে। রাজনৈতিক ভাবেই করেছেন শিক্ষাঙ্গনের উন্নয়ন। কিন্তু বর্তমান ছাত্র নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড সেদিনের সেই ছাত্র নেতাদের সুনাম এবং ঐতিহ্যকে বিকৃত করে চলেছে। তারা পাল্টে দিয়েছে বিএম কলেজ ছাত্র রাজনীতির ধরন। যিনিই ছাত্র রাজনীতিতে আসছেন তিনিই হয়ে উঠছেন রাতারাতি কোটিপতি। বই খাতা ছেড়ে ধরছেন অস্ত্র। ঝাঁপিয়ে পড়ছেন টেন্ডারবাজী, দখলবাজী এবং সন্ত্রাসীতে। শুধু নিজেরাই নয়, সন্ত্রাসের অন্ধকার জগতে ঠেলে দিচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের। তাদের রাজনীতি না শিখিয়ে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে অবৈধ অস্ত্র। এমনকি ঐতিহ্যবাহী বিএম কলেজকেই অস্ত্রাগারে পরিণত করেছেন বর্তমান ছাত্রলীগ নামধারী নেতারা। এ কারনে ছাত্র রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে প্রকৃত মেধাবী ছাত্র নেতারা।
কলেজের একাধিক সূত্র জানায়, কলেজের খুব কম জায়গা রয়েছে যেখানে অস্ত্র নেই। পুকুর পাড়, ক্যান্টিন, আবার কখনো কখনো শ্রেণি কক্ষেই ছাত্রনেতাদের হাতে দেখা মিলছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং ধারালো অস্ত্রের। বিশেষ করে ক্যাম্পাসের প্রতিটি ছাত্রাবাসেই হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ অস্ত্র। যার মধ্যে কবি জীবনানন্দ দাস হলটি অন্যতম।
আবাসীক ছাত্ররা জানায়, হোস্টেলগুলোতে তল্লাশি করলে প্রতিটি রুম থেকেই রামদা, চাপাতি, খুড়, হকস্টিক, ছুড়ি সহ নানা প্রকার দেশীয় অস্ত্র মিলবে। ছাত্রলীগ নেতারা এসব অবৈধ অস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীদের শয্যার নিচে এবং আসবাবপত্রের মাঝে লুকিয়ে রাখছেন। বিএম কলেজ ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে তাদের বহিরাগত অনুসারিরাও ক্যাম্পাসে অবৈধ অস্ত্র রেখে যাচ্ছে। কিন্তু নেতাদের ভয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করতে পারছে না।
সাধারণ ছাত্ররা অভিযোগ করেন, বিএম কলেজের বর্তমান ভিপি এবং জিএস ও তাদের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতারা ছাত্রাবাসকে অস্ত্রের গোডাউন বানিয়ে রেখেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে খোঁজ রাখছেন না। বরং তাদের মধ্যে থেকে অনেকেই ছাত্রলীগের এই নেতাদের মদদ দিচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। যার মধ্যে বিএম কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের নামটি উঠে আসছে সবার আগে। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ অনুমতি না দেয়ায় পুলিশ প্রশাসন হোস্টেলগুলোতে তল্লাশি করতে পারছে না দাবী বিএমপি পুলিশের উপরস্থ কর্মকর্তাদের।
এ ব্যাপারে বিএম কলেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক. স.ম ইমানুল হাকিম বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর এমন অভিযোগ পাইনি। তবে সমস্যাটি অনেক পুরানো বলে মনে হচ্ছে। যেহেতু অভিযোগ উঠেছে তাই অবশ্যই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
তাছাড়া তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ক্যাম্পাস এবং ছাত্রাবাসগুলোতে বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার নোটিশ টানিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সকল হোস্টেল সুপারদেরকে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন। বিএম কলেজে কোন প্রকার অনিয়ম বা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বরদাস্ত করা হবে না জানিয়ে এ বিষয়ে সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।