বিএম কলেজের অস্থায়ী ছাত্র কর্মপরিষদ বাতিল

রুবেল খান ॥ বিএম কলেজের ছাত্র সংসদ ‘বাকসু’র বিকল্প হিসেবে গঠন করা অস্থায়ী ছাত্র কর্মপরিষদের কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। বাকসু’র গঠনতন্ত্রে না থাকলেও সংশোধন করে সৃষ্ট তিনমাস মেয়াদী ‘অস্থায়ী ছাত্রকর্ম পরিষদ’ গঠনের প্রায় পাঁচ বছর পর গতকাল বৃহস্পতিবার বাতিলের কথা জানিয়েছেন কলেজের স্টাফ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক এ এস কাইয়ুম উদ্দিন আহম্মেদ।
এছাড়াও বিএম কলেজের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং দোষিদের চিহ্নিত করতে গঠন করা হয়েছে ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কলেজের স্টাফ কাউন্সিলের জরুরী সভায় ওই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বিএম কলেজের সভাকক্ষে অধ্যক্ষ এবং স্টাফ কাউন্সিলের সভাপতি স.ম ইমানুল হাকিম’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সাধারণ সম্পাদক এ.এস কাইয়ুম উদ্দিন আহম্মেদ সহ কাউন্সিলের সকল সদস্যগন উপস্থিত ছিলেন।
সভায় গ্রহীত সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্টাফ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক এ এস কাইয়ুম উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, বিএম কলেজে শিক্ষার মান এবং পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নানামুখী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে বিএম কলেজের অস্থায়ী কর্মপরিষদের সকল কার্যক্রম এখন থেকে স্থগিত থাকবে।
তিনি বলেন, মূলত তিন মাসের জন্য গঠন করা হয়েছিলো অস্থায়ী ছাত্র কর্মপরিষদ। পরবর্তীতে এই কমিটির বিরুদ্ধে একটি মামলাও হয়েছিলো। মামলায় যেভাবে বলা হয়েছিলো সেভাবে এতদিন তারা কর্মপরিষদের কার্যক্রম চালিয়েছে।
তাছাড়া তিনমাসের জন্য গঠন করা অস্থায়ী কর্মপরিষদের মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। কমিটিতে থাকা অনেক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে পাশ করে কলেজ থেকে বের হয়ে গেছে। যে কারণে কর্মপরিষদ নিয়ম অনুযায়ী ভেঙ্গে গেছে। তবে যেহেতু নতুন করে কোন কমিটি গঠন হয়নি তাই পূর্বের কমিটির কয়েকজন নেতৃবৃন্দকে দিয়ে বিভিন্ন দিবসের কর্মসূচী পালনে সহযোগিতা করেছি মাত্র। সম্প্রতি ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনার পর উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য এখন থেকে কর্মপরিষদের কোন ছাত্র নেতাকে ক্যাম্পাসের কোন কার্যক্রম ডাকা কিংবা রাখা হবে না। ওই কমিটির নামে ক্যাম্পাসে কোন কার্যক্রম চলবে না বলেও নিশ্চিত করেন স্টাফ কাউন্সিলের সম্পাদক এ এস কাইয়ুম উদ্দিন আহম্মেদ।
তিনি আরো জানান, বিএম কলেজে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি কিছুদিন ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনার তদন্তে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক শাহ সাজেদাকে আহ্বায়ক করে গঠিত মূল্যায়ন কমিটিকে আগামী ৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। এই কমিটিতে অন্যান্যদের মাঝে রয়েছেন- স্টাফ কাউন্সিলের সম্পাদক হিসেবে তিনিসহ আলাউদ্দিন, ইউসুফ ও আক্তারুজ্জামান। এই কমিটি ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং নতুন করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনসহ শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করবেন। পরবর্তীতে তাদের দেয়া প্রতিবেদন শিল্পমন্ত্রী, সদর আসনের সাংসদ, বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক, এসপি এবং মন্ত্রনালয় সহ সকল দপ্তরে প্রেরণ করা হবে।
সভায় উল্লেখিত বিষয় ছাড়াও নেয়া হয়েছে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলেজের ছাত্রাবাসে পুলিশ চাইলেই যে কোন সময় তল্লাশী অভিযান চালাতে পারবে। তবে অভিযানের পূর্বে অবশ্যই কলেজ অধ্যক্ষের অনুমতি নিতে হবে। বহিরাগত, অছাত্র এবং সাবেক ছাত্র নেতারা অকারণে এবং অসময়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে না। আবাসিক ছাত্রের বাইরে অন্যকোন শিক্ষার্থী কিংবা বহিরাগতরা হোস্টেলে প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে কড়া নজরদারীর জন্য হোস্টেল সুপার সহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া উদ্ভট পরিস্থিতি এবং সকল ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ক্যাম্পাসের মধ্যেই স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়ে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় বসার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান এ.এস কাইয়ুম উদ্দিন।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে ক্ষমতাসীন দলের তৎকালিন মেয়র মরহুম শওকত হোসেন হিরণ’র নির্দেশে বিএম কলেজে গঠিত হয় অস্থায়ী ছাত্র কর্মপরিষদ। নামে কর্মপরিষদ হলেও এর কার্যক্রম পরিচালিত হয় ছাত্র সংসদের আদলেই। তখনকার সময় তিন মাসের জন্য বেশ কয়েকটি সংগঠন নিয়ে গঠিত ২৭ সদস্য বিশিষ্ট অস্থায়ী কর্মপরিষদে সহ-সভাপতি (ভিপি) করা হয় কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মঈন তুষারকে, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নাহিদ সেরনিয়াবাতকে এবং সহ সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) করা হয় রফিক সেরনিয়াবাতকে। অস্থায়ী ভিত্তিতে হলেও কমিটি গঠনের প্রথম দিকেই নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এক চেটিয়া এবং অবৈধভাবে পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগ এনে এজিএস রফিক সেরনিয়াবাত, অনিক সেরনিয়াবাতসহ অন্যান্য সংগঠনের ৪ জন কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। ওই চারজন শপথ না নিলেও মঈন তুষার এবং নাহিদ সেরনিয়াবাতের নেতৃত্বে ২৩ সদস্য শপথ গ্রহণ করে। এমনকি কমিটি অবৈধ দাবী করে তখনকার সময় একটি মামলা করা হয়। তখন বিচারক এক মাসের মধ্যে শিক্ষার্থীদের ভোট গ্রহণের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করনের নিদের্শ দেয়া হয়। কিন্তু তৎকালিক অধ্যক্ষ ননী গোপাল দাস, ভিপি মঈন তুষার এবং জিএস নাহিদ সিরনিয়াবাত আদালতের সেই আদেশ সরিয়ে ফেলেন। ফলে আদালতের আদেশ পাওয়া যায়নি বলে চালিয়ে অধ্যক্ষ ননী গোপাল এবং স্টাফ কাউন্সিলের সম্পাদক এ এস কাইয়ুম উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় অবৈধ কর্মপরিষদ। ছাত্রলীগের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন এমনকি সাধারণ শিক্ষার্থীরা অবৈধ কর্মপরিষদের বিরোধীতা করলেও তার কর্ণপাত হয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষের। যে কারণে ক্যাম্পাসে প্রতিনিয়ত হামলা, সংঘর্ষ সহ বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা লেগেই ছিল। আর সেই সূত্র ধরেই গত কদিন পূর্বে সন্ত্রাসী হামলায় অল্পের জন্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে জিএস নাহিদ সেরনিয়াবাত সমর্থক ও কর্মপরিষদের ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ফয়সাল আহম্মেদ মুন্না। সেই ঘটনা থেকেই অবশেষে অবৈধ কর্মপরিষদের কার্যক্রম বাতিল করলো কলেজ কর্তৃপক্ষ। এর আগে গত বুধবার বিএম কলেজ ছাত্রলীগের সকল কার্যক্রম স্থগিত করে মহানগর ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ।