বিআরটিসি বাসে যাত্রীর পরিবর্তে অগ্রাধিকার পাচ্ছে মালামাল

রুবেল খান ॥ বিআরটিসি বরিশাল ডিপোর বাস এখন ব্যবহার হচ্ছে মালগাড়ি হিসেবে। যাত্রী সংকটের অজুহাতে বাসের সিট দখল করে বিভিন্ন রুটে আনা-নেয়া করা হচ্ছে মালামাল। এই কারনে যাত্রীরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে ট্রাকে বহন যোগ্য মালামাল বিআরটিসির বাসে কম খরচে আনা-নেয়ার কারনে ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। সিটে মালামাল বহন বৈধ না হলেও যাত্রী সংকটে আর্থিক ক্ষতি এড়াতে করতে হয় বলে জানিয়েছে বিআরটিসি’র সংশ্লিষ্টরা। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, বেসরকারি সেক্টরে বাস মালিক এবং শ্রমিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারনে দক্ষিণাঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো রাষ্ট্রীয় পরিবহন বিআরটিসি। কিন্তু গত কয়েক যুগেও বরিশাল ডিপোর অধীনে বিআরটিসি বাসে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। হয়েছে শুধু লুটপাট। এর ফলে উন্নয়ন বঞ্চিত লক্কর-ঝক্কর মার্কা বিআরটিসি বাসে বর্ষা মৌসুমে চলাচল করতে হলে যাত্রীদের ছাতা মেলে বসতে হচ্ছে আসনে। সেই সাথে স্থানীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাত্রীদের প্রতি স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম এবং দুর্নীতি তো রয়েছেই। এর ফলে বিআরটিসি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন যাত্রীরা।
যাত্রীদের সাথে আলাপ কালে জানা গেছে, বরিশাল থেকে যশোর, ভোলা, বরগুনা রুটে যাত্রীদের চাপ রয়েছে। এর ফলে বিআরটিসি ডিপো কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ বছর পূর্বে বরিশাল থেকে বরগুনা, পাথরঘাটা, আমুয়া, ভোলার চরফ্যাশন এবং যশোর-বেনাপোল রুটে বিআরটিসির পৃথক বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এগুলো বরিশাল নগরীর লঞ্চঘাট এলাকার বিআরটিসি কাউন্টার থেকে পরিচালিত হচ্ছে। তবে এর বাইরে সরাসরি নথুল্লাবাদ বিআরটিসি’র বরিশাল ডিপো অফিস থেকেও পরিচালিত হয়। ঢাকা থেকে আসা লঞ্চ যাত্রীদের সুবিধার্থে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে বিআরটিসি’র পাঁচটি বাস নিয়মিত চলাচল করছে। এছাড়া যশোরের বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা একটি বাস দুপুর দেড়টা থেকে আড়াইটার মধ্যে বরিশাল নগরীর লঞ্চ ঘাট কাউন্টারে পৌঁছে এখান থেকে যাত্রী নিয়ে পুনরায় ভোলার চরফ্যাশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। তবে উল্লেখিত রুটের বাসগুলো যথারীতি চলাচল করলেও বাসের মধ্যে যাত্রীদের খোঁজ মিলছে না। কেননা বাসের ভেতরে থাকা দুই-তৃতীয়াংশ আসনই থাকছে ভারি মালামালের দখলে। সর্বোচ্চ ১০/১২টি আসন ভাগে পাচ্ছেন যাত্রীরা। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘ দিন ধরেই চলে আসছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
যাত্রীদের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে গতকাল দুপুরে বিআরটিসি বাসের লঞ্চ ঘাট কাউন্টারে। যশোরের বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা (বরিশাল-ব ১১-০০১৯) নম্বরের বাসটিতে মোট আসন সংখ্যা ৫৬টি। সামনের দিকে আসনগুলোতে সর্বোচ্চ ৮/১০ জনের মত যাত্রী ছিলো। এর পর থেকে পেছন পর্যন্ত যে আসন গুলো রয়েছে তার প্রত্যেকটিতেই বিভিন্ন প্রকারের মালামাল রেখে আটকে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে পেছন দিকটাতে বিভিন্ন ধরনের কার্টনের মধ্যে মোটর সাইকেল সহ বিভিন্ন যানবাহনের যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন লাইব্রেরীর বই, কাচের মালামাল এবং ব্যাটারী দিয়ে যাত্রীদের আসন ও চলাচলের পথটুকুও আটকে রাখা হয়েছে। এর ফলে সিটে বসাতো দুরের কথা ওই স্থানে হাটা-চলার পথও বন্ধ হয়ে আছে। দু’জন যাত্রী সিট না পেয়ে মালামালের উপরে বসে ছিল। বাসের ভেতরেই নয়, বাংকার এবং ছাদ বাম্পারেও মালামাল বোঝাই করা ছিল। এ প্রসঙ্গে বিআরটিসি’র স্টিমার ঘাট কাউন্টারের ইনচার্জ নাসির উদ্দিন এর সাথে কথা বলতে চাইলেও তাকে পাওয়া যায়নি। দেখা যায় কাউন্টারের দুটি কক্ষের একটিতে বিআরটিসি’র কর্মচারী এবং বহিরাগতরা তাস নিয়ে জুয়ার আসরে মগ্ন আছেন। কাউন্টার মাষ্টারের চেয়ারে বসা শাহজাহান মাস্তান বলেন, ইনচার্জ নাসির উদ্দিন দুপুরের খাবার খেতে বাসায় গেছেন।
কাউন্টারের অপর এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে জানান, বাসের ভেতরে সর্বোচ্চ এক মণ পর্যন্ত মালামাল বহন করার বিধান রয়েছে। বাসের মধ্যে যে মালামাল উঠানো হয়েছে তা যাত্রীরাই নিয়ে এসেছে। তাছাড়া বেনাপোল থেকে বিআরটিসি বাসের জন্য ১৫টি ব্যাটারী নিয়ে আসা হয়েছে। এর বাইরে পরীক্ষার বিভিন্ন প্রশ্নপত্র যশোর থেকে নিয়ে আসা হয়েছে বলে দাবী তাদের। সরকারি মাল বিধায় এর কোন ভাড়া রাখা হয়নি বলেও দাবী করেন ওই ব্যক্তি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেনাপোল থেকে চরফ্যাশন রুটের বিআরটিসি বাসে বরিশাল এবং ভোলার মোটর ওয়ার্কশপ মালিকদের সাথে চুক্তিতে মালামাল পরিবহন করে থাকে। এতে করে ওয়ার্কশপ মালিক এবং বাসের সংশ্লিষ্টরাও লাভবান হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া অন্যান্য রুটগুলোতেও বিআরটিসি বাসের একই অবস্থা বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে স্টিমার ঘাট কাউন্টারের ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা নাসির উদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, আমাদের বাসের কন্ডিশন ভালো নয়। বর্ষায় যাত্রীদের ছাতা মেলে বসতে হচ্ছে। ডিপোতে পূর্বে যিনি ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি বাসের কোন কাজ করাননি। নাসির উদ্দিন বলেন, বিআরটিসিতে যাত্রী হচ্ছে না। তাই আর্থিক ক্ষতিতে পড়তে হচ্ছে। ক্ষতি এড়াতে অবৈধভাবে বাসের মধ্যে মালামাল বহন করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় না লেখার জন্যও অনুরোধ জানিয়ে বলেন, পরবর্তীতে বিআরটিসির ভেতরে মালামাল বহন কর না বলে আশ্বস্থ করেন তিনি।
তবে বিআরটিসি’র বরিশাল ডিপোর নবনিযুক্ত ম্যানেজার মো. জামিল হোসেন বলেন, কোনভাবে বিআরটিসির বাসে ট্রাকের মত করে মালামাল বহন করা যাবে না। আগে যাত্রীদের অগ্রাধিকার থাকবে। তবে যাত্রী কম থাকলে সে ক্ষেত্রে একজন যাত্রীর সাথে থাকা দু-একটি ব্যাগ বাসের মধ্যে বহন করা যেতে পারে। এর বাইরে কেউ বাসে মালামাল পরিবহন করলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।