বিআইডব্লিউটিসির অর্থে সংগ্রহ করা দ্বিতীয় যাত্রীবাহী নৌযান ‘এমভি মধুমতি’

নাছিম উল আলম, অতিথি প্রতিবেদক॥ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান-বিআইডব্লিউটিসি’র অভ্যন্তরীন যাত্রীবাহী নৌযান ‘এমভি মধুমতি’ আগামী ১৪জুলাই উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। ঐদিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাড়ে ৭শ যাত্রী বহনক্ষম এ নৌযানটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবে বলে জানা গেলেও তা যাত্রী পরিবহন শুরু করবে কিনা তা নিশ্চিত করতে পারেনি সংস্থার দায়িত্বশীল মহল। অথচ দক্ষিনাঞ্চলের সাধারন মানুষ ঈদের আগের প্রথম ভীড়ের দিন ১৪জলাই থেকেই মধুমতি’র যাত্রী হবার জন্য অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে। সংস্থাটির বাণিজ্য পরিদপ্তরের একাধীক কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও ১৫জুলাই থেকে এমভি মধুমতি ঢাকা-বরিশাল রুটে যাত্রীর পরিবহনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেন নি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভিটা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার পাশ দিয়ে বহমান মধুমতি নদীর নামেই স্বাধীনতার পরে নির্মিত দ্বিতীয় যাত্রীবাহী নৌযান ‘এমভি মধুমতি’র নামকরণ করেছে নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়। ১৯৭৮সালে বিঅইডব্লিউটিসি তার পুরনো মিডিয়াম টাইপ ফেরি ‘বুড়িগঙ্গা’কে পূণর্বাসন ও যাত্রীবাহী নৌযানে রূপান্তর করে ‘এমভি মধুমতি’ নামকরণ করে। ঐ নৌযানটি প্রথমে ঢাকাÑবরিশাল মেইল সার্ভিস ও পরে দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন ফিডার সার্ভিসে চলাচল করলেও নৌযান সংকটে পরবর্তিতে তা রকেট স্টিমার সার্ভিসেও চলাচল করে।
প্রায় ৫৬কোটি টাকার দেশীয় তহবিলে নির্মিত দুটি যাত্রীবাহী নৌযান প্রকল্পের প্রথমটি, ‘এমভি বাঙালী’ গতবছর ২৯মার্চ প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পরে ৯মার্চ থেকে বাণিজ্যকভাবে পরিচালনা শুরু হয়। তবে নির্মাণ শৈলীর ত্রুটির কারনে গত বছরাধীকালেও বাঙালী যাত্রী বান্ধব হতে পারেনি। নৌযানটি তার নির্ধারিত ঢাকাÑবরিশাল রুট থেকেও প্রতাহার করে আরো লোকশানের রুটে ঠেলে দিয়েছে সংস্থার দায়িত্বশীল মহল।
এমনকি প্রায় আড়াইশ ফুট দৈর্ঘ ও ৪১ফুট প্রস্থ নব নির্মিত ‘এমভি মধুমতি’ আসন্ন ঈদ পরবর্তী সময়ে কোন রুটে যাত্রী পরিবহন করবে তা এখনো ঠিক করেনি বিআইডব্লিউটিসি। ইতোমধ্যে প্রকল্প-প্রস্তবনার রুট ঢাকা-বরিশাল থেকে একই প্রকল্পের প্রথম নৌযান এমভি বাঙালী’কে প্রত্যাহার করে ঢাকা-মোড়েলগঞ্জ রুটে পাঠান হয়েছে। ফলে এর লোকশানের মাত্রাও প্রায় দ্বিগুন বেড়েছে। তবে প্রায় ২৭কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এমভি বাঙালী সপ্তাহে মাত্র ১টি ট্রিপে চলছে লোকশানের মাত্রা সীমিত রাখার লক্ষে।
সাড়ে ৭শ যাত্রী বহনক্ষম এমভি মধুমতি’তে লোয়ার ও আপার ডেকে ৬৮০জন যাত্রী ছাড়াও দ্বৈত শয্যার ৪টি ভিআইপি কক্ষ এবং দোতালা ও তিন তলাতে ৩৪টি দ্বৈত শয্যার বাতানকুল প্রথম শ্রেণী, ৪টি সিঙ্গেল বাতানকুল কক্ষ এবং ১৮টি সিঙ্গেল সেমি ডবল কক্ষ থাকছে। এছাড়াও ৪৪টি শোভন শ্রেণীতে চেয়ারে ভ্রমনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। যা দক্ষিনাঞ্চলের যাত্রীদের কাছে কখনোই গ্রহনযোগ্য হবেনা বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
নৌযানটিতে ১,১৮৪অর্শ¦ শক্তির ২টি করে ইয়নমার মূল ইঞ্জিন ছাড়াও ২টি মূল জেনারেটর সহ ১টি স্ট্যান্ডবাই জেনারেটরও সংযোজন করা হয়েছে। প্রতি ঘন্টায় ১১নটিক্যাল মাইল বা ২০.৩৭কিলোমিটার গতিবেগে চলাচলক্ষম এমভি মধুমতি’র পরিচালন ব্যবস্থা নির্বিঘœ করতে ‘রাডার, ইকোসাউন্ডার, জিপিএস, ভিএইচএফ, এসএসবি, স্পিড লগ, ম্যাগনেটিক কম্পাস, এ্যানোমোমিটার ও রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেম’ সংযোজন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট গতিপথে পরিচালনের লক্ষে নৌযানটিতে ‘ইলেকট্রো হাইড্রোলিক স্টিয়ারিং সিস্টেম’ও সংযুক্ত হয়েছে। যাত্রীদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই নকশা প্রনয়ণ এবং অনুসরন সহ ইনল্যান্ড শিপিং অডিন্যান্স অনুযায়ী তা নির্মিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। দ্বিস্তরের তলা বিশিষ্ট এমভি মধুমতি’র সার্ভে সনদ ও নিবন্ধন প্রদান করেছ সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ।
২০১২সালের ৪অক্টোবর চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ণ মেরিন শিপ বিল্ডার্স-এর সাথে এমভি বাঙালী ও এমভি মধুমতি নামের দুটি নৌযান নির্মাণের লক্ষে বিআইডব্লিউটিসি’র সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে চুক্তির নির্ধারিত সময়েরও প্রায় বছরাধীককাল পরে এমভি মধুমতি জাহাজটি গত মে মাসের শেষভাগে বিআইব্লিউটিসি’র কাছে হস্তান্তর করে ওয়েস্টার্ণ মেরিন। চুক্তি বহির্ভূত নির্মাণ কাজ সহ নানা পরিবর্তণ ও পরিবর্ধণের ফলে এ কালবিলম্ব ঘটে বলে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান থেকে দাবী করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান-বিআইডব্লিউটিসি তার নিজস্ব তহবিল থেকে যে দুটি অভ্যন্তরীন যাত্রীবাহী নৌযান নির্মাণ প্রকল্প গ্রহন করে মধুমতি ’ তার দ্বিতীয়। নৌযান দুটির পুরো উপরিকাঠামো সম্পূর্ণ ইস্পাত নির্মিত হওয়ায় এর ওজন ও গভীরতা যথেষ্ট বেড়ে গেছে। ফলে ক্ষমতানুযায়ী সাড়ে ৭শ যাত্রী বোঝাই করলেই এসব নৌযানের গড় ওজন ১২’শ টনে পৌঁছেবে। আর তখন এর গভীরতাও দাড়াবে প্রায় সাড়ে ৫ফুটের মত। ফলে নৌযানগুলো যেসব নৌপথ অতিক্রম করবে, সেখানের নাব্যতা প্রয়োজন হবে নুন্যতম সাড়ে ৮ফুটের মত। যা বর্তমানে আমাদের অভ্যন্তরীন বেশীরভাগ নৌপথেই শুষ্ক মৌশুমে অত্যন্ত দুস্কর হয়ে পড়েছে। অথচ বেসরকারী মালিকানার ৩১৫ফুট দৈর্ঘের যাত্রীবাহী নৌযানগুলোর গড় গভীরতা ৫ফুটের অনেক নিচে এবং তা ৭ফুট নাব্যতার নৌপথ অতিক্রম করছে অনায়াশে। এমনকি অতিরিক্ত ওজনের কারেণ এমভি বাঙালী ও এমভি মধুমতির জ্বালানী ব্যয়ও বেসরকারী নৌযানগুলোর চেয়ে প্রায় দেড়গুন বেশী। ফলে এসব নৌযান কখনোই পরিচালন সমতা আনতে পারবে না বলে মনে করছেন নৌ বিশেষজ্ঞগন। এতে করে অদুর ভবিষ্যতেই এদুটি যাত্রীবাহী নৌাযন রাষ্ট্রীয় নৌ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানটির জন্য স্বেত হস্তিতেও পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন ওয়াকিবাহাল মহল। এতে করে দীর্ঘ ৬৩বছর পরে দেশে সরকারী মালকানায় নির্মিত নতুন যাত্রীবাহী নৌযান দুটির সেবা লাভে দক্ষিনাঞ্চলের মানুষ কতটুক সক্ষম হবে সে বিষয়েও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে সবার মধ্যে।