বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারযান মাঝারী মাপের নৌযান উদ্ধারেও সক্ষম নয়

অতিথি প্রতিবেদক ॥ দেশের অভ্যন্তরীন ও উপকূলীয় নৌপথে চলাচলকারী মাঝারী মাত্রার নৌযানসমুহ উদ্ধারেও সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি বিআইডব্লিউটিএ। যার কারণে ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী যে কোন লঞ্চ দুর্ঘটনায় পতিত হলে তা উদ্ধার করার কোন আশা নেই। এমনকি ঢাকা-বরিশাল রুটের বাইরে অন্য রুটে চলাচলকারী মাঝারী সাইজের যে লঞ্চ রয়েছে সেগুলো উদ্ধার করতে পারবে কিনা এবিষয়ে সংশয় রয়েছে। সমুদ্র পরিবহন অধিদফ্তর দেশের অভ্যন্তরীন নৌপথে ৬শ’ টন থেকে হাজার টন ওজনের নৌযানের নকশা অনুমোদন করলেও বিআইডব্লিউটিএ’র কাছে যে ৪টি উদ্ধারযান রয়েছে তার সর্বোচ্চ উত্তোলন ক্ষমতা মাত্র আড়াইশ টন। এমনকি নৌপথ নিয়ন্ত্রন ও রক্ষনাবেক্ষনকারী এ প্রতিষ্ঠানটির যে ৪টি উদ্ধারযান রয়েছে তার সর্বমোট উত্তোলন ক্ষমতা মাত্র ৭২০ টন হলেও দীর্ঘদিনের পুরনো উদ্ধারযান ‘হামজা’ ও ‘রুস্তম’ ইতোমধ্যে আয়ুস্কাল হারিয়েছে। এসব উদ্ধারযান বর্তমানে পাটুরিয়া ও মাওয়া ফেরি সেক্টরে রাখা হয়েছে। তবে বছর চারেক আগে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগ্রহ করা অত্যাধুনিক উদ্ধারযান ‘নির্ভিক’ ও ‘দূর্জয়’এর উত্তোলন ক্ষমতা আড়াইশ টন করে বলা হলেও সে ব্যপারে যথেষ্ঠ সংশয় রয়েছে ওয়াকিবহাল মহলে। তবে কর্তৃপক্ষ এ সংশয়ের বিষয়টি অমূলক বলে দাবী করে এসব উদ্ধারযান ক্ষমতা অনুযায়ী যেকোন নৌযান উদ্ধারে সক্ষম বলে জানিয়েছেন। এসব উদ্ধারযান যথাক্রমে বরিশাল ও নারায়নগঞ্জ বেজ-এ রাখা হয়েছে। গত দুই দশকে দেশের অভ্যন্তরীন নৌপথে যাত্রী, পণ্য ও জ্বালানী পরিবহণে নিরব বিপ্লব ঘটে গেছে। এসময়ের মধ্যে সবগুলো সেক্টরেই অনেক ভারী নৌযান তৈরী হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান-বিআইডব্লিউটিসি ২০১৪ ও ২০১৫ তে ‘এমভি বাঙালী’ ও ‘এমভি মধুমতি’ নামের যে দুটি যাত্রীবাহী নৌযান তৈরী করেছে, নকশা অনুযায়ী তার ওজন ১ হাজার টন। বেসরকারী সেক্টরেও রাজধানীর সাথে দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন নৌপথে চলাচলকারী বিলাসবহুল যেসব যাত্রীবাহী নৌযান তৈরী হয়েছে সেগুলোর কোনটির ওজনই ৭শ’ টনের নিচে নয়।
অথচ বিআইডিব্লিউটিএ যে নতুন দুটি উদ্ধারযান সংগ্রহ করেছে তার প্রতিটির সর্বোচ্চ উত্তোলন ক্ষমতা আড়াইশ টন করে বলা হলেও সে বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে কারিগরি বিশেষজ্ঞ মহলে। ২০১৫ সালে প্রথম উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়ে নতুন উদ্ধারযান দূর্জয়-এর ক্রেনের তার ছিড়ে পরে। অথচ ১৯৬৪ সালে ও ১৯৮২ সালে সংগ্রহ করা হামজা ও রুস্তম উদ্ধারযান দুটি ইতোপূর্বে যৌথভাবে ক্ষমতার অতিরিক্ত ওজনের অনেক ডুবে যাওয়া নৌযান নদীর গভীর থেকে তুলে পানিতে ভাসিয়ে নিকটস্থ চরায় টেনে তুলতে সক্ষম হয়।
কারিগরি বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, দেশের অভ্যন্তরীন নৌপথে চলাচলের জন্য সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর যেহেতু অনেক ভারী নৌযান তৈরীর নকশা অনুমোদন সহ চলাচলের ছাড়পত্র দিচ্ছে এবং বিআইডিব্লিউটিএ তা চলাচলের সময়সূচীও প্রদান করছে, সেহতেু আরো বড় মাপের উদ্ধারযান সংগ্রহের কোন বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে তহবিলের সংস্থানের বিষয়টিও বহিঃসম্পদ বিভাগকে জরুরী ভিত্তিতে বিবেচনায় নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন ওয়াকিবহাল মহল।
১৯৬৪ ও ১৯৮২ সালে সংগ্রহ করা হামজা ও রুস্তম নামের উদ্ধারযান দুটি আয়ুস্কাল হারিয়েছে অনেক আগে। উপরন্তু প্রায় ৩০ বছর পরে সংগ্রহ করা ‘নির্ভিক’ ও ‘দূর্জয়’ উদ্ধারযান দুটিও মাঝারী থেকে বড় মাপের কোন নৌযান উদ্ধারের ক্ষমতা রাখেনা বিধায় অভ্যন্তরীন নৌপথকে সচল রাখার স্বার্থেও আরো শক্তিশালী উদ্ধারযান সংগ্রহের তাগিদ দিয়েছেন নৌপথে অভিজ্ঞ নাবিকরা। সামম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একাধিক পণ্যবাহী নৌযান ডুবির ফলে নৌপথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত শনিবার বরিশাল বন্দরের অদুরে যাত্রী বোঝাই ক্যাটামেরন নৌযান ‘এমভি গ্রীন লাইন-২’ এর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে ‘এমভি মাসুদ-মামুন-১’ নামে কয়লা বোঝাই একটি কার্গো কির্তনখোলা নদীতে ডুবে গেছে। এর ফলে সারা দেশের সাথে বরিশাল ছাড়াও মংলা সমুদ্র বন্দর সহ খুলনা ও নওয়াপাড়া নদী বন্দরের নৌযান চলাচলও যথেষ্ঠ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কিন্তু বরিশাল বেজে অবস্থানরত উদ্ধারযান ‘নির্ভীক’ ডুবে যাওয়া পণ্যবাহী নৌযানটি দূরের কথা, আংশিক নিমজ্জিত ৬শ’ টন ওজনের গ্রীন লাইন-২ উদ্ধারেও কোন অভিযান শুরু করতে পারেনি তার সীমিত উত্তোলন ক্ষমতার কারনে।
অথচ গ্রীন লাইন কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ দেশীয় লাগসই প্রযুক্তিতে নৌযানটি উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করেছেন ইতোমধ্যে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্বেও বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। তবে বিআইডব্লিউটিএ থেকে আরো বড় ধরনের উদ্ধারযান সংগ্রহের বিষয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয়ে প্রস্তাব পেশ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত ঐসব উদ্ধারযানের উত্তোলন ক্ষমতা কমপক্ষে হাজার টন হতে পারে বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণ প্রাথমিক পর্যায়ে।
এব্যপারে গতরাতে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর মোজাম্মেল হক-বিএন এর সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, সময়ের প্রয়োজনে দেশে অনেক বড়মাপের নৌযান তৈরী হচ্ছে। সে নিরিখে আরো বড় ধরনের উদ্ধারযান প্রয়োজন হয়ে পরেছে। এনিরিখে আমরা আরো শক্তিশালী উদ্ধারযান সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এলক্ষ্যে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছে বলে জানান তিনি। কারিগরি কমিটি আজ মাওয়াতে নির্মানাধীন পদ্মা সেতুর জন্য ব্যবহৃত ভাসমান ক্রেনগুলো পরিদর্শন সহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সাথে মতবিনিময় করবে বলেও চেয়ারম্যান জানান। কমিটির সুপারিশের আলোকে সবদিক বিবেচনা করেই সরকারের কাছে প্রস্তাব পেশ করা হবে বলে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান জানান।