বিআইডব্লিউটসি’র গলার কাটা এমভি বাঙালী ও মধুমতি

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ যাত্রী সুবিধাহীন ভুল নকশা ও অতি মাত্রায় বাড়তি নির্মাণ ব্যয় সহ যাত্রী বান্ধব না হওয়ায় নতুন দুটি যাত্রীবাহী নৌযান ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিসি’র গলার কাটা হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ এসব নৌযানকে ‘স্বেতহস্তী’ বলেও সম্বোধন করতে শুরু করেছেন। অথচ ১৯৭২সালে প্রতিষ্ঠার পরে সরকারী নৌ বাণিজ্য সংস্থা-বিআইডব্লিউটিসি’র এ দুটিই প্রথম সংগ্রহ করা কোন নতুন নৌযান। এমনকি ১৯৫২সালের পরে দেশের অভ্যন্তরীন রুটের জন্য সরকারী ব্যাবস্থাপনায় প্রথমবারে মত এসব নৌযান সংগ্রহ করা হয়।
সংগ্রহ করা এ দুটি নৌযানের মধ্যে ‘এমভি বাঙালী’ নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৬মাস পরে গত বছর মার্চের মধ্যভাগে সংস্থাটির কাছে হস্তান্তরের পরে ২৯মার্চ প্রধানমন্ত্রী তা উদ্বোধন করেন। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় বছর পরে গত জুনের শেষভাগে ‘এমভি মধুমতি’ হস্তান্তরের পরে ১৪জুলাই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নৌযানটি উদ্বোধন করেছিলেন। তবে পকল্পটির মেয়াদকাল আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রায় ৪৪কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয়ের দুটি যাত্রীবাহী নৌযানের বরাত ৪৯কোটিতে দেয়া হলেও ইতোমধ্যে তার ব্যয় ৫৪কোটিতে উন্নীত হয়েছে। তবে নির্মান প্রতিষ্ঠান-‘ওয়েষ্টার্ণ মেরিন শিপ বিল্ডাসর্’ আরো প্রায় ৩কোটি টাকা দাবী করছে বলে জানা গেছে। আর এ ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে সংস্থাটির নির্মাণ সংশ্লিষ্ট মহল সহ মন্ত্রনালয়েরও প্রভাবশালী পর্যায়ের প্রচ্ছন্ন আশীর্বাদ ছিল ও আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ দেশে নির্মিত বেসরকারী যাত্রীবাহী নৌযানগুলোর নির্মাণ ব্যয় অনেক কম বলে জানা গেছে।
কিন্তু এত অধিক অর্থে সংগ্রহ করা দক্ষিনাঞ্চলবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের সরকারী এ নৌযান দুটি ইতোমধ্যে যাত্রীদের আস্থা হারিয়েছে। পাশাপাশি লাভÑলোকসানের হিসেব কষতে গিয়ে চরম দুর্ভাবনারও কারন হয়ে উঠেছে। এসব নৌযানের পরিচালন ব্যয় দীর্ঘদিনের পুরোন ও অধিক যাত্রীবহনক্ষম নৌযানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন। ফলে যাত্রী পরিবহনের চেয়ে বসিয়ে রাখলেই এসব নৌযানে লোকসানের বোঝা যথেষ্ঠ কমবে বলে মনে করছেন সংস্থাটির দায়িত্বশীল মহল। আর এ লোকসানের মূল কারন অতিরিক্ত জ্বালানী ব্যয়। যেখানে সংস্থাটির ৯৬০যাত্রী বহনাক্ষম প্রায় শতবর্ষের পুরনো প্যাডেল জাহাজগুলোতে ঘন্টায় জ্বালানী ব্যয় ৯৫লিটার। সেখানে সম্প্রতি সংগ্রহ করা ‘এমভি মধুমতি ও এমভি বাঙালী’ নামের সাড়ে ৭শ যাত্রী বহনাক্ষম নৌযান দুটি জ্বালানী পুড়ছে ঘন্টায় ২শ লিটার। ফলে এসব নৌযান পূর্ণ লোড নিয়ে গন্তব্যে যাত্রা করলেও তার লোকসান বন্ধের কোন সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
‘পিএস মাহসুদ, পিএস অস্ট্রিচ, পিএস লেপচা ও পিএস টাণর্’ নামের ৪টি প্যাডেল জাহাজের মধ্যে প্রথম ৩টিতে ১৯৮২-৮৩সালে বেলজীয় ‘এবিসি’ ইঞ্জিন সংযোজন করা হয় । ‘পিএস টার্ণ’এ অনুরূপ নতুন ইঞ্জিন সংযোজন করা হয় ২০০২সালে। অভিযোগ রয়েছে, সংস্থাটির প্রকল্প পরিচালক সহ সংশ্লিষ্টগন নতুন এ দুটি নৌযানের নকশা প্রনয়ন সহ এর যাত্রী সুবিধা বিন্যাসে বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে কাজ করে নি। গতবছর এমভি বাঙালী জাহাজটি সংস্থা গ্রহনের পরে এর নানা অসংগতি ধরা পারে। পুরো নৌযানটিই যাত্রী বান্ধব হয়নি বলে অভিযোগ উঠলেও গত এক বছরেও সেসব অসংগতি দূর হয়নি। এমনকি গত বছর ২৫এপ্রিল বরিশালে এক সভায় নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান এমভি বাঙালী’র এসব অসংগতি খুব শিঘ্রই দূর করার কথা জানিয়েছিলেন।
তবে বাঙালীর ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এমভি মধুমতিতে কিছু সংশোধনী আনা হলেও তা পরোপুরো যাত্রী বান্ধব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এসব নৌযান বর্তমান অবস্থায় কখনোই লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবে না বলে মনে করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল মহল। মহলটির মতে বর্তমনে নৌযান দুটি সচল রাখতে সপ্তাহে মাত্র একদিন করে রকেট সার্ভিস চালানো হচ্ছে। আর তাতেও প্রতি ট্রিপেই লোকসান হচ্ছে লাখ টাকার ওপরে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এ দুটি নৌযান দিয়েই সংস্থার বছরে লোকসান ৫কোটি টাকার ওপরে উঠবে বলে মনে করছে মহলটি। তবে আসন্ন ঈদ উল আজহার পরে এমভি বাঙালী নির্মান প্রতিষ্ঠানের কাছে ফেরত পাঠান হবে এর ত্রুটি বিচ্যুতিসমূহ দূর করার জন্য। কিন্তু এক বছরের ‘ওয়ারেন্টী পিরিয়ড’ শেষ হয়ে যাবার কারনে নির্মান প্রতিষ্ঠান এজন্যও কিছু বাড়তি অর্থ দাবী করতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সেল ফোন ও ল্যান্ড ফোনে বহু চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এসব নৌযানে যাত্রী সুবিধা বেসরকারী নৌযানের আদলে পূণর্বিন্যাস করলেই অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। এসব নৌযানে ডেক থেকে প্রথম শ্রেণীতে যেসব সরঞ্জামাদী সংযোজন করা হয়েছে তাও যথেষ্ঠ নি¤œ মানের বলে অভিযোগ রয়েছে। এমভি বাঙালী’র লোয়ার ও আপার ডেকে সেলিং ফ্যানের পরিবর্তে কিছু ওয়াল ফ্যান সংযুক্ত করা হয়েছে। যা যাত্রীদের বাড়তি দুর্ভোগের যথেষ্ঠ কারন। পুরো নৌযানটির ডেক চারদিকে আটকে দেয়ায় একটি গুদাম ঘরের রূপ ধারন করেছে। দুঃসহ গরমে যাত্রীদের দুর্ভোগ সব বর্ণনার বাইরে। প্রথম শ্রেণীর পেছনে একটি কক্ষে কিছু চেয়ার সংযোজন করে ডেক-এর চেয়ে বাড়তি ভাড়ায় যাত্রীদের ভ্রমনের(?) ব্যবস্থা করা হয়েছে। অথচ বেসরকারী নৌযানগুলোতে অনুরূপ শেণ্রীতে প্রতি যাত্রীর জন্য একটি করে সোফার ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে বিছানার চাঁদর, বালিশ ও কম্বলও থাকছে। কিন্তু সরকারী প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও বিআইডব্লিউটিসি’র অনেক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রকৌশলী ও বানিজ্য বিভাগের কর্মকর্তাগন এখনো এ বাস্তবতা বিবেচনায় নেননি। কোন যাত্রীর পক্ষেই একটি চেয়ারে বসে ৮-১২ঘন্টার নৌ ভ্রমন যে সম্ভব নয়, তা বুঝতে সংস্থার দায়িত্বশীলদের আর কতদিন লাগবে সে উত্তর কারো কাছ থেকেই পাওয়া যায়নি। এমনকি নৌযানটির ভিআইপি শ্রেণীর সামনে একটি পেন্ট্রি স্থাপন করে যাত্রীদের চলাচলের সাচ্ছন্দ বিনষ্ট করা হয়েছে। অথচ ঐ ভিআইপি জোনে যাত্রীদের বসে খাবারের কোন স্থান নেই।
উপরন্তু ঢাকা-বরিশাল রুটের জন্য সংগ্রহ করা এ নৌযান দুটি তার নির্দিষ্ট রুটের পরিবর্তে রকেট সার্ভিসে পরিচালনা করায় লোকসানের মাত্রা আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঘন্টায় ২শ লিটার জ্বালানী ব্যয় করা এসব নৌযান ঢাকা-বরিশাল ৮-১০ঘন্টার নৌপথে পরিচালনা করলে লোকসানের লাগাম অনেকটাই টেনে ধরা সম্ভব হত বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। সংস্থার দায়িত্বশীলদের সেদিকে নজর নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে কারো কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।