বাড়তি জনবল আর লক্করমার্কা বাস ॥ লোকসানে বিআরটিসি’র বরিশাল ডিপো

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ দীর্ঘদিনের পুরনো বাস আর মাথাভারী প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ে দেশের দক্ষিনাঞ্চলে বিআরটিসি’র একমাত্র বাস ডিপোটি এখন ধুকছে। একসময়ে রাষ্ট্রীয় সড়ক পরিবহন সংস্থার দেশের সর্বোচ্চ লাভজনক এ বাস ডিপোটি এখন দুই যুগের পুরনো মেরামত অযোগ্য বাস দিয়ে যাত্রী সেবার (?) নামে সাধারন মানুষের দূর্ভোগের পরিধি কেবল বৃদ্ধি করছে। ইতোমধ্যে এ ডিপোর ৬১টি বাস-এর মধ্যে ১৮টিই মেরামত অযোগ্য হয়ে পড়ে আছে। অবশিষ্ট ৪৩টি বাসের মধ্যে ১৬টি এসি বাস মাত্র তিন বছর আগে ভারতীয় ঋনে সংগ্রহ করা হলেও তা এখন যাত্রীদের সাচ্ছন্দ্য ভ্রমনের পরিবর্তে বিড়ম্বনাকে বৃদ্ধি করছে বলে অভিযোগ উঠছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির অনেক বাসে বর্ষার সময় ছাতা মাথায় দিয়েও বসতে হচ্ছে। তবে শত বিড়ম্বনার পরেও দক্ষিনাঞ্চলের মানুষের কাছে বিআরটিসি’র গ্রহনযোগ্যতা এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। এখনো সংস্থাটির বরিশাল বাস ডিপোটির ৪৩টি গাড়ী দৈনিক প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার সড়ক পথে অন্তত ৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করছে। তবে প্রতি মাসে ডিপোটি দেড় কোটি টাকারও বেশী যাত্রী ভাড়া আয় করলেও পুরনো গাড়ীর অতিরিক্ত জ¦ালানী ব্যয়, নদ-নদী বেষ্টিত দক্ষিনাঞ্চলের সড়ক পথে ফেরি ভাড়া ও সেতুর মাত্রাতিরিক্ত টোল পরিশোধের সাথে অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে এ বাস ডিপোটির লাভের পথ রুদ্ধ করছে। উপরন্তু বছরে দুটি উৎসব ভাতা প্রদানেও এ ডিপোটির কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় কুড়ি লাখ টাকা চলে যাচ্ছে। ফলে একসময়ের লাভজনক বরিশাল বাস ডিপোটি এখন অনেকটাই ধুকছে।
১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিআরটিসি’র বাস ডিপোটি ১৯৮২ সালে সামরিক সরকার বন্ধ করে দেয়ার পরে ১৯৮৭ সালে পুনরায় চালু করার প্রতিটি স্তরেই পুরনো বাসই ছিল ভরসা। তবে বছর তিন আগে ১০টি নতুন ভারতীয় এসি বাস দিয়ে বরিশাল-মাওয়া রুটি বিশেষ একটি সার্ভিস চালু করা হয়। প্রথমে এ সার্ভিসটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও নি¤œমানের গাড়ীর কারনে এখন তা যাত্রী বিড়ম্বনার বিষয়ে পরিনত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বরিশালে অনুরূপ ১৬টি বাস প্রদান করা হলেও তার সবগুলোই এখন এ ডিপোর অনেকটা বোঝায় পরিনত হয়েছে। এসব বাতানুকুল বাসের প্রায় সবগুলোতেই প্রচন্ড গরম যাত্রীদের সাচ্ছন্দ্য কেড়ে নিচ্ছে। অথচ যাত্রীরা এজন্য বাড়তি ভাড়া দিচ্ছে। বর্তমানে বরিশাল-মাওয়া ছাড়াও বরিশাল-রংপুর, বরিশাল-চাপাইনবাবগঞ্জ এবং ভোলা-বরিশাল-খুলনা-যশোর রুটে সংস্থাটির কথিত বাতানুকুল বাস চলছে। তবে অতি নি¤œমানের এসব এসি বাস চলছে সম্পূর্ণ জোড়াতালি দিয়েই। দুঃসহ গরমে যাত্রীদেও মাথার ঘাম পায়ে গড়াচ্ছে। প্রায় প্রতিটি গাড়ীর বাতানুকুল ব্যবস্থাই ত্রুটিপূর্ণ। গাড়ীর মূল বডি থেকে শুরু করে এর দরজা পর্যন্ত জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হচ্ছে।
তবে এসব কিছুর পরেও রাষ্ট্রীয় সড়ক পরিবহন সংস্থাটির ৪৩টি বাস বরিশাল থেকে মাওয়া ছাড়াও কুয়াকাটা থেকে রংপুর, বরিশাল থেকে খুলনা-যশোর হয়ে বেনাপোল, বরিশাল-কুয়াকাটা, বরিশাল থেকে পটুয়াখালী হয়ে বরগুনা, বরিশাল থেকে খুলনা হয়ে সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করছে। যার মধ্যে কোন রুটের বাসেই যাত্রীদের সাচ্ছন্দ্যে ভ্রমনের উপযোগীতা নেই। এমনকি ২০০২ সালে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত বিআরটিসি’র একটি ‘স্পেশাল পর্যটক বাস সার্ভিস’ চালু করার পরে গত প্রায় ১৫ বছরেও এ রুটে কোন মানসম্মত বাস দিতে পাারেনি বিআরটিসি। বরিশাল থেকে ঝালকাঠী-পিরোজপুর-খুলনা-যশোর হয়ে বেনাপোল পর্যন্ত একটি বাস সার্ভিসও চালু করা হয় সে সময়ে। কিন্তু দীর্ঘ এ সড়কপথের বাস সার্ভিসটির অবস্থা এখন অতন্ত করুন। সংস্থাটির লক্করমার্কা বাস গত মাসে এ রুটে দিন দশেকের বেশী পরিপূর্ণভাবে যাত্রী পরিবহন করতে পারেনি। অবশিষ্ট কুড়ি দিনই পথে পথে যাত্রী বোঝাই গাড়ীটি বিকল হয়ে পড়ে। ফলে দেশী বিদেশী যাত্রীদের দূর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌছার পরে চলতি মাসে সার্ভিসটিই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অণ্য প্রায় সবগুলো রুটেও বিআরটিসি’র বাসের একই দূর্গতি অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে বিআরটিসির বরিশাল ডিপোর ৪৩টি সচল বাসের বিপরীতে এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে ১৯০ জনের মত। যা এ বাস ডিপোটির লাভের পথকে রুদ্ধ করছে প্রতিনিয়ত। এখানে সর্বসাকুল্যে ১শ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত জনবল পুষতে গিয়ে ডিপোটির অর্থনৈতিক অবস্থা যথেষ্ট নাজুক হয়ে যাচ্ছে।
তবে এসব বিষয়ে সংস্থাটির বরিশাল বাস ডিপো’র ম্যানেজার অপারেশন-এর সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, ‘পরিস্থিতি উত্তরনের চেষ্টা চলছে। যতদ্রুত সম্ভব বরিশাল বাস ডিপোতে ভাল মানের বাস সরবারহের ব্যাপারে সংস্থার উর্ধতন কতৃপক্ষ চেষ্টা করছেন’ বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি বরিশাল-খুলনা-বেনাপোল ও বরিশাল-কুয়াকাটা রুট দুটি বাতানুকুল বাস চালু করার লক্ষে সংস্থার সদর দফতরকে অনুরোধ জানান হয়েছে বলেও জানান তিনি। অতিরিক্ত জনবলের বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি কোন মন্তব্য না করে জনবল নিয়োগের বিষয়টি তার এখতিয়ার বহির্ভূত বলে জানান তিনি।