বাৎসরিক “মূল্যহ্রাস” প্রতারণার বানিজ্য জমজমাট

জুবায়ের হোসেন ॥ নগরীর চকবাজার এলাকার পোষাক, জুতাসহ না পণ্যের বাৎসরিক “মূল্যহ্রাস” প্রতারণার বানিজ্য জমজমাট। পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে বকেয়া পরিশোধ করে বাংলা বছরের শুরুর হালখাতা করার জন্য কম দামে বিক্রয়ের নামের “মূল্যহ্রাস” এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের চলছে মাস ব্যাপী কোটি টাকার বাণিজ্যর মিশন। ব্যবসায়ীদের প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে নি¤œ ও মধ্য আয়ের বাসিন্দারা ত্রুটিপূর্ণ ও নি¤œ মানের পণ্য কিনে হচ্ছে প্রতারিত। সব কিছু জেনেও ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে মুল্যহ্রাসের পণ্য ক্রয়ে ভীড় করছে। দাম বেশিতে সাধ্যের বাইরের মানসম্মত পণ্য ক্রয়ে ব্যর্থ হলেও অল্প দামে নি¤œ মানের পণ্য ক্রয়েও বেজায় খুশি তারা। তাই বাংলা বছরের সমাপনী মাস চৈত্রের শুরু থেকেই দল বেধে প্রতারিত হতে আসা ক্রেতাদের ভীড়ে তিল ঠাই নেই নগরীর চকবাজার, কাটপট্টি, গীর্জা মহল্লা সহ বিভিন্ন স্থান গুলোতে। ক্রেতাদের ভীড় এবং রাস্তা ও ফুটপাত আটকে রেখে বিক্রেতাদের পণ্য বিক্রয়ে চরম বিশৃংখলার সৃষ্টি হচ্ছে ঐ সকল স্থানগুলোতে। আর তাদের তৈরি করা বিশৃঙ্খলার প্রভাবে নগরীতে তৈরি হচ্ছে অসহনীয় যানজট।
নগরীর চকবাজার সহ মূল্যহ্রাসের জমজমাট আসর জমানো স্থানগুলো ঘুরে ও বিভিন্ন বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বাংলা বছরকে কেন্দ্র করে পোষাক পরিচ্ছদ বিক্রয় করা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর হালখাতা খোলার পূর্বে অভিনব পন্থায় তাদের পূরাতন, অকেজো, মার্কেট বহির্ভূত ডিজাইন, ত্রুটিপূর্ণ এবং স্বল্পমূল্যে কিনে আনা নি¤œমানের পণ্যগুলো একটি বিশেষ মূল্য ছাড়ের সাইনবোর্ড টানিয়ে বিক্রি করে থাকে। দীর্ঘদিনের চলে আসা এই ঠকবাজীর নাম দেয়া হয়েছে মূল্যহ্রাস। পহেলা চৈত্র থেকে তৈরী ও থান কাপড় বিক্রেতা, শাড়ি-জুতা সহ পরিচ্ছদের নানা পণ্য মূল্যহ্রাসের নামে বিক্রি শুরু হয় যা চলে পহেলা বৈশাখের আগ পর্যন্ত। বাহারী সাইনবোর্ড, অভাবনীয় ছাড়ের আশ্বাস ইত্যাদিকে বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতা আকৃষ্ট করা হয়। প্রকৃতপক্ষে বাজারে চলমান পণ্য ভবিষ্যতে বিক্রয়ের জন্য রেখে পূরাতন ও নি¤œমানের পণ্যগুলো প্রদর্শন করা হয় ক্রেতাদের। মূল্যহ্রাসের নামে প্রতারণার বিষয়গুলো অকপটে স্বীকার করে বিক্রেতারাও। তবে তারা এটিকে প্রতারণা মানতে নারাজ। বলেন, অনেকাংশে জেনে শুনেই কিনছেন। তাই এটি বৈধ বলেও দাবি তাদের। মূল্যহ্রাসের সময় বাজারে নি¤œ ও মধ্য আয়ের ক্রেতাদের ভীড় থাকে। এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নারীরা এগিয়ে। শুধু নামী-বেনামী তৈরি পোষাক ও থান কাপড় বিক্রেতারাই নয়, ঠকবাজী করছে নামী জুতার ব্র্যান্ড যেমন বাটা, এ্যাপেক্স এর জুতা বিক্রেতারাও। নতুন পণ্যের জন্য স্থান তৈরি, ৩/৪ বছর আগের পণ্য বিক্রি, ত্রুটিপূর্ণ মাল খালাস করাই মূল্যহ্রাসের প্রকৃত উদ্দেশ্য। এছাড়া সুযোগ নিয়ে নি¤œমানের পণ্য কম মূল্যে বিক্রয়ও চলছে ধুমসে। প্রতিদিনই মূল্যহ্রাস নিয়ে প্রায় প্রতিটি পোষাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে টুকটাক ঝামেলা হলেও বোকা ক্রেতাদের ভীড় বাড়ছেই। গতকাল শুক্রবার বিকেলে মুল্যহ্রাসের সুযোগ নিতে আসা রেহেনা পরভীন নামের এক নারী ক্রেতার সাথে আলাপ কালে তিনি জানান, সারা বছরই কেনাকাটা করেন তবে এই সময়টাতে প্রতিবছর অনেক বেশি পরিমাণ পোষাক, থানকাপড় সহ জুতা কিনে থাকেন। ঠকবাজীর বিষয়টি ধরিয়ে দিয়ে কেন কিনেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঈদের সময় গৃহপরিচারিকা সহ গ্রামের দরিদ্রদের পোষাক পরিচ্ছদ দিতে অনেক খরচ হয়। তাই এখনই কিনে রাখছেন। মানে একটু নি¤œ হলেও কম দামে পাচ্ছেন এবং নিজে ব্যবহার করবেন না তাই ত্রুটিপূর্ণ হলেও সমস্যা নেই বলেন তিনি। একই সাথে পাশে দেখা যায় তিন দিন আগে কেনা কাপড় নিয়ে এক ব্যক্তিকে দোকানীর সাথে তর্ক করতে। মোসলেহ উদ্দিন নামের ঐ ক্রেতা জানান, তিনদিন আগে স্বল্প মূল্যে তার স্ত্রী থান কাপড় ক্রয় করেন। যা প্রথমবার ধোয়ার পড়েই রং উঠে যায়। ফলপট্টি এলাকার জগন্নাথ ক্লোথ স্টোর্স এর রিপন দেবনাথ জানান, পোষাক পরিচ্ছদ এর সব পণ্যই মূল্যছাড় দিচ্ছেন তারা। নতুন বছরের হিসেব শুরু ও পূরাতন মালামাল বিক্রয়ের পরম্পরাকে মূল্যহ্রাস বলে থাকেন। মূল্যছাড় দেয়া হয় তবে তা অবশ্যই লাভ রেখে বলেন তিনি। নি¤œ ও মধ্য আয়ের ক্রেতাদের ভীড় বেশি। অধিকাংশ ক্রেতারাই ভবিষ্যতের জন্য বেশি পণ্য ক্রয় করেছেন। যে কারণে মূল্যহ্রাসকে তিনি উৎসবের আগের বেচাকেনার জন্য ক্ষতিকর বলেও মন্তব্য করেন। ঠকবাজীর বিষয়গুলো জানতে চাইলে উত্তরের বদলে একটি মুচকি হাসি দেন তিনি।