বানারীপাড়ায় লঞ্চ ডুবি ॥ ১৩ লাশ উদ্ধার

রুবেল খান/কাওসার হোসেন ॥ বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীতে স্মরণকালের ভয়াবহ নৌ ট্রাজেডির ঘটনা ঘটেছে। প্রায় অর্ধশত যাত্রী নিয়ে নিমজ্জিত হয়েছে ট্রলার আকৃতির এমভি ঐশী নামের একটি অবৈধ লঞ্চ। গতকাল বুধবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে এই ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার করা হয়েছে ১৩ যাত্রীর মৃতদেহ। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করা হয়েছে সন্ধ্যায় নিমজ্জিত হওয়া নৌযানটির অবস্থান।
এদিকে স্থানীয়দের দাবী অনুযায়ী এখনো নিখোঁজ রয়েছে আন্তত ২৫ যাত্রী। তবে পুলিশের দাবী লাশ উদ্ধারের ফলে কমেছে নিখোঁজের সংখ্যা। তাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী এক শিশু সহ ১৫ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস এবং নৌ পুলিশের পাশাপাশি সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে নৌ বাহিনীর ডুবুরী সদস্যরা। তবে রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উদ্ধার তৎপরতা বন্ধ ছিলো। আজ সকাল ৬টার পর উদ্ধারকারী নৌযান নির্ভিক এর সহযোগিতায় লঞ্চটির উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক (বন্দর কর্মকর্তা) মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
এদিকে নৌ দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে যান বরিশাল-১ আসনের সাংসদ আলহাজ¦ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, বরিশাল-২ আসনের সাংসদ এ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস, বরিশাল জেলা প্রশাসক ডা. গাজী মো. সাইফুজ্জামান, বানারীপাড়া পৌর মেয়র এ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র শীল এবং গৌরনদীর পৌর মেয়র হারিছুর রহমান হারিছ। তারা লঞ্চ ডুবিতে নিখোঁজ যাত্রীদের উদ্ধার কাজে তদারকি ছাড়াও নিহতদের লাশ দাফন কাফন এবং শেষকৃত্যর জন্য ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান।
অপরদিকে লঞ্চ ডুবির ঘটনায় বরিশাল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৯ সদস্য বিশিষ্ট এই তদন্ত কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মো. জাকির হোসেনকে প্রধান করা হয়েছে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য জেলা প্রশাসক নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত কমিটিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস, নৌ পুলিশ সহ বিভিন্ন দপ্তরের ৮ জনকে সদস্য করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং লঞ্চ ডুবির ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রী বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠি গ্রামের মনহরী ব্যবসায়ী আসলাম তালুকদার জানান, গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে দশটায় বানারীপাড়া লঞ্চ টার্মিনাল থেকে যাত্রী বোঝাই করে উজিরপুরের হাবিবপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে এমএল ঐশী প্লাস নামক লঞ্চটি। বেলা ১১টার দিকে বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের মসজিদ বাড়ি গ্রামের দাসেরহাট বাজারে ভাঙন কবলিত তীরে ঘাট দেয়ার চেষ্টা করে। এসময় নদী তীরে মাটির বড় একটি অংশ ভেঙ্গে লঞ্চটির সামনে পড়লে ঘুর্নিয়মান পানির চাপে লঞ্চটি মুর্হুতের মধ্যে নদীতে নিমজ্জিত হয়ে যায়। ৬ যাত্রী সাঁতার কেটে তীরে উঠতে পারলেও শিশু ও নারী সহ প্রায় অর্ধশত যাত্রী নিখোঁজ হয়। সাঁতার কেটে তীরে ওঠা যাত্রীদের মধ্যে হামিদা বেগমকে (৬০) আহত অবস্থায়  উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করে।
এদিকে খবর পেয়ে বানারীপাড়া থানা পুলিশ, নৌ পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধার কর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তাদের সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতায় শামিল হন স্থানীয় জেলেরা। এর পর থেকেই নদী থেকে উঠে আসে একের পর এক লাশ। দুপুর ১ টার দিকে সন্ধ্যা নদীর নয়াবাজার এলাকায় দ্বিতীয় লাশটি ভেসে উঠলে তা উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসা হয়। তিনি হলেন জিরাকাঠি গ্রামের কোহিনুর বেগম (৬৫)।
অপরদিকে উদ্ধার তৎপরতা চলাকালীন বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে স্থানীয় মসজিদ বাড়ি গ্রামের জেলে সাইদুল ও মাসুম মাছ ধরার ছোট নৌকা থেকে গ্রাফি ফেলে দূর্ঘটনা কবলিত লঞ্চটি শনাক্ত করেন। পরে ডুবুরি দল লঞ্চের ভিতর থেকে একের পর এক যাত্রীর লাশ উদ্ধার করেন। সন্ধ্যার পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত চার নারী ও এক শিশু সহ ১৩ জনের মৃত দেহ উদ্ধার করেন তারা। মৃত অবস্থায় যারা উদ্ধার হয়েছেন তারা হলেন- বানারীপাড়ার মসজিদ বাড়ি স্কুল এ্যান্ড কলেজের ৭ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী এবং আলমগীর মীর এর ছেলে মোঃ সাগর মীর (১৩), পূর্ব সৈয়দকাঠি গ্রামের চান্দু সন্নামত এর স্ত্রী রাবেয়া খাতুন (৪৫), মসজিদবাড়ি গ্রামের মৃত ইসরাইল মোল্লার ছেলে মোজাম্মেল ওরফে মুজা মোল্লা (৬০), জিরাকাঠি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিম এর স্ত্রী রেহানা বেগম (৩০), সাতবাড়িয়া গ্রামের মজিদ হাওলাদারের স্ত্রী ফিরোজা বেগম (৫৫), সৈয়দকাঠি গ্রামের বাসিন্দা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মুক্তিযোদ্ধা আঃ রাজ্জাক (৬০), উজিরপুরের হারতা গ্রামের বাসিন্দা মন্টু লাল এর ছেলে মাছ ব্যবসায়ী সুখদেব মল্লিক (৪৫), মশাং গ্রামের বাসিন্দা শান্তা (৮), নয়াকান্দি গ্রামের মোঃ জয়নাল হাওলাদার (৫৫), স্বরূপকাঠির আলকির হাট গ্রামের বাসিন্দা হিরা বেগম (২৫)। এছাড়াও সৈয়দকাঠি ইউনিয়ন আ’লীগের যুগ্ম আহবায়ক মিঠু ঘরামীর ভাই প্রবাসী মিলন ঘরামীর মৃতদেহ উদ্ধার হলেও তার স্ত্রী খুকু মনি (২৫), আড়াই বছরের শিশু পুত্র রাফওয়ান, বাইশারী সৈয়দ বজলুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের স্নাতক পরীক্ষার্থী মাইনুল ইসলাম রাজু, পূর্ব সৈয়দকাঠি  গ্রামের জাকির হাওলাদার (৪০), সাতবাড়িয়া গ্রামের আঃ মজিদ হাওলাদার (৬৫), বরগুনায় কর্মরত ফায়ার সার্ভিস কর্মী সাতবাড়িয়া গ্রামের রুহুল আমিন (৩০), মাইসা (২), জিরাকাঠি গ্রামের রিয়াদ (৫), স্বরূপকাঠির আলকির হাট গ্রামের সৈকত, হিদেল কাঠি গ্রামের অল্পনা (২৫), উজিরপুরের মশাং গ্রামের রাফি (১০), পূর্ব কেশবকাঠি গ্রামের দিদার (৮), নাফসি (৯) ও হামিদা বেগম (৪০) সহ নিখোঁজ ১৫ যাত্রীর নাম পরিচয় পাওয়া গেছে বলে পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে নিখোঁজের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে ধারনা স্থানীয়দের। উদ্ধার হওয়া মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বরিশাল জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান জানান, সন্ধ্যার পূর্বে দুটি বলগেট এর সাহায্যে নদীতে নিমজ্জিত লঞ্চটি উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নদীতে তীব্র ¯্রােতের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, নিহতের তালিকা তৈরী করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করছেন তারা। এছাড়া সরকারী ভাবে আরো যেসব সাহায্য সহায়তা করা সম্ভব সেসব সাহায্য সহযোগিতা তাদের দেয়া হবে।
অপরদিকে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স এর উপ-পরিচালক ফারুক হোসেন জানান, রাত হয়ে যাওয়ায় তাদের উদ্ধার তৎপরতা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তাদের হিসাব মতে এখন পর্যন্ত ১৩টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। আরো লাশ থাকলে তা উদ্ধারে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টার পর থেকে তৎপরতা শুরু করা হবে। উদ্ধার তৎপরতায় তাদের সঙ্গে নৌ পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএ’র ডুবরী বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম-পরিচালক (বন্দর কর্মকর্তা ও নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে নৌযানটি সন্ধ্যা নদীতে নিমজ্জিত হয়েছে সেটি সম্পূর্ণ অবৈধ। এর কোন রুট পারমিট, সার্ভে সনদ সহ প্রয়োজনীয় কোন কাগজপত্র নেই। একটি ভুয়া নাম ব্যবহার করে নৌযানটি স্থানীয় ভাবে চলাচল করে আসছিলো। তাছাড়া এটিকে লঞ্চ বলা চলে না। এটি উপরে ছাদযুক্ত একটি ট্রলার মাত্র।
তিনি আরো জানান, দুটি বলগেটের সাহায্যে নৌযানটি টেনে তোলার চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ায় উদ্ধারকারী নৌযান নির্ভিক এর সাহায্যে এমএল ঐশী নামক লঞ্চটি উদ্ধার করা হবে।
উদ্ধারকারী জাহাজ এমভি নির্ভিক এর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে গতকাল বুধবার বিকাল ৫টার দিকে তারা জাহাজ নিয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। আশাকরা যাচ্ছে সব কিছু ঠিকঠাকভাবে থেকে থাকলে আজ বৃহস্পতিবার নদীতে নিমজ্জিত লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে গতকাল বুধবার লঞ্চ ডুবির সংবাদ পেয়ে জনপ্রতিনিধিরা ছাড়াও ঘটনাস্থলে ছুটে গেছেন, বরিশাল জেলার পুলিশ সুপার এসএম আক্তারুজ্জামান, বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শহীদুল ইসলাম, উজিরপুরের নির্বাহী কর্মকর্তা ঝুমুর বালা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ, নৌ পুলিশেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোতালেব হোসেন, জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শাহাবুদ্দিন কবির, র‌্যাব-৮’র উপ সহকারী পরিচালক শাহরিয়ার, উজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ইকবাল, আগৈলঝাড়ার উপজেলা চেয়াম্যান গোলাম মর্তুজা, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লা,ভাইস চেয়ারম্যান শরীফ উদ্দিন আহমদ কিসলু, উজিরপুর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি এসএম জামাল হোসেন বানারীপাড়ার ওসি জিয়াউল আহসান, উজিরপুরের ওসি গোলাম সরোয়ার প্রমূখ।
প্রসঙ্গত বানারীপাড়ার ইতিহাসে এ ধরণের বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি এর আগে কখনও না হওয়ায় গোটা উপজেলায় শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে।