বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রায় সোয়া ৪শ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষনা মহানগরীর উন্নয়নে দলমত নির্বিশেষ সবার সহযোগীতা চাইলেন মেয়র কামাল

বিশেষ প্রতিবেদক॥ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশ বান্ধব বরিশাল মহানগরী গড়ার লক্ষে দলমত সবার সহযোগীতা চাইলেন সিটি মেয়র আহসান হাবীব কামাল। গতকাল বরিশাল মহানগরীর উন্নয়ন ও রক্ষনাবেক্ষনে নিজের জীবনের চতুর্দশতম বাজেট ঘোষনাকালে আহসান হাবীব কামাল জানান, আমাদের অর্জন অনেক হলেও সমস্যা ও চাহিদার পরিধিও ব্যাপক। এর পরেও আমরা স্বপ্ন দেখি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও উন্নত বরিশাল মহানগরীর। ‘এ নগরী আমাদের সবার’ উল্লেখ করে সিটি মেয়র কামাল বলেন, ‘সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ও সচেতন নাগরিকদের সুচিন্তিত মতামতের আলোকে আদর্শ নগরী গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।
গতকাল সকালে বরিশাল নগর ভবনে চলতি ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের জন্য ৪২৩ কোটি ২১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৫৬ টাকার উন্নয়ন বাজেট ঘোষনা কালে মেয়র বলেন, দেড় শতাধিক বছরের পুরনো বরিশাল নগরী এ অঞ্চলই নয়, সারা দেশের ঐতিহ্যকে ধারন করে আছে। মেয়র এ ঐতিহ্যকে লালনের পাশাপাশি তার পরিবেশ বান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও পূণর্ব্যক্ত করেন তার বাজেট বক্তৃতায়।
১৯৯১ সালে অধুনালুপ্ত বরিশাল পৌরসভার প্রশাসক, পরে নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও ২০০২ সালে ভারপ্রাপ্ত মেয়র থাকাকালে ইতোপূর্বে আহসান হাবীব কামাল আরো ১২ বার অধুনালুপ্ত বরিশাল পৌরসভা এবং সিটি করপোরশনের বাজেট ঘোষনা করেন। ২০১৩-এর ১৫ জুন মেয়র নির্বাচিত হবার পরে গত অর্থ বছরে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে তিনি ত্রয়োদশতম বাজেট ঘোষনা করেন। গতকালের তার চতুর্দশতম বাজেট ঘোষনাকালে প্যানেল মেয়রগন ছাড়াও কাউন্সিলরগন এবং সিটি করপেরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান হিসাব রক্ষন ও বাজেট কর্মকর্তা, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সহ অন্যান্য কর্মকর্তাগন উপস্থিত ছিলেন। এর আগে নগর পরিষদের সভায় গত অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেট ও নতুন অর্থ বছরের বাজেট অনুমোদন লাভ করে।
গতকাল বাজেট বক্তৃতায় মেয়র বরিশাল মহানগরীর চলমান ও প্রস্তাবিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিস্তারিত ব্যখ্যা উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, পাঁচ লাখ জনসংখ্যার ৫৮ বর্গ কিলোমিটারের এ মহানগরীর নিজস্ব আয়ের উৎস খুবই সীমিত। যার দ্বারা প্রশাসনিক ব্যয় মেটানোর পরে উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব। এরপরেও কোন প্রকার নতুন কর আরোপ না করে চলতি অর্থ বছরের জন্য এ বাজেট প্রনয়ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাজেট বক্তৃতায় মেয়র কামাল বিগত অর্থ বছরে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয় ৫৪ কিলোমিটার বিটুমিনাস কার্পেটিং রাস্তা নির্মান ও পণঃনির্মান, ৮ কিলোমিটার সিসি রাস্তা নির্মান, ১৪ কিলোমিটার পাকা ড্রেন নির্মান, ১টি ব্রীজ ও ১২টি বক্স কালভার্ট সহ ১৬টি ক্রস ড্রেন-এর নির্মান কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানান। এছাড়াও কাশিপুর বাজার থেকে আমতলা মোড় পর্যন্ত চার লেন সড়কের নির্মান কাজও সমাপ্তির পথে বলে জানান মেয়র। পাশাপাশ ২১ কিলোমিটার রাস্তা ও ৭ কিলোমিটার পাকা ড্রেন নির্মানের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন স্থানে ৫শ আসনের একটি অডিটরিয়ামের নির্মান কাজও প্রায় সমাপ্তির পথে।
বরিশালবাসীর বহুল প্রত্যাশিত ট্রাক টার্মিনাল প্রকল্পটিও ইতোমধ্যে একনেক-এর চুড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে। এছাড়াও নগরীর সৌন্দর্য বর্ধনে ৬১ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্প একনেক অনমোদন দিয়েছে বলে জানিয়ে সিটি মেয়র এ প্রকল্পের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। মেয়র নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যার কথা উল্লেখ করে তা নিরসনে ১১৯ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প অনুমোদনে মন্ত্রনালয়ে পেশ করার কথা জানান। এছাড়া অতি সম্প্রতি প্রবল বর্ষনে মহানগরীর রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতির কথা উল্লেখ করে সিটি মেয়র এসব সড়ক সংস্কারে সরকারের কাছে ২০ কোটি টাকার জরুরী তহবিল বরাদ্দের আবেদনের কথাও জানান।
বরিশাল মহানগরীতে বসবাসরত জনসংখ্যা প্রায় ৩০ ভাগই দরিদ্র বলে উল্লেখ করে মেয়র কামাল বলেন, এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা উন্নয়নে ‘কমিউনিটি ডেভলপমেন্ট কমিটি-সিডিসি’ ‘সিডিসি ক্লাস্টার’ ও ‘সিডিসি ফেডারেশন’ কাজ করছে। এসব কমিটির মাধ্যমে নগরীর দারিদ্রদের মাধ্যে সুপেয় পানি সরবারহ সহ সেনিটারী লেট্রিনও সরবারহ করা হচ্ছে। এছাড়া এসব দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ইতোমধ্যে ৮টি আইটি রিসোর্স সেন্টার চালু করা হয়েছে। আরো ২২টি অনুরূপ সেন্টার চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানান সিটি মেয়র। বিপনন সুবিধা সম্প্রসারনে নগরীর সদর রোডে ৭ তলা সুপার মার্কেট নির্মান কাজ শুরু কথা জানিয়ে মেয়র বলেন, নিউ সদর ঘাট রোডে ৩ তলা বিশিষ্ট আরো ১টি সিটি মার্কেট-এর নির্মান কাজও ইতোমধ্যে ৬০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া নগরীর নবগ্রাম রোড-চৌমহনীতে বেইজমেন্ট ফ্লোর সহ ১৫ তলা বহুমুখী সুপার মার্কেট ও কাটপট্টিতে আরো একটি ১০ তলা সুপার মার্কেট নির্মানের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে তিনি জানান।
নগরবাসীর স্বাস্থ্য সেবায় নানা কার্যক্রমের ব্যাখ্যা প্রদান করে মেয়র সুপেয় পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজের কথাও জানান। ইতোমধ্যে নগরীতে ২টি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট-এর নির্মান কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে বলে উল্লেখ করে ৫৭ কিলোমিটার পাইপ লাইন স্থাপনের কথাও জানান তিনি। এর ফলে নগরীতে ৩ কোটি ২০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ সম্ভব হবে বলেও জানান মেয়র। এছাড়া নগরীর রাস্তাঘাটে বিজলী বাতির উন্নয়ন ও সম্প্রসারনে নানা দিক তুলে ধরেন মেয়র। জার্মান সরকারের অর্থায়নে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিজোযন মোকাবেলা’য় বরিশাল মহানগরী রক্ষা বাঁধ, সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও কলোনী উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পর ঝুকি বিশ্লেষন ও সমীক্ষার কাজও চলতি অক্টোবরে শেষ হবে জানান মেয়র। ঐ সমক্ষিা কার্যক্রমের পরে এ লক্ষে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে জার্মান সরকার থেকে তহবিল বরাদ্বের ব্যাপরেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সিটি মেয়র সিটি করপোরেশনকে একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে সর্বস্তরের জনগনের জীবনমান উন্নয়নে তার কার্যক্রম সম্প্রসানের কথাও জানান। এলক্ষে নগরীতে একটি বৃদ্ধাশ্রম, প্রতিবন্দী ফাউন্ডেশন, কমজীবী মহিলা হোষ্টেল, পথশিশু আশ্রয় কেন্দ্র, হিজরাদের পূণর্বাশন কেন্দ্র নির্মান ছাড়াও কমিউনিটি সেন্টার নির্মানেরও ঘোষনা দেন সিটি মেয়র। এছাড়া নগরীরর জজকোর্ট-এর সামনে ফজলুল হক এভেনিউ ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মনালর সামনে দুটি ফুট ওভার ব্রীজ নির্মানের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। মেয়র আহসান হাবীব কামাল গত অর্থ বছরের ১৪৭কোটি ৪৭ লাখ টাকার সংশোধীত বাজেটও উপস্থাপন করেন।