বরিশাল বিমানবন্দর নিয়ে মন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধীরগতি

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ ১৯৮৫ সালে ১৬০ একর জমির উপর দক্ষিনাঞ্চলের একমাত্র বিমানবন্দর নির্মিত হয় বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নে। নির্মানের ১০ বছর পর ১৯৯৫ সালের ১৭ জুলাই এরোবেংগল এয়ারলাইন্সের বিমান সর্বপ্রথম ডাানা মেলে বরিশাল বিমানবন্দরের রানওয়েতে। নির্মানের পর থেকে দীর্ঘ ৩২ বছর এখানকার একমাত্র এ বিমানবন্দরে যাত্রী চাপ থাকলেও নানান টালবাহানায় একাধিকবার অচল করে রাখা হয়। দীর্ঘ জটিলতা কাটিয়ে সর্বশেষ ২০১৫ সালে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দাবীর প্রেক্ষিতে পুনরায় সচল হয় এ বিমানবন্দর। ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ বিমান ও ১০ জুলাই বেসরকারী ইউএস বাংলা উদ্বোধনের পর থেকে যাত্রী পরিবহন করে আসছে। বেসরকারী অপর জাহাজ নভোএয়ার ২০১৬ সালের জুলাই মাসে উদ্বোধনের পর একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর সার্ভিস গুটিয়ে নেয়।
বর্তমাসে বেসরকারী কোম্পানী ইউএস বাংলা ও বাংলাদেশ বিমান সপ্তাহে ৫টি ফ্লাইট যাত্রী পরিপূর্ণতায় পরিচালনা করলেও যাত্রী চাপ রয়েছে এর তিনগুণ। যাত্রী চাপ বিবেচনায় ইউএস বাংলা সপ্তাহে ৬দিন তাদের ফ্লাইট চালুর বিষয়ে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন ইউএস বাংলার এখানকার কর্মকর্তারা। বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন গুটিয়ে নেয়া বেসরকারী নভোয়ারও প্রতিদিন ২টি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে তাদের সিডিউল দিয়েছে। বেসরকারী ও সরকারী বিমানের ব্যবস্থাপকরা জানিয়েছেন তারা প্রত্যেকটি ফ্লাইটেই চাহিদার ৩/৪ গুন বেশি যাত্রী পেয়ে থাকেন। কিন্তু ৭৬ ও ৭৪ আসন বিশিষ্ট এ বিমান সার্ভিস মন্ত্রী, এমপি, মেয়র, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, প্রশাসনের উধ্বর্তন কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী সহ প্রতি সপ্তাহে ৭৫২ জন যাত্রী পরিবহন করলেও বাড়েনি বাড়েনি বিমাবন্দরের সেবার মান। ২০১৫ সালে বিমানবন্দরে সরকারী ও বেসরকারী বিমান ডানা মেললে অধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিরসনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন নানান উদ্যোগ গ্রহন করেন। মন্ত্রী প্রায়ই নিজ এলাকায় যাতায়াতের ফলে বিমাবন্দরের নানান স্থাপনা পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলেও তার বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলছে শম্ভুক গতিতে। ২০১৫ সালে বিমানের সার্ভিস উদ্বোধনকালে মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বিমানবন্দরে রানওয়ে লাইটিং, রানওয়ে প্রশস্তকরন, বাউন্ডারি নিরাপত্তা ওয়াল, পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ, ভিআইপি লাউঞ্জ, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও আবাসিক সড়ক নির্মাণ সহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জরুরী ভিত্তিতে সম্পন্নের জন্য মন্ত্রীর সফরসঙ্গী বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনের চেয়ারম্যান ও মেম্বর অপারেশনকে নির্দেশনা দেন। ঐ নির্দেশনার দু’ বছর অতিবাহিত হলেও কার্যক্রম চলছে শম্ভুক গতিতে। এমনকি এরপর কয়েকবার মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বরিশাল বিমানবন্দর পরিদর্শন করলেও চেয়ারম্যান, মেম্বর অপারেশন সহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেখা মেলেনি।
সংশ্লিস্টরা জানান, বর্ষা মৌসুমে তেমন একটা কাজ হয়নি। শুকনো মৌসুমে যদি ঢিমেতালা ভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাহলে এ উন্নয়ন কার্যক্রম মারাত্মক ভাবে ব্যহত হবে। কেননা রানওয়ে লাইটিং (এজিএল) না থাকায় ঝুঁকির পাশাপাশি সব ধরনের বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনাও ব্যাহত হচ্ছে। বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা জানান, প্রায়ই এ বিমানবন্দরে প্রশিক্ষন বিমান উঠানামা করে থাকে কিন্তু সীমানা প্রাচীর না থাকায় বিমানবন্দর এখনও অনেকাংশই অরক্ষিত থাকছে। অথচ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন একাধিবার এ বিমানবন্দর পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের জানান, নির্মাণাধীন তৃতীয় সমুদ্রবন্দরের কথা মাথায় রেখে এ বিমানবন্দরে যেন দিবা-রাত্রি যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী বিমান ওঠানামা করতে পারে সে লক্ষ্যে সকল ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। বরিশাল অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আকাশপথে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হচ্ছে না। নৌ-পথ নির্ভর দক্ষিণাঞ্চলের নৌ-রুটগুলো ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এ কারণে যত দ্রুত সম্ভব বিমানবন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করে ঢাকা-বরিশাল রুটে বিমানের ফ্লাইট বৃদ্ধি করার উপর তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানান। অথচ মন্ত্রী বার বার এ বিমানবন্দরের উন্নয়নের তাগিদ দিলেও বিমানবন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে ধীরগতিতে।
বেসরকারী ও সরকারী বিমানের ব্যবস্থাপকরা জানান, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে রানওয়ে এলাকা আগেভাগেই কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসে। আর সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারে অচল হয়ে পড়ে বিমানবন্দরটি। ফলে শীত মৌসুমে তাদের ফ্লাইট এক থেকে দেড় ঘন্টা এগিয়ে আনতে হয়েছে। যাত্রীরা জানান, অফিসের কার্যক্রম শেষ করে তারা বিকেল ৫টায় বিমান যোগে ঢাকা-বরিশাল যাতায়াত করতে পারত। এখন সেখানে বিকেল ৪টার মধ্যেই তাদের বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিমানবন্দরের চলমান উন্নয়ন কাজের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা হলেও তার সড়ক নির্মিত না হওয়ায় কোনো কাজে আসছে। বিশাল এ বিমানবন্দর এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি না থাকায় ৮ পুলিশ সদস্যকে থাকছে হচ্ছে বিমানবন্দরের একটি জরাজীর্ণ কক্ষে। ভি-ভিআইপি ও ভিআইপিদের জন্য যে লাউঞ্জটি ছিলো তা বিগত ৪ মাস ধরে বন্ধ রেখে চলছে সংস্কারের কাজ। ঐ লাউঞ্জটি জরাজীর্ন হওয়ায় সিআইপি কক্ষটিকে ঠিকাদারের মাধ্যমে জরুরী ভিত্তিতে প্রস্তুত করে সেখানেই ভিআইপিদের জন্য আপাতত স্থান করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভি-ভিআইপি ও ভিআইপিদের মূল লাউঞ্জটির বরাদ্দের টাকায় ধীরগতি থাকায় কাজও চলছে শম্ভুক গতিতে। একই অবস্থা অপর কার্যক্রমগুলোর সীমানা প্রাচীরের চারদিকে ডোবা-নালা থাকায় বর্ষা মৌসুমে ডুবে ছিলো। শুকনো মৌসুমে ঐ ডোবা-নালা ভরাট করে সীমানা প্রাচীর নির্মিত না হলে বিমানবন্দর অরক্ষিত থেকে যাবে। সংশ্লিষ্টরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে পরিচালিত হয়। একটি ফাইল এক টেবিল থেকে অপর টেবিলে যেতে সময়ক্ষেপন হয়। তবে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় মন্ত্রী’র হস্তক্ষেপে উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত হতে পারে তাদের মতামত।
বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস বাংলার বরিশাল বিমানবন্দর ইনচার্জ সাইফুর রহমান জানান, সপ্তাহে তিন দিন তাদের সার্ভিস চালু রয়েছে। কোনো কারণে বিমানের সিডিউল পরিবর্তিত হলে সন্ধ্যায় আর অবতরণ করা যাচ্ছে না। কারণ রানওয়েতে আলোর স্বল্পতা। তিনি বলেন রানওয়ে কম থাকায় বিমান দ্রুত থামানোয় ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয় এবং এতে যাত্রীরা ভয় পেয়ে থাকে। তিনি বলেন তাদের নতুন বিমান সংযোজন হলেই শীঘ্রই আরো একদিন সার্ভিস চালুর পাশাপাশি সপ্তাহে ৬ দিন সার্ভিস দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বরিশাল বিমানবন্দরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মশিউর রহমান জানান, বিমানবন্দরের আধুনিকায়নে বেশ কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। কিছু প্রকল্প টেন্ডার প্রক্রিয়ায় থাকায় তা এখনই শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে শুকনো মৌসুমে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হবে বলে তিনি আশাবাদী।