বরিশাল নদী বন্দরে তৃতীয় দফার ড্রেজিং শুরু হলেও হুমকিতে গাবখান চ্যানেল

অতিথি প্রতিবেদক॥ বরিশাল নদী বন্দরের নাব্যতা উন্নয়নে তৃতীয় দফার ড্রেজিং শুরু হলেও বাংলার সুয়েজ খাল খ্যাত ‘গাবখান চ্যানেল’টি ‘মংলাÑঘাশিয়াখালী চ্যানেল’এর ভাগ্য বরন করতে যাচ্ছে বলে আশংকা ব্যক্ত করেছেন নৌ বিশেষজ্ঞগণ। নাব্যতা সংকটে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বরিশালÑভোলাÑলক্ষ্মীপুর ও বরিশালÑবাউফল নৌপথের ‘সাহেবের হাট ক্যানেলটি’। এরফলে সারা দেশের সাথে মংলা সমুদ্র বন্দর সহ খুলনা ও নওয়াপাড়া নদী বন্দরের নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে শংকিত বিশেষজ্ঞগন। সুন্দরবনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের পরে অনেকটা বিলম্বে হলেও নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে বিআইডব্লিউটিএ নাব্যতা হারানো মংলাÑঘাশিয়াখালী চ্যানেলটির উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে মাস তিনেক আগে। আগামী জুনের মধ্যেই চ্যানেলটি উন্নয়নের প্রাথমিক পর্ব সম্পন্ন করে হালকা থেকে মাঝারী মাপের নৌযানসমুহ চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হতে পারে। ফলে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর সহ খুলনা ও নওয়াপাড়ার সাথে নৌযোগাযোগ ব্যাবস্থা নির্বিঘœ হবার পথ অনেকটাই সুগম হবে। তবে চ্যানেলটির পরিপূর্ণ ভাবে উন্মুক্ত হতে আগামী শীত মৌসুমের শেষভাগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব এবং ভাড়াকরা বেসরকারী ড্রেজার সহ ১২টি ড্রেজারের সাহায্যে মংলাÑঘাশিয়াখালী চ্যানেল উন্নয়ন চলছে। একটি চীনা কোম্পানীও ইতোমধ্যে খনন শুরু করেছে। কিন্তু ইতোমধ্যে ঐ একই নৌপথের ঝালকাঠী ও পিরোজপুরের মধ্যবর্তী ‘গাবখান চ্যানেল’টির কয়েকটিস্থানে অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় ভাটার সময় পণ্য ও জ্বালানীবাহী নৌযান চলাচলে বিপত্তি সৃষ্টি হচ্ছে। চ্যানেলটির ঝালকাঠী প্রান্তে এবং গাবখান এলাকায় বাংলাদেশÑচীন মৈত্রী সেতুটির লাগোয়া পশ্চিম পাশেই পূর্ণ ভাটায় নাব্যতা ১০ফুটে নেমে আসছে। ফলে জ্বালানী ও পণ্যবাহী বড় মাপের নৌযানগুলো চলাচল করছে অতি সন্তর্পনে। বৃটিশ যুগে ঝালকাঠীর ‘ধানসিড়ি নদী’তে একটি পণ্যবাহী জাহাজ ডুবির ফলে নৌযোগাযোগ রক্ষায় কৃত্রিমভাবে খনন করে গাবখান খালটিকে বিকল্প নৌপথ হিসেব চালু করা হয়। সে থেকে প্রায় ১৫কিলোমিটার দীর্ঘ ঐ চ্যানেলটির দু প্রান্তে ‘হটলাইন টেলি যোগাযোগ’এর মাধ্যমে ‘ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক সিষ্টেম’এ নৌ যোগাযোগ বিদ্যমান ছিল। এর ফলে চ্যনেলটির যেকোন প্রান্ত থেকে কোন ভাড়ী নৌযান প্রবেশ করলে অপরপ্রান্ত থেকে সব নৌযানের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হত। তবে ২০০৪-০৫ অর্থ বছর থেকে ২০০৬-০৭ সময়কালে প্রায় ১৫কোটি টাকার দেশীয় তহবিলের সাহায্যে চ্যনেলটি খনন করে এর নাব্যতা উন্নয়ন ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি করা হয়। ফলে ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক সিষ্টেমের ঐ নৌ পথটি ‘বোথওয়ে ট্রাফিক সিস্টেম’এ উন্নীত হয়। চ্যানেলেটির উভয় প্রান্ত থেকেই অনায়াসে নৌযান প্রবেশ ও চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে মংলা ছাড়াও খুলনা ও নওয়াপাড়ার সাথে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম সহ সারা দেশের নৌযোগাযোগ সহজতর হয়। মংলা ও খুলনায় পণ্য এবং যাত্রী পরিবহন সহ পশ্চিম জোনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানী পরিবহনও সহজতর হচ্ছিল। বিআইডব্লিউটিএ ইজারা প্রদানের মাধ্যমে নৌপথটি ব্যাবহারকারীদের কাছ থেকে অর্থ আয়েরও ব্যবস্থা করে।
কিন্তু ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হবার পর থেকে তার রক্ষনাবেক্ষন ও উন্নয়নে বিআইডব্লিউটিএ তেমন কোন আগ্রহ দেখাচ্ছেনা। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গনমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।
এমনকি বিআইডব্লিউটিএ’র সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ড. সামসুদ্দোহা খন্দকারও একাধিকবার গাবখান চ্যানেলটি উন্নয়নের অঙ্গিকার করেন। কিন্তু কতৃপক্ষের উদাসীনতা ও অবহেলায় গত কয়েক বছর ধরে গাবখান চ্যানেলের রক্ষনাবেক্ষন ও উন্নয়ন হয়নি। এব্যপারে গতকাল বিআইডব্লিউটিএ’তে সদ্য যোগদানকারী চেয়ারম্যান কমোডর এম মোজাম্মেল হক-এর দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সাথে দেখবেন বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি কীর্তনখোলা ও তেতুলিয়া নদীর সংযোগকারী ‘সাহেবের হাট ক্যানেলটি’র নাব্যতা হারানো বরিশাল প্রান্তের ডেজ্রিং-এর বিষয়টি নিয়েও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দেবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, বরিশাল সহ সমগ্র দক্ষিনাঞ্চলের সাথে দেশের সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের সংক্ষিপ্ত নৌপথের ‘সাহেবের হাট ক্যানেল’টি ভয়াবহ ঝুকির মুখে। নৌপথটির পূর্ব প্রান্তের টুংগিবাড়ীয়া ও লাহারহাট এলাকায় একটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গত তিন বছর ধরে ড্রেজিং করা হলেও কাজটি মানসম্মত না হওয়ায় নাব্যতা উন্নয়ন হচ্ছেনা। তবে ক্যানেলটির মূল উৎস বরিশাল প্রান্তের নাব্যতা উন্নয়ন না করায় নৌ যোগাযোগে বন্ধই হয়ে গেছে। এতে করে পূর্ব প্রান্তের বার বার ড্রেজিং করে প্রবাহ সৃষ্টি না হওয়ায় কোন সুফল মিলছে না বলে জানিয়েছেন একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র। ঐ নৌপথটির পশ্চিম প্রান্তে এখন ভাটার সময় গভীরতা ১মিটারেরও কম। ফলে পূর্ণ জোয়ারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দক্ষিনাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথটি। ভাটার সময় বরিশাল থেকে প্রায় ২০কিলোমিটার নৌপথ ঘুরে নৌযানগুলোকে ভোলা ও লক্ষ্মীপুরে পৌছতে হচ্ছে। বরিশালের লঞ্চ মালিক সমিতি দীর্ঘদিন ধরেই এ নৌপথে ড্রেজিং করার দাবী জানিয়ে আসছে।
এদিকে বরিশাল নদী বন্দরে চলতি শুষ্ক মৌসুমের তৃতীয় দফার যে ড্রেজিং চলছে তা শেষ করতে আরো দিন পনের লাগবে বলে জানা গেছে। এর আগে দু’দফায় এ বন্দরে আপদকালীন ড্রেজিং করা হলেও তা ছিল অসম্পূর্ণ। জরুরী ভিত্তিতে মংলাÑঘাশিয়াখালী চ্যানেলটির নাব্যতা উন্নয়নে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রায় সবগুলো ড্রেজার সেখানে মোতায়েন করায় বরিশাল বন্দরের নাব্যতা উন্নয়ন কাজ ইতোপূর্বে দু দফায়ই বন্ধ হয়ে যায়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ নদী বন্দরের নাব্যতা উন্নয়ন সহ বন্দর সচল রাখতে এখানে প্রায় দেড় লাখ ঘন মিটার পলি অপসারন করতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ইতোপূর্বে দু’দফায় প্রায় ৮০হাজার ঘন মিটার পলি অপসারন করা হলেও বাকি রয়ে গেছে অর্ধেক কাজ।
তবে আগামী দিন পনেরর মধ্যে ৮০হাজার ঘন মিটার পলি অপসারন করে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ নদী বন্দরটি পরিপূর্ণভাবে সচল করার ব্যপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী এম এ মতিন।