বরিশাল জেলায় মাছের উৎপাদন বেড়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ জেলায় গত অর্থ বছরে প্রায় চল্লিশ হাজার মেট্রিক টন মাছ বেশি উৎপাদন হয়েছে। এছাড়াও সাড়ে আট হাজারেরও বেশি মেট্রিক ইলিশ মাছ উৎপাদিত হয়েছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে এ জেলায় বেশি মাছ উৎপাদিত হয়েছে। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ পালন উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বরিশাল মৎস্য ভবনের সম্মেলন কক্ষে ওই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা তপন কুমার পাল জানান, বরিশাল জেলায় ২০১৫-১৬ উৎপাদন বছরে মাছের চাহিদা ছিল ৫৩১২৪ দশমিক শূন্য ৬ মেট্রিক টন। সেখানে উৎপাদন হয়েছে ৯১৬৩৭ দশমিক ২৩ মেট্রিক টন। ওই অর্থ বছরে জেলায় ৩৮৫১৩ দশমিক ১৭ মেট্রিক টন মাছ বেশি উৎপাদন হয়েছে। অপরদিকে এই অর্থ বছরে ইলিশ মাছ উৎপাদন হয়েছে ৪০ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩১ হাজার ৪শ’ মেট্রিক টন। গত অর্থ বছরে ইলিশের বাড়তি উৎপাদন হয়েছে ৮ হাজার ৬শ’ মেট্রিক টন।

বিগত ২০১১-১২ সালের পর থেকে জেলায় ইলিশসহ সকল মাছের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হয়েছে। ২০১১-১২ সালে ইলিশ উৎপাদন হয় ২৭ হাজার ৬শ’ মেট্রিক টন। একই অর্থ বছরে অন্য মাছ উৎপাদিত হয়েছে ৩৬ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে ইলিশ ২৮ হাজার ২২১ ও অন্য মাছ ৪১ হাজার ৪১৪ মেট্্িরক টন। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ইলিশ ২৯ হাজার ৫১২ ও অন্য মাছ ৪৩ হাজার ৮১০ মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে অন্যান্য মাছ উৎপাদিত হয়েছিলো ৫৩ হাজার ২৫৩ মেট্রিক টন।

মৎস্য কর্মকর্তা জানান, ৩ হাজার ১৭১ দশমিক ৯৬ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বরিশাল জেলায় মৎস্য সম্পদের উৎস্য হলো-নদী ও মোহনা, খাল, বিল, প্লাবন ভুমি, পুকুর মৌসুমী জলাশয় ও বোরোপিট। এক লাখ ৭০ হাজার ৯২৬ হেক্টর পরিমান এলাকা থেকে মাছ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে নদী ও মোহনা ১০ লাখ ৩ হাজার ২৪৯ হেক্টর, বিল ১ হাজার ৪৬১ হেক্টর, খাল ১৩ হাজার ৩৮০ হেক্টর, প্লাবন ভুমি ৩৩ হাজার ৫২ হেক্টর, পুকুর ৮ হাজার ৮৫২ দশমিক শূন্য ৪ হেক্টর, মৌসুমী জলাশয় ১০ হাজার ৭৬৫ হেক্টর ও বোরোপিট ৫৭ হেক্টর।

জেলার ২ কোটি ৪১ লাখ ৪ হাজার ৭৩০ জন বাসিন্দাদের মধ্যে ৪৪ হাজার ৪২৩ জন মাছ চাষী রয়েছে। এছাড়া জেলে রয়েছে ৭৩ হাজার ৫৯৪ জন।

তিনি বলেন- মৎস্য হ্যাচারী আইন ২০১০ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৬টি হ্যাচারীকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া মৎস্য খাদ্য আইন ২০১০ বাস্তবায়নের জন্য ৪৭টি খাদ্য বিক্রেতাকে লাইসেন্স এর আওতায় আনা হয়েছে। যার ফলে গুরগত মান সম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

মৎস্য কর্মকর্তা আরো বলেন, বরিশাল জেলা ১০ উপজেলায় ২০১৬-১৭ সালের জাটকা নিধন প্রতিরোধ কর্মসূচীতে ৪৪৮টি অভিযান, ২’শটি মোবাইল কোর্ট, ৪৪ দশমিক ১৫৮ মেট্রিক টন জাটকা জব্দ, ৩৫ দশমিক ১৯ লাখ মিটার অবৈধ জাল আটক, ৩১৯টি দায়েরকৃত মামলা, ১৩ দশমিক ২৯ লাখ টাকা জরিমানা এবং ৯০ জনকে জেলে পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে ১০ উপজেলায় ৪৭০টি অভিযান, ২১৩টি মোবাইল কোর্ট, ১ দশমিক ৫০৭ মেট্রিক টন আটককৃত ইলিশ, ৬ দশমিক ৫০৬২ লাখ মিটার অবৈধ জাল জব্দ, ১৫৩টি দায়েরকৃত মামলা, ৩ দশমিক ৪১৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ৮৬ জনকে জেলে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারী থেকে ১৫ জানুয়ারী পর্যন্ত মৎস্য সম্পদ ধ্বংসকারী অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ করণে বিশেষ অভিযানে ১৩৯টি অভিযান, ৫০টি মোবাইল কোর্ট, ১ দশমিক ৩০৯ মেট্রিক টন জাটকা জব্দ, ৭ দশমিক ১৩৬ লাখ মিটার অবৈধ জাল, ৫৯টি মামলা, ১ দশমিক ৫৯ লাখ টাকা জরিমানা এবং ২৭ জনকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। এ অভিযানে ১৪০টি বেহুন্দি জাল ও ১৪১টি অন্যান্য জাল উদ্ধার করা হয়।

তিনি জানান, ২০১৫-১৬ বছরে ইকোফিস প্রকল্পের মাধ্যমে ১৫৬১ জেলেদের প্রতি পরিবারকে ৫ হাজার টাকার জাল/হাঁস-মুরগী/ ছাগল বিতরণ করা হয়। এছাড়া ২০১৬-১৭ বছরে ভিজিএফ সহায়তা কার্যক্রমে ৪৩ হাজার ৬৪৪ জেলেকে ৮৭২ দশমিক ৮৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়। অন্যদিকে ইলিশ জেলেদের দূর্যোগে মরনোত্তর সহায়তা কার্যক্রমে জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৫-১৬ বছরে ৬ জেলের প্রতি পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ এককালীণ প্রদান করা হয়।

প্রসঙ্গত: জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষ্যে ১৯ জুলাই মৎস্যচাষী, এনজিও এবং সম্প্রসারণ কর্মীদের অংশগ্রহনে র‌্যালী বের করা হবে। এছাড়া সমাবেশ, আলোচনা ও জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধন করবেন অতিথিরা। পরে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হবে, ২০ জুলাই মৎস্য সেক্টরে বর্তমানে সরকারের অগ্রগতি বিষয়ে আলোচনা সভা ও প্রামান্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে, ২১ জুলাই মাছে ফরমালিন ব্যবহার বিরোধী অভিযান এবং মৎস্য সংরক্ষন আইন বাস্তবায়ন জোরদার করণের লক্ষ্যে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হবে, ২২ জুলাই স্কুল-কলেজে মৎস্য চাষ বিষয়ক আলোচনা ও প্রামান্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে, ২৩ জুলাই হাট বাজার/ জনবহুল/ স্থানে মৎস্য চাষ ভিত্তিক উদ্ধুব্ধকরণ বিষয়ক ভিডিও প্রদর্শন করা হবে এবং ২৪ জুলাই জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের মূল্যায়ন সভা, পুরষ্কার বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সংবাদ সম্মেলনে বরিশাল জেলার অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।