বরিশাল অঞ্চলে রোয়ানুর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতি ৩৫২ কোটি টাকারও বেশি

রুবেল খান ॥ ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু’র প্রভাবে বরিশাল অঞ্চলে নদী, সড়ক, মাছ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যার মধ্যে ২’শ ৮৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এবং ব্রিজ ও কালভার্ট সহ ৩৫১ দশমিক ৭ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৪১ হাজার ৬৮ হেক্টর পরিমান জমির ফসল ও প্রায় সাড়ে ২৩ কোটি টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে। যার মোট আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমান ৩৫২ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, মৎস্য ও কৃষি বিভাগ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সম্ভব্য ক্ষতির চিত্রও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দপ্তরগুলোর প্রধানরা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গত ২১ মে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু। তবে আঘাত হানার তিন দিন পূর্বে থেকেই রোয়ানু’র প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলে মাঝারি থেকে বড় ধরনের বৃষ্টিপাত এবং ঝড়োহাওয়া বইতে থাকে। এতে বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের ৬ জেলায় বেড়িবাঁধ, নদীর প্রতিরক্ষা বাদ, রাস্তাঘাট এবং ভবন ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার বানিতে ডুবে যায় ফল ও সব্জির বাগান এবং পানিতে ভেসে গেছে পুকুর ঘের ও জলাশয়ের মাছ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড
পানি উন্নয়ন বোর্ড বরিশালের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু’র প্রভাবে ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি এবং পিরোজপুর জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে ২৮৫ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এবং প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব পাওয়া গেছে। যার সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমান ১৩১ কোটি ৮৬ লক্ষ ৭৯ হাজার টাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারি প্রকৌশলী মো. সোহাগ জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে ৬৫ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া আংশিক ক্ষতি হয়েছে ২১৯ দশমিক ৮ মিটার। এর পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের ৫ হাজার ৩৮৭ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ সম্পূর্ণভাবে এবং ১৫০ মিটার আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর মধ্যে বরিশাল জেলায় এক হাজার ১২ মিটার সম্পূর্ণ এবং এক হাজার ৭০ মিটার বেড়িবাঁধ আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি ৪’শ ১২ মিটার সম্পূর্ণ এবং ১৫০ মিটার আংশিক প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সব মিলে এ জেলায় ক্ষতির পরিমান নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
ঝালকাঠি জেলায় ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার সম্পূর্ণ এবং ৭৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি ১৮০ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। সব মিলেয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমান নির্ধারন করা হয়েছে ১৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫ হাজার টাকা।
ভোলা জেলার একাংশে ৬৫০ মিটার সম্পূর্ণ এবং ৭ দশমিক ৯২০ কিলোমিটার আংশিক বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি ২ দশমিক ১৩৫ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমান নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
ভোলা জেলার অপর অংশে ১৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার সম্পূর্ণ এবং ৭৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি এক হাজার ৫৫০ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধেরও ক্ষতি হয়েছে। এই অংশে সব মিলেয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমান নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ কোটি ৪০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
পটুয়াখালী জেলার একাংশে ১৪ দশমিক ২০ কিলোমিটার সম্পূর্ণ এবং ১৯ দশমিক ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে জেলার এই অংশে প্রতিরক্ষা বাঁধের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
জেলার কলাপাড়া অংশে ৪ হাজার ৭৪০ মিটার সম্পূর্ণ এবং ১৫ হাজার ৫শ মিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অংশের আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে সব মিলেয়ে ১৩ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
বরগুনা জেলায় ১১ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সম্পূর্ণ এবং ২৮ দশমিক ১১০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি ৯০০ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতি হয়েছে। সব মিলেয়ে এ জেলায় আর্থিক ক্ষতির পরিমান নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ কোটি ৪ লাখ টাকা।
এলজিইডি
এদিকে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় অধিদপ্তর (এলজিইডি) বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুতে তাদের অধিনস্ত রাস্তা, ব্রিজ ও ভবনের ১৯৬ কোটি ৬২ লাখ ৩২ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫১ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার রাস্তার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যার মধ্যে ৬ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার কাঁচা এবং ৩৪৪ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার পাকা রাস্তা রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার মধ্যে উপজেলা সড়ক ১৩৩ দশমিক ৮২৫ কিলোমিটার, ইউনিয়ন সড়ক ৯৫ দশমিক ৫১৬ কিলোমিটার ও গ্রামীণ সড়ক ১২২ দশমিক ১৪ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সড়কের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমান দাড়িয়েছে ৪৬ কোটি ৯৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৯টি ব্রিজ। ২ হাজার ২৬৭ মিটার ব্রিজের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ৭টি ভবনের আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৬২ লাখ ৫ হাজার টাকা।
এর মধ্যে পটুয়াখালী জেলায় ১৩৬ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার রাস্তা ও ৪টি ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরগুনা জেলায় ৪১ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার রাস্তা ও ৪৮টি ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরিশাল জেলায় ১৭ দশমিক ০৪ কিলোমিটার রাস্তা ও ৩টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভোলা জেলায় ১১৩ কিলোমিটার রাস্তা, ১টি ব্রিজ ও ৪টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পিরোজপুর জেলায় ২২ কিলোমিটার রাস্তা ও ২টি ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ঝালকাঠি জেলায় ২১ দশমিক ১২ কিলোমিটার রাস্তা ও ৪টি ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মৎস্য সম্পদ বিভাগ
অপরদিকে মৎস্য সম্পদক অধিদপ্তর বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিচালক জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু’র প্রভাবে বন্যায় মাছ চাষের পুকুর, দিঘি এবং ঘেরের ২৩ কোটি ৮৭ লাখ ২৯ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৯ হাজার টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। যার মধ্যে ১ হাজার ৯১২ দশমিক ৬৪ একর পরিমান জমিতে ২৩ হাজার ৯৭৮টি পুকুর, দিঘি এবং ঘেরের ১৮ লাখ ৫ হাজার ৪২০ কেজি মাছ, ৫৭ হাজার ৩০০ কেজি পরিমান চিংড়ি ও ৮৮ দশমিক ০১ লক্ষ মাছের পোনা ভেসে গেছে।
ভেসে যাওয়া মাছের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা, চিংড়ির মূল্য ১ কোটি ৩৭ লাখ এবং পোনার আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১০ লক্ষ ৭৮ হাজার টাকা। অবকাঠামোগত ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৮ লাখ টাকা।
এর মধ্যে বরিশাল জেলার ১০২টি ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘি ও ঘেরে ১৭ লাখ ৪০ হাজার, পটুয়াখালী জেলার ২ হাজার ৩০২টি ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘি ও ঘেরের ৬ কোটি ৬ লাখ ১৫ হাজার, ভোলা জেলার ৪ হাজার ৩৫৯টি ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দিঘি ও ঘেরের ১৪ কোটি ৫১ লাখ ১০ হাজার, বরগুনা জেলার ১৭ হাজার ২১৫টি ক্ষতিগগ্রস্ত পুকুর, দিঘি ও ঘেরের ৩ কোটি ১২ লাখ ৬৪ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করেছে মৎস্য বিভাগ।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ
এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণাঞ্চলের ৯৯ হাজার ৮৫২ হেক্টর আবাদী জমির মধ্যে ৪১ হাজার ৬৮ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ২২২ হেক্টর জমির অউস বীজতলা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। এছাড়া ৪ হাজার ৮৪৮ হেক্টোর উফশী ও ৩৭৪ হেক্টর স্থানীয় বীজতলাও পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ।
২০ হাজার ১৭৪ হেক্টর আউশ এর জমি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২১৪ হেক্টর জমিতে উফশী এবং ৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় ফসল রয়েছে। তাছাড়া ৮২০ হেক্টর জমিতে বোনা আমন, এক হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে পান বরজ, এক হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে তিল, ২ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে মরিচ, ৭৫ হেক্টর জমিতে আমড়া এবং ৯ হাজার ৮৯৭ হেক্টর জমির শাকসবজীর বাগান বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে এর পরিমান আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে প্রাথমিকভাবে তৈরী করা ক্ষয়ক্ষতির পরিমান ঢাকায় স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ ছাড় দিলে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরন এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, বেড়িবাঁধ এবং প্রতিরক্ষা বাঁধ সংস্কার এবং নির্মাণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধানরা জানিয়েছেন।