বরিশালে বেড়েছে নারী নির্যাতন

জুবায়ের হোসেন॥ নিত্যনতুন আইন ও নীতিমালা প্রনয়ন এবং  প্রয়োগে বর্তমান আধুনিক সমাজের নারীদের রক্ষা করতে পারছে না। পুরুষের সহযোদ্ধা হিসেবে মর্যাদা পাওয়া নারীরা আজ প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের। নারীর প্রতি এই সহিংসতা হ্রাস পাওয়াতো দূরের কথা, প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে। সমানহারে নারীরা ঘরে ও বাইরে  নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।  প্রতিদিনই যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও খুন, স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের শ্লীতাহানী,উত্যক্ত, ধর্ষণ, নগ্ন ভিডিও চিত্র ধারনের ঘটনা ঘটছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা গেছে, গৃহে স্বামীর দ্বারা মানষিক নির্যাতনের শিকার ৮১ দশমিক শূন্য ৬ ভাগ নারী। শারীরিক নির্যাতনের শিকারের হয় ৬৪দশমিক শূন্য ৬ ভাগ। যৌন নির্যাতনের শিকার ৩৬ দশমিক শূন্য ৫ ভাগ । “পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ সুরক্ষা আইন ২০১০” এর কোন সুফল নেই। চলতি মাসে বরিশাল বিভাগে নির্যাতন করে ৫ নারীকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষনের পর ভিডিও চিত্র ধারন করা হয়েছে ২ জনের। স্কুলে ধর্ষন হয়েছে দুই ছাত্রী, মা-বাবা ও ভাইকে বেধে ধর্ষন করা হয়েছে ছাত্রীকে। অপহরনের পর গনধর্ষনের শিকার হয়েছে কিশোরী। আর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ৪ জন। এই চিত্র শুধু ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
গত ৯ সেপ্টেম্বর বাকেরগঞ্জে তানিয়া আক্তার (১৮) নামের গৃহবধূর আত্মহত্যা করে বলে স্বামীর পরিবার প্রচার করেছিলো। আত্মহত্যার কারন হিসেবে তার শ্বশুড় বাড়ির লোকজন জানায় যে, সে পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত ছিল। কিন্তু ঘটনা সন্দেহজনক হওয়ায় পুলিশ তার স্বামী , শ্বশুড়, শাশুরিকে আটক করেছে।
১৩ সেপ্টেম্বর গৌরনদী উপজেলায় স্বামীর লাঠির আঘাতে চার সন্তানের জননী মুকুলি বেগম (৪৫) নিহত হন। ১৫ সেপ্টেম্বর বরগুনা থেকে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া কিশোরীকে ভাড়ায়চালিত মোটর সাইকেল চালক অপহরন করে। চারদিন আটকে রেখে গনধর্ষন করে। কিশোরী কন্যার পরিবার নিখোঁজের ঘটনায় মামলা করার পর রোববার ২১ সেপ্টম্বর উদ্ধার হয় সে।  ১৬ সেপ্টেম্বর উজিরপুর হস্তিক্ষুদ্র গ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয় বাসন্তী বাড়ৈ নামের এক গৃহবধূর অর্ধদগ্ধ লাশ। যৌতুকের দাবীতে স্বামী রতন শীল তাকে প্রথমে বিষপান করিয়ে হত্যার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অজ্ঞান অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর লালমোহনের কোড়ালমারার রিনা বেগম (২১) নামের এক গৃহবধূর লাশ ফেলে পালিয়ে যায় তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন। বলা হয় সে অসুস্থ ছিল। কিন্তু মুখে বিষের গন্ধে চিকিৎসকের সন্দেহ হলে পালিয়ে যায় তারা। এর একদিন পূর্বেই একই গ্রামে লাইজু বেগম (২৭) নামের দুই সন্তানের জননীকে রশি বেধে আত্মহত্যার কথা বলে প্রচার করে চালানো হয়।
এছাড়া ১৯ সেপ্টেম্বর যৌতুকের জন্য গরম খুন্তি দিয়ে জোসনা বেগম নামের এক সন্তানের জননীকে ছ্যাকা দেয়া হয়। ৫ সেপ্টেম্বর ভান্ডারিয়ায় ফেন্সি আক্তার নামের এক কিশোরীর বিষপানে আত্মহত্যা করেছে। ৯ সেপ্টেম্বর উজিরপুরে গুঠিয়া আইডিয়াল কলেজের ছাত্রী সোনিয়া আক্তার আত্মহত্যা করে।
১৩ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদে রোজিনা আক্তার নামে এক তরুনী আত্মহত্যা করেছে। ৭ সেপ্টেম্বর নলছিটিতে বাবা ভাইকে বেধে ৮ম শ্রেনীর এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর বানাড়ীপাড়ায় যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছে খালিশাকোঠা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেনীর ছাত্রী। ১১ সেপ্টম্বর সদর উপজেলার রায়পাশা কড়াপুরে পপুলার মাধমিক বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীকে বিদ্যালয় কক্ষেই ধর্ষণ করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর বানারীপাড়ায় এক যুবতীকে ধর্ষন ও তার ভিডিও চিত্র ধারনের ঘটনা ঘটেছে। ১৪ সেপ্টেম্বর আগৈলঝাড়ায় কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষন ও তার ভিডিও চিত্র ধারন করে ছড়িয়ে দেয়া হয়। একই দিনে মেহেন্দিগঞ্জের ৫ম শ্রেনীর ছাত্রী ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে। এ সকল ঘটনায় মামলা, মানববন্ধন সহ নানা কর্মসূচী পালন করা হলেও  বিচার হচ্ছে না। তাই এমন ঘটনা বেড়েই চলছে।
এ বিষয়ে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রাশিদা বেগম, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা একেএম আখতারুজ্জামান, মহিলা পরিষদ সভানেত্রী রাবেয়া খাতুন সম্মিলিত ভাবে বলেন, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ পাশ হলেও এখন পর্যন্ত আইনটির প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। আইনটি কেবল পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য। এজন্য পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কারো দ্বারা নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হলেও নির্যাতনকারীকে এই আইনের আওতায় আনা যায় না। এছাড়াও আদালত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী রাহিনী, প্রয়োগকারী কর্মকর্তাসহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের যথাযথ সমন্বয়হীনতায় আইনটির সুফল না পাওয়ার অন্যতম কারন।