বরিশালে তালাক বেড়েছে দ্বিগুণ

রুবেল খান॥ নগরীর দম্পতিদের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে তালাকের সংখ্যা। শুধুমাত্র নগরীতেই চলতি বছরের গত ৯ মাসে পৃথক হয়েছে ৯৮ জুটি দম্পত্তি। যার গড় অনুপাতে গত দুই বছরের তুলনায় এ বছর তালাকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন। এদিকে পরিসংখ্যান অনুযায়ী তালাকের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছেন নারীরা। প্রতি বছরের ন্যায় পুরুষের তুলনায় দ্বিগুন বেশি নারীরাই তাদের স্বামীদের তালাক দিচ্ছেন। তবে এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট জনেরা। তাদের দাবী কাবিনের টাকা থেকে রক্ষা পেতেই স্ত্রীকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে তালাক। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের সালিশ পরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ নগরীতে অসংখ্য হারে বেড়ে চলেছে তালাকের ঘটনা। এর ফলে একের পর এক ভেঙ্গে চলেছে সংসার। পরকিয়া প্রেম, স্বামী-স্ত্রীর মতবিরোধ, শ্বশুর-শাশুড়ীর নির্যাতন সহ বিভিন্ন পারিবারিক বিরোধের ফলেই তালাক বাড়ছে বলে মনে করছেন সালিশ পরিষদের সংশ্লিষ্টরা। এ বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বরিশাল নগরীতে চলতি মাসের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯৮টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে। আর স্বামীদের তালাক দেয়ার প্রতিযোগিতায় বেশ এগিয়ে রয়েছে স্ত্রীরা। সে অনুযায়ী গত ৯ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরুষরা ৩৬ স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। কিন্তু তাদের তুলনায় নারীরা তালাক দিয়েছেন দ্বিগুন। ওই সময়ের মধ্যে ৬২ জন নারী তাদের স্বামীদের তালাক দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরের মে মাসে সর্বোচ্চ ১৬টি, আগষ্টে ১৫টি এবং জানুয়ারিতে তালাকের (২ এর পাতার ১ কলামে দেখুন)
মাধ্যমে সর্বনি¤œ ৮টি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৮টি তালাকের মধ্যে স্বামী কর্তৃক ২টি ও স্ত্রী কর্তৃক ৬টি তালাক দেয়া হয়েছে।  ফেব্রুয়ারিতে ৯টি তালাকের মধ্যে স্বামী কর্তৃক ৪টি ও স্ত্রী কর্তৃক ৫টি, মার্চে ১১টি তালাকের মধ্যে স্বামী কর্তৃক ৫টি ও স্ত্রী কর্তৃক ৬টি, এপ্রিলে ১০টি তালাকের মধ্যে স্বামী কর্তৃক ৬টি ও স্ত্রী কর্তৃক ৪টি, মে মাসে ১৬টি তালাকের মধ্যে স্বামী কর্তৃক ৫টি ও স্ত্রী কর্তৃক ১১টি, জুনে ৯টি তালাকের মধ্যে স্বামী কর্তৃক ৪টি ও স্ত্রী কর্তৃক ৫টি, জুলাইতে ৯টি তালাকের মধ্যে স্বামী কর্তৃক  ২টি ও স্ত্রী কর্তৃক ৭টি, আগষ্টে ১৫টি তালাকের মধ্যে স্বামী কর্তৃক ৬টি ও স্ত্রী কর্তৃক ৯টি এবং সেপ্টেম্বরে সর্বমোট ১১টি তালাকের মধ্যে স্বামী কর্তৃক ২টি ও স্ত্রী কর্তৃক ৯টি তালাক দেয়া হয়েছে।
২০১৩ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শুধু মাত্র বরিশাল নগরীতে ১৩৪টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে। এ বছর পুরুষ কর্তৃক ৪৫ স্ত্রীকে তালাক দেয়া হলেও নারী কর্তৃক দ্বিগুন ৯০জন স্বামীকে তালাক দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৮টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬টি, মার্চে ৯টি, এপ্রিলে ১৪টি, মে’তে ৭টি, জুনে সর্বোচ্চ ১৮টি, জুলাইতে ১২টি, আগষ্টে ১৪টি, সেপ্টেম্বরে ১৪টি, অক্টোবরে ১২টি, নভেম্বরে ১০টি ও ডিসেম্বরে ১০টি তালাকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে।
এছাড়া ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তালাকের ঘটনা ঘটেছে ১২৪টি।
তালাকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী স্বামীদের তুলনায় স্ত্রীরা এগিয়ে থাকা এবং তালাকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদের বিভিন্ন কারণ তুলে ধরেছেন নারী উন্নয়ন সংস্থার নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক এবং জনপ্রতিনিধিরা।
এ বিষয়ে বরিশালের নারী নেত্রী প্রতিমা সরকার মতামত ব্যক্ত করে আজকের পরিবর্তনকে বলেন, একটা সময় আইন ছিলো স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের তালাক দিলে দেনমোহর এবং খোর পোশের টাকা পেতো না। এ জন্য যুগের পর যুগ স্বামী ও শ্বশুর বাড়ীর লোকের নির্যাতন সহ্য করে স্বামীর ঘরেই পড়ে থাকতে হতো। কিন্তু সেই আইন পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন স্বামী অথবা স্ত্রী যেই তালাক দেক না কেন স্ত্রী দেনমোহর এবং খোর-পোশের টাকা পাবে। এজন্য নারীরা এখন আর নির্যাতন সহ্য করে স্বামী এবং শ্বশুর বাড়িতে গৃহবন্দি হয়ে থাকছে না। তারা নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে স্বামীকে তালাক দিচ্ছে এবং নিজেদের প্রচেষ্টায় স্বাবলম্বি হওয়ার চেষ্টা করছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে নারীরা বিয়ের পরে পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। এজন্য তারা স্বামীকে তালাক দিয়ে পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করে সংসার বাঁধছে। তবে এ ধরনের উদাহরন শতকরা একভাগ হতে পারে বলেও দাবী করেন তিনি। বরিশাল ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় (বিএম) কলেজের সমাজ কল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোঃ বন্দে আলী হাওলাদার বলেন, বর্তমান সময়ে নিত্য প্রয়োজনিয় পণ্য দ্রব্য সহ সকল কিছুর মূল্য বেড়ে গেছে। কিন্তু বাড়েনি আয়ের উৎস। একজন দিনমজুর বা নি¤œ আয়ের কর্মচারী যে বেতন পাচ্ছে তাতে সংসার পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে নারীদের চাহিদার শেষ নেই। তাদের স্বর্ণালংকার, টিভি, ফ্রিজ সহ নিত্য নতুন বায়না থাকছেই। এসব চাহিদা পুরন করতে না পারলেই গৃহে শুরু হয় নানা ধরনের অশান্তি। আর এথেকে সৃষ্টি হয় কলহ এবং বেড়ে যায় বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা।
তিনি আরো বলেন, পারিবারিক কলহ ছাড়াও বর্তমান সময়ে সব থেকে বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে ভারতীয় টিভি চ্যানেল স্টার জলসা, জি-বাংলা, স্টার প্লাস ও ইটিভি বাংলা সহ আরো বেশ কিছু চ্যানেল। এসব চ্যানেলে যে সব সিরিয়াল দেখানো হচ্ছে তা এ দেশের সংস্কৃতির সাথে কোন মিল নেই। বাংলাদেশের সিংহভাগ নারীরা এসব ভারতীয় চ্যানেলের প্রতি আসক্ত হচ্ছে। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রচলনের পাশাপাশি তাদের চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে। এ থেকেও তালাকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটছে।
অধ্যাপক মোঃ বন্দে আলী হাওলাদার আরো বলেন, ভারতীয় চ্যানেলের সাথে রয়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল প্রযুক্তি। এতে উপকারের পাশাপাশি ক্ষতির দিকও কম নয়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইস বুক, টুইটার, ভাইবার সহ বিভিন্ন মাধ্যমে আসক্ত হচ্ছে দেশের যুব ও নারী সমাজ। এসব মাধ্যমের ফলে সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটানোর পাশাপাশি অপরাধ প্রবণতাও বাড়ছে। ধংসের দিকে যাচ্ছে ছাত্র সমাজ। এসব নিয়ন্ত্রন বা নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে সামাজিক অপরাধ রোধ ও তালাকের হার কমিয়ে আনা সম্ভব বলে দাবী করেন বিএম কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগের এই শিক্ষক।