বরিশালে তরুনী হত্যা মামলার আসামী গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ নগরীর ফলপট্টি রোডের আবাসিক হোটেল ফেয়ার স্টারের ৩০৯ নম্বর কক্ষে সন্দিহান তরুনী হত্যা মামলার প্রধান ঘাতক সিরিয়াল ধর্ষক সায়েম আলম মিমুকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টানা ৫ দিনের রুদ্রশ^াস অভিযানের পর ২৯ আগস্ট রাতে ঢাকার মগবাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাকসুদুর রহমান মুরাদ সহ তার নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্য’র টিম। শুধু তরুনী নাঈমা ইব্রাহীম ঈশীই নয়, ইতিপূর্বে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় এবং প্রেমের ফাঁদে ফেলে আরো ১৩ তরুনীর সতিত্ব ও সম্পদ কেড়ে নিয়েছে ঘাতক মিমু। এমনকি তাদের কাছ থেকে প্রতারনার মাধ্যমে স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ সহ সর্বস্ব লুটে নিয়েছে মিমু নামের এই প্রতারক। তবে নাঈমা ইব্রাহীম ঈশীকে ধর্ষন, স্বর্ণালংকার লুট এবং মোবাইল সেট নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও হত্যার বিষয়টি এখন পর্যন্ত স্বীকার করেনি সিরিয়াল ধর্ষক ও ফেসবুক প্রতারক প্রেমিক মো. সায়েম আলম মিমু।

গ্রেপ্তারের পর গতকাল মঙ্গলবার প্রতারক মিমুকে পুলিশি হেফাজতে বরিশালে নিয়ে আসার পরে বেলা সাড়ে ১২টায় মেট্রোপলিন পুলিশের কনফারেন্স রুমে এক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠানে পুলিশ কমিশনার এস.এম রুহুল আমিন ঈশীর মৃত্যু এবং প্রতারক মিমুকে আটকের তথ্য সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন।

এসময় তিনি আরো বলেন, সায়েম আলম মিমু রাজধানীর ওয়ারী থানাধিন ৬০/১ যোগীনগর রোডের অস্থায়ী বাসিন্দা ও নিরাপত্তা প্রহরী সেলিম আলম এর ছেলে। ফেসবুকের মাধ্যমে সে দেশের বিভিন্ন স্থানে তরুনীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের সঙ্গে প্রতারনা এবং সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে। যে কারনে গত দুই মাস পূর্বে অবাধ্য এবং নারী লোভী একমাত্র সন্তান সায়েম আলম মিমুকে ঘর থেকে বের করে দেয় তার বাবা-মা। এরপর থেকে ওয়ারী এলাকায় হোটেলে বসবাস করে আসছিলো সে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ফেসবুকের মাধ্যমে অপরিচিত মেয়েদের সঙ্গে সক্ষতা গড়ে তোলে মিমু। নিজেকে ধর্ণাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে জাহির করে লালসায় ফেলে দেয় তরুনীদের। তাছাড়া ওয়ারীতে ১৬ তলা বিশিষ্ট খান বাড়িটি তাদের বলে তরুনীর কাছে প্রকাশ করে প্রতারক মিমু। এমনি করে  প্রতারণার মাধ্যমে ফেসবুকে অপরিচিত মেয়েদের সঙ্গে মিমু গড়ে তোলে প্রেমের সম্পর্ক। সেই সুযোগে মেয়েদের সতিত্ব কেড়ে নেয়ার পাশাপাশি কেড়ে নেয় স্বর্ণালংকার, নদগ অর্থ এবং দামী মোবাইল। আর লক্ষ্য অর্জনের পর পরই সে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে গত ১০ আগস্ট নগরীর ফলপট্টি রোডের আবাসিক হোটেল ফেয়ার স্টার’র ৩০৯ নম্বর কক্ষে সন্দিহান খুন হওয়া তরুনী নাঈমা ইব্রাহীম ঈশীর সঙ্গেও।

পুলিশ কমিশনার এস.এম রুহুল আমিন আরো জানান, ফেবসুকের মাধ্যমে মিমুর সঙ্গে পরিচয় থেকে প্রেম হয় সরকারী সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করা ছাত্রী ও নগরীর গোরস্থান রোড এলাকার বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা ইব্রাহীম খলিল এর কণ্যা ঈশীর। দীর্ঘ দিন প্রেম চলার পরে গত ৮ আগস্ট সকালে বরিশালে আসে প্রেমিক মিমু। ঐদিন দুর্গা সাগর সহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘুড়ে বেড়ায় তারা দু’জন। এর পর রাতে ফলপট্টির হোস্টেল ফেয়ার স্টারের একটি ছোট কক্ষ ভাড়া নেয়। পরবর্তীতে ১০ আগস্ট তরুনীকে ঐ হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে হোটেল ম্যানেজার মজিবুর রহমান আকনের সহায়তায় মিমু অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে হোটেলের ৩০৯ নম্বর কক্ষে ঈশীকে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে পরিকল্পিত ভাবে ঐ কক্ষেই ঈশীকে ধর্ষন ও তার গলায় থাকা স্বর্ণের চেইন এবং মোবাইল সেট নিয়ে পালিয়ে যায় মিমু। সে পালিয়ে যাবার সময় হোটেল ম্যানেজার মজিবুর রহমানের সহায়তায় ঈশীকে রুমের ভেতরে রেখে বাইরে থেকে তালাবব্ধ করে দেয়া হয়। এই ঘটনার পর দুপুর ১টার দিকে হোটেলের ৩০৯ নম্বর কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় ঈশীর মৃত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় ঈশীর বাবা বাদী হয়ে কোতয়ালী মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

পুলিশ কমিশনার জানান, শুধু ঈশীই নয়, ফেসবুকের মাধ্যমে ১৩ জন মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদের ধর্ষন এবং স্বর্ণালংকার সহ মুল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতারনার শিকার কয়েকজন তরুনীর সঙ্গে পুলিশ কথা বলেছে। তারাও ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। কিন্তু সামাজিক কারনে তারা এই ঘটনায় মামলা করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। তবে ঈশীকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেনি প্রতারক প্রেমিক মিমু। তাই তার ময়না তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত হত্যা কিনা তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। এই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় হোটেল মালিক এবং ম্যানেজারকে আসামী করা হবে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।

প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. সায়েদুর রহমান, উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) গোলাম আব্দুর রউফ খান, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আবু রায়হান মো. সালেহ্, সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতয়ালী) মো. আজাদ রহমান, সহকারী কমিশনার (ডিবি) বিএমপি পুলিশের মুখপাত্র মো. ফরহাদ সরদার প্রমুখ।