বরিশালে এক দিনেই চার লাশ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বরিশালে অপঘাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রায় প্রতিদিনই বরিশাল নগরী এবং সদর উপজেলা সহ জেলার কোথাও না কোথাও পাওয়া যাচ্ছে মানুষের মৃত দেহ। কখন হত্যা, কখনো আত্মহত্যা আবার কখনো সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডোবা সহ নানা ভাবে মৃত্যু হচ্ছে তাদের। ঠিক তেমনি করেই গতকাল সোমবার উদ্ধার করা হয়েছে চারটি মৃত দেহ। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মাত্র ৬ ঘন্টার ব্যবধানে মৃত দেহ চারটি উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। এর মধ্যে নগরের রূপাতলী বটতলা এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত পরিচয়ের যুবক এবং নবগ্রাম রোড এলাকায় ডোবা থেকে উদ্ধার হওয়া শিশু কণ্যাকে হত্যা করে ফেলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাছাড়া অপর দুটি লাশের মধ্যে এয়ারপোর্ট থানা এলাকা থেকে দুই দিন বয়সের এক নবজাতকের লাশ ও আগৈলঝাড়ায় পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সী আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়। গতকাল সোমবার বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের মর্গে উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে ৩টি মৃত দেহের ময়না তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে চারটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় পৃথক চারটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। অবশ্য অজ্ঞাত যুবক এবং শিশু’র লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা করা হবে।
মেট্রোপলিটন কোতয়ালী মডেল থানা সূত্রে জানাগেছে, গতকাল সকাল ৮টার দিকে নগরীর রূপাতলী বটতলা এলাকার জলপাইতলা নামক স্থানে রাস্তার পাশে এক যুবকের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। এসময় তাদের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশটি উদ্ধার করে। সুরত হাল শেষে ময়না তদন্তের জন্য শেবাচিমের মর্গে প্রেরন করেন।
মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ মো. আওলাদ হোসেন জানিয়েছেন, অজ্ঞাত পরিচয়ের ওই যুবকের বয়স হবে আনুমানিক ২৮ বছর। তার শরীর রক্তাক্ত এবং ধারালো অস্ত্র কিংবা অন্য কোন অস্ত্রের আঘাতে ক্ষত চিহ্ন রয়েছে। এছাড়াও যুবকের গায়ে আকাশী রঙের চেক শার্ট, পারনে লুঙ্গি ছিলো। এর পাশাপাশি শরীরের উপর আরো একটি রক্তমাখা সাদা চেক শার্ট পাওয়া গেছে। তাই প্রাথমিক ভাবে ধারনা করা হচ্ছে যুবককে কেউ হত্যার পরে রাস্তার পাশে ফেলে রেখেছে। তবে ময়না তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। এই ঘটনায় হত্যা মামলা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে সকাল ৯টার দিকে নগরীর ২৩ নং ওয়ার্ডের নবগ্রাম রোড খান সড়ক সংলগ্ন ডোবা থেকে ১০ বছর বয়সি এক মাদ্রাসা ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিশুটির নাম তন্নী আক্তার। তাকে হত্যা করে ডোবায় ফেলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। সে ওই এলাকার যুবক হাউজিং সংলগ্ন খালেক খানের বাড়ির ভাড়াটিয়া দিনমজুর টুনু মিয়ার কন্যা। তাদের গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলায়। মা, বাবা এবং এক ভাইয়ের সঙ্গে নবগ্রাম রোডে বসবাস করার পাশাপাশি একই এলাকার ফয়জুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসায় লেখা পড়া করত।
শিশুর বাবা টুনু মিয়া জানান, রোববার রাত ৮টার দিকে তাকে ডাকার জন্য ঘর থেকে বের হয়েছিলো তন্নী। এর পর থেকেই সে নিখোঁজ ছিলো। বহু খোঁজাখুজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। বাবার অভিযোগ তার মেয়েকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে ডোবায় ফেলে রাখা হয়েছে।
কোতয়ালী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আজমল হোসেন জানান, সকালে বাড়ির পাশর্^বর্তী ডোবায় ভাসমান অবস্থায় তন্নীর লাশ ভাসতে দেখে। পরে তারা থানা পুলিশকে সংবাদ দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার এবং সুরতহাল শেষে ময়না তদন্তের জন্য শেবাচিমের মর্গে প্রেরন করেন। প্রাথমিক ভাবে ধারনা করা হচ্ছে এটি একটি হত্যাকান্ড। তার পরেও ময়না তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছেনা। তবে সোমবার রাতে এই ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা টুনু মিয়া বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়েরের কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
অপরদিকে মেট্রোপলিটন বিমানবন্দর থানা এলাকায় রাস্তার পাশ থেকে এক নবজাতকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বেলা পৌনে ১১টার দিকে ঐ এলাকার উত্তর রহমতপুর খানপুরা সড়কের পাশ থেকে আনুমানিক দুই দিন বয়সি এই নবজাতকের লাশটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ এবং স্থানীয়দের ধারনা নবজাতকটি কারো অবৈধ সম্পর্কের ফসল।
বিমানবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনোয়ার হোসেন নবজাতকের মৃত দেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গতকাল সোমবার খানপুরা সড়কের পাশে নবজাতকের মৃত দেহটি দেখতে পায় স্থানীয়রা। পরে তাদের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে লাশটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য শেবাচিমের মর্গে প্রেরন করা হয়। তবে কে বা কারা এবং জীবিত নাকি মৃত অবস্থায় ফেলে রেখেছে তা এখনো নিশ্চিত নন তারা। অবশ্য স্থানীয়দের ধারনা কারোর পাপের ফসল নবজাতককে জীবিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। রাস্তার পাশে পড়ে থেকেই তার মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রামানন্দের আক গ্রামে পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুর নাম অরন্য বাড়ৈ সৃজন। সে ঐ গ্রামের কুমুদ বাড়ৈ’র ছেলে।
আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গতকাল সোমাবার দুপুর ১টার দিকে শিশুটি সকলের অজান্তে বাড়ির পাশর্^বর্তী পুকুরে পড়ে নিখোঁজ হয়। পরবর্তীতে তাকে অনেক খোঁজা খুজির পরেও পাওয়া যাচ্ছিল না। এর প্রায় আধাঘন্টা পর বাড়ির ঐ পুকুরে খোঁজ খোজি করতে গেলে সেখানে সৃজনের লাশ ভেসে উঠতে দেখে স্বজনরা। তাৎক্ষনিক ভাবে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষনা করেন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ না থাকায় ময়না তদন্ত ছাড়াই লাশটি দাফন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওসি।