বরিশালের কৃতি সন্তান ড. মাসরুর এম নাহিদ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা এমএইচ মন্টুর বড় ছেলে বরিশালের কৃতি সন্তান ড. মাসরুর এম নাহিদ বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক(রিসার্চ- ফেলো) হিসেবে কাজ করছেন। ছেলেবেলা থেকেই অত্যান্ত মেধাবী এই তরুণ বরিশাল জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং ঢাকা নটরডেম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ড. মাসরুর এম নাহিদ ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম হন। এর পরে স্কলারশিপ নিয়ে সুইডেনের উমিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করেন। এরপরে অস্ট্রেলিয়ার মোনাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। সম্প্রতি তিনি ঢাকা আসলে দেশের অন্যতম ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজের পক্ষ থেকে তার একান্ত সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। অত্যন্ত মেধাবী এই তরুণের নিউ এইজের সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের সম্মানে বঙ্গানুবাদ করে দেয়া হল। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন নিউ এইজ’র সিনিয়র সাংবাদিক শাইখা শুহাদা পানজিরী।
শাইখা শুহাদা পানজিরীকে বরিশালের তরুণ মেধাবী গবেষক ড. মাসরুর এম নাহিদ জৈব ইলেক্ট্রনিক্সের গবেষণার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানান, গত ৪০ বছর বা তারও বেশী সময় ধরে, জৈব ইলেক্ট্রনিক্স সংক্রান্ত গবেষণা একটি দীর্ঘ পথ পেরিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক (রিসার্চ- ফেলো) ড. মসরুর এম নাহিদের মতে ভবিষ্যতমুৃখী ইলেকট্রনিক্সকে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথে একিভূত করা প্রয়োজন। সঠিক ভাবে গবেষণা এবং বা¯তবায়ন করা হলে জৈব ইলেক্ট্রনিক্সের প্রচুর ব্যবহারিক সম্ভাবনা রয়েছে।
আমরা আগেও বলেছি নাহিদের গবেষণা ক্ষেত্রের অন্যতম বিষয় জৈব ইলেক্ট্রনিক্স। এটি এমন একটি কাটিং-এজ (যুগোপোযুগী) প্রযুক্তি, যা ইতিমধ্যে প্রদর্শন (ডিসপ্লে) ডিভাইসগুলোতে প্রয়োগ করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ওলেড (ড়ৎমধহরপ ষরমযঃ-বসরঃঃরহম ফরড়ফব/ঙখঊউ) টিভি এবং স্মার্টফোন পর্দার কথা বলা যেতে পারে। স্বল্প-পুরুত্বের এবং বাঁকা স্ক্রিন সম্পন্ন ডিভাইসের উদ্ভাবন এবং প্রয়োগ এই চমকসৃষ্টিকারী প্রযুক্তির মাধ্যমেই শুধুমাত্র সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গত চার দশক ধরে এই পরিবেশ-বান্ধব, সাশ্রয়ী এবং খুব কম খরচে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির গবেষণা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। জৈব সৌর কোষের প্রোটোটাইপ ইতিমধ্যেই বাজারে একটি আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছে।
কম-পুরুত্বের ট্রানজিষ্টর :
জৈব ইলেক্ট্রনিক্সে থিন-ফিল্ম (কম-পুরুত্বের অত্যন্ত পাতলা) প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রয়োগ নি:সন্দেহে একটি বিশাল লাভ ও সুবিধাজনক প্রক্রিয়া।
জৈব ইলেক্ট্রনিক্সে থিন-ফিল্ম হচ্ছে ’দ্রবন-প্রক্রিয়াজাতকরণ’ উৎপাদন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ এ প্রক্রিয়ায় যে কোন বস্তুকেই দ্রবীভ’ূত করে ব্যবহার উপযোগি করা যেতে পারে।
মূলত কম-পুরুত্বের অত্যন্ত পাতলা ফিল্ম জাতীয় প্রযুক্তির প্রয়োগ সুবিধা হচ্ছে তা সহজেই দ্রবীভূত-করা বা হওয়ার মতো। অর্থাৎ এগুলো এমন উপায় ও উপকরণে তৈরী যা সহজেই দ্রবীভূত হয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ক্লোরোফরম হচ্ছে একটি সহজে দ্রবীভূত হওয়ার মতো জৈব-দ্রাবক। একটি কম-পুরুত্বের ডিভাইস বা পাতলা ফিল্ম তৈরী করতে এটা ব্যবহার করা যেতে পারে।
শিল্প ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা ব্যবহার করে ট্রানজিষ্টরের মান উন্নত করা যায়।
এ ক্ষেত্রে প্রথম চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে এর উপকরণ তৈরি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রসায়নবিদ এবং সংশ্লেষনবিদরা এ উপকরণ তৈরি করেন।
নাহিদের কাজ ছিল উপকরণগুলো নিয়ে ডিভাইস তৈরি করা, কিভাবে সেগুলো কাজ করে তা পর্যবেক্ষণ করা, সেগুলোকে কি ভাবে আরো উন্নত করা যেতে পারে সে বিষয়ে চেষ্টা-চরিত্র করা।
একটি প্রকল্পে নাহিদ এমন একটি ট্রানজিস্টর তৈরি করেন, যার সেন্সরটি তিন ধরনের সেলুলয়েড বা তন্তুর (ীুষবহবং) তিন প্রকারের সংকেতকে পৃথক করতে পারে। এদের মধ্যে একটি ভোজ্য বস্তুতে, আরেকটি পেট্রোলিয়াম-জাত পণ্যে এবং শেষটি জৈব প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ব্যবহার যোগ্য।
জৈব সৌর কোষ :
জৈব সৌর কোষগুলো হচ্ছে জৈব ইলেক্ট্রনিক্সের আরেকটি দিক।
এ প্রযুক্তির যার সাহায্যে ও মাধ্যমে রুপান্তর বা নবায়ন-যোগ্য (ৎবহবধিনষব) শক্তি ব্যবহারের সম্ভাব্যতা রয়েছে , এমন একটি নমনীয় বা ভাজ করার যোগ্য বস্তু হতেও সৌর উৎস ব্যবহার করে তা শক্তিতে রুপান্তর করতে পারে। এটি একটি পত্রিকার মত, রোল টু রোল রুপাস্তর প্রক্রিয়াকরনের মাধ্যমে শক্তি উৎ্পাদন করতে পারে। এটি এখনও প্রোটোটাইপ এবং অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। সিলিকন-ভিত্তিক সৌর-কোষের তুলনায়, এটি অধিকতর বক্র-যোগ্য বা সহজে ভাজ করার মতো। এ ধরনের পণ্য বাজারে আসলে, তাদের স্বচ্ছ-বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষ সহজেই তা দরজা-জানালার পর্দা হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন।
এই জৈব-ইলেকট্রনিক্স পন্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল তা পরিধানযোগ্য। একটি জ্যাকেট নিজেই হতে পারে সৌর-শক্তি উৎপাদক একটি সৌর সেল । স্বাস্থ্যের উপর এই জৈব পদার্থ থেকে তৈরি করা বস্তুুর কোন প্রভাব থাকবে না। কারন তা হবে জৈব-জাত মিশ্রন হতে তৈরী এবং সহজেই দ্রবীভূত হওয়ার গুণাগুন সম্পন্ন।
ডিসপ্লেø ডিভাইসঃ
নাহিদের মতে জৈব-ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তির বহুল ব্যবহারের অন্য একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হচ্ছে ’জৈবিক আলো-নির্গমনশীল ডায়োড (ওএলইডি)’। এলজি ইতোমধ্যে বাজারে এ প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে বাজার্এেমন এক ধরনের টিভি চালু করেছে, যার স্ক্রিনগুলি শুধুমাত্র ৪ মিমি পুরু। কয়েক বছর আগে থেকে তারা এ ব্যাপারে গবেষণার জন্য অর্থায়ন করে আসছিল এবং গবেষণার ফলাফল এখনো প্রকাশ করেনি। স্যামসাং ব্রান্ডের কিছু ডিভাইসে বা পণ্যেও এখন অনুরূপ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জৈব-ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে।
সম্ভবনাঃ
গত ২ আগস্ট, ২০১৭ তারিখে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাহিদ তাঁর গবেষণা কাজ উপস্থাপন করেন।
উপস্থাপনার পর অনেক শিক্ষক বাংলাদেশেও এধরনের গবেষণা প্রকল্প গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে এই বিষয়ে কোন চলমান গবেষণা নেই।
এই গবেষণা-প্রকল্প বাংলাদেশেও করা সম্ভব কিনা, এধরনের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ বলেন , ‘এব্যাপারে আমি আশাবাদী। প্রযুক্তিগত-উন্নয়নের কারনে মানুষ এখন সহজেই নিত্য-নতুন প্রযুক্তির সাথে পরিচিত, অভ্যস্ত ও সংযুক্ত হচ্ছে। তাই যে কোন নতুন ধারণাই সহজে তাদের মধ্যে স্থানান্তর করা যাবে। বাংলাদেশে আপন সামর্থের উপর নির্ভর করে এধনের গবেষণার সক্ষমতা ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এখনো অর্জন করতে পারেনি। তাই একমাত্র উপায় হচ্ছে সামর্থবান বা আগ্রহীদের সাথে পাস্পরিক সহযোগিতা করা, যাতে এব্যাপারে বাংলাদেশের জন্যও একটি যৌথ সুযোগ সৃষ্টি হয়।’