বরিশালবাসীর স্বপ্নের জেল খাল খনন শুরু

সিদ্দিকুর রহমান ॥ প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের লাইফ লাইন ঐতিহ্যবাহী জেল খাল খননের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগ আর বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এই খনন কার্যক্রমের শুরুর ফলে শীঘ্রই এই খালে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি নৌকা চলাচলের মধ্যে দিয়ে এই খালটি তার পুরনো যৌবন ফিরে পাবে বলে আশাব্যক্ত করেন জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান। গতকাল শুক্রবার সকালে নগরীর নথুল্লাবাদের ১নং পয়েন্টে এসকেভেটর যন্ত্রের সাহায্যে খালের খনন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শনিবার বরিশালের আপামর সাধারন জনগন ঐতিহ্যবাহী জেল খালটি পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কাজে স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করে বরিশালের বুকে ইতিহাস রচনা করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান অপসোনিনের সহযোগিতায় গতকাল থেকে শুরু হয় এই খনন কার্যক্রম। এদিকে এই কার্যক্রমে উৎসাহ যোগাতে খাল খননের শুরু থেকে ঐ পয়েন্টের আশেপাশের সাধারন জনগনের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়াও যে গ্রুপের মাধ্যমে স্বপ্নের জেল খাল উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল সেই বরিশাল সমস্যা ও সম্ভাবনা গ্রুপের সদস্যদের উপস্থিতি বেশ চোখে পড়ার মত। এমনকি বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাও কর্মচারী এবং বিভিন্ন বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরাও এই খনন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে উৎসাহ দিয়েছেন। তাদের সবার একটাই দাবী জনসাধারনের জেল খালে পানি প্রবাহ বৃদ্ধি হউক। পাশাপাশি আবারো সেই পুরনো গয়নার নৌকা যেন চলতে পারে সেই কামনা করছেন, যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম এই জেল খালের ইতিহাস তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারে। এদিকে গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর জেল খালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পর সকল ধরনের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে খালের আশেপাশের বাসিন্দারা তাদের বাসাবাড়ির ময়লা আর্বজনা আবারো ঐ খালে ফেলতে শুরু করে। যার ফলে স্বপ্নের জেল খাল তার চিরচেনা রুপে ফিরে যেতে শুরু করেছিল। এতে করে জেল খালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সাথে যারাই যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে এক প্রকারের ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও আশা হারাননি ঐ মানুষগুলো। তারা ধারনা করছিল, জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ জনগনের স্বর্তস্ফুর্ত অংশগ্রহনের এই জেল খাল কি তার পুরনো যৌবন ফিরে পাবে না? কেনো খালের আশে পাশের বসবাসকারীরা এই খালটির গুরুত্বটা বুঝতে চেষ্টা করছে না? তাছাড়া জেল খালে বাসাবাড়ির সুয়ারেজের লাইন দেয়া ও ময়লা আর্বজনা ফেলার কারনে খালের পারে অনেক বাসিন্দাদের জরিমানাও করে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত। তারপরেও তাদের ময়লা আর্বজনা ফেলা কমেনি। তবে গতকালের এই খনন কার্যক্রম শুরুর ফলে জেল খালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত সকল সাধারন মানুষের মনে আবারো আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা এই খনন কার্যক্রমের সাথে সবসময় থাকবে, যেমনটি জেল খালের উপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অংশ নিয়েছিল। জেল খালের খনন কার্যক্রমে বেশ ভালো ভুমিকা পালন করছে সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ। খাল থেকে উত্তোলন করা ময়লা আর্বজনা কর্পোরেশনের ট্রাকে করে নির্দিষ্ট স্থানে জমা করছে তারা। তাছাড়াও এই খনন কার্যক্রম তদারকি করতে জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোশেনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্মীদের যথাযথ নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে সকালে জেল খালের নথুল্লাবাদ অংশে খনন কার্যক্রম পরিদর্শন করে খাল খননে যুক্তদের নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান। এসময় উপস্থিত ছিলেন সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. জাকির হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আহসান হাবিব, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. আবুল কালাম তালুকদার, সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. মো. মতিউর রহমান, এনজিও প্রতিনিধি কাজী জাহাঙ্গীর কবির সহ জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।
এদিকে জেল খালের খনন কার্যক্রম সম্পর্কে সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, জেলা প্রশাসন আর সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগীতায় এই খালটির খনন শুরু হয়েছে। এতে সিটি কর্পোরেশনের একাধিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও পরিচ্ছন্নতা ট্রাক দিয়ে সহযোগিতা করছে। তাছাড়াও এই খাল টি সহ নগরীর অন্য ২২ টি খাল রক্ষা ও সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য একটা প্রকল্প ইতিমধ্যে মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। যার ফলে ঐ প্রকল্পটি অনুমোদন হলে, এই খালটির পাশাপাশি অন্যান্য খাল গুলোর সৌন্দর্য বর্ধন কার্যক্রম শুরু হবে। তবে এই জেল খাল সহ অন্যান্য খাল গুলো উদ্ধারে জনগনের অংশগ্রহন এক উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে আশাব্যক্ত করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে জেল খাল সহ অন্যান্য খাল উদ্ধারের মহানায়ক জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেছেন, বরিশাল নগরী এবং জেল খাল যেন একে অপরের পরিপূরক। একটিকে ছাড়া অন্যটি যেন অর্থহীন, এতটাই গুরুত্বপূর্ণ এই জেল খাল। নগরীর এই গুরুত্বপূর্ণ খালটি যে হারিয়ে যেতে বসেছিল। প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল এটির অবস্থান। আর কয়েক বছর এভাবে অবহেলায় চলে গেলেই ইতিহাস হয়ে যেত এই জেল খাল। তখন হয়ত নগরবাসী জেলখালের স্মৃতিচারণ করতো। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে বরিশালের সকল মানুষকে একত্রিত করে এই খাল উদ্ধারের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতার একটি অংশ এই খাল খনন। বেসরকারী প্রতিষ্ঠান অপসোনিনের সহযোগীতায় নগরীর নথুল্লাবাদ পয়েন্ট থেকে এই খাল খননের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যার ধারাবাহিকতা চলমান থাকবে। আর এই খাল সহ নগরীর অন্যান্য খাল ঘিরে যে প্রকল্প মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে আশা করছি শীঘ্রই সেই প্রকল্প অনুমোদন হয়ে আসবে। পরবর্তীতে বরিশালের সবগুলো খালের সৌন্দর্যবর্ধন সহ যাবতীয় কর্মকান্ড সম্পাদন করা হবে। এসময় তিনি আরো বলেন, গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর এই জেলখাল পুনরুদ্ধার এবং এর পুরোনো যৌবন ফিরিয়ে দিতে বরিশালের সর্বস্তরের জনগনের অংশগ্রহন, বরিশালের ইতিহাসে নয়া বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছ। একই সাথে প্রমাণ হয়েছে জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই, জনসম্পৃক্ততাই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে।
উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসন এবং সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর নথুল্লাবাদ থেকে কীর্তনখোলা নদী পর্যন্ত জেল খালের দৈর্ঘ্য ৩.২ কিলোমিটার। প্রতি ১০০ মিটার করে একেকটি ব্লক চিহ্নিত করে ৩০টি খন্ড সুচিহ্নিত করে দৃশ্যমান নম্বর প্লেট এর মাধ্যমে এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। এছাড়াও প্রতিটি খন্ডে একেকটি দলকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শনিবার সবক’টি দল মিলিয়ে ২০ হাজারেরও বেশি সচেতন মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানের প্রত্যেক দশটি দলের একেকটি গুচ্ছের দায়িত্বে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ের একেক জন কর্মকর্তা সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাছাড়াও তার সাথে জেলা প্রশাসনের এক জন নির্বাহী হাকিম এক জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও জেল খাল পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ছিলো ৩০টি নৌকা, স্পীডবোট এবং তিনটি মোবাইল কোর্ট। ৩০টি খন্ডের প্রত্যেক খন্ডে সিটি কর্পোরেশনের ৫ জন করে পরিচ্ছন্নতা কর্মী সহযোগিতায় ছিলেন। এদিকে ঢাক ঢোল পিটিয়ে, পথ নাটক, গানে গানে মুখরিত ছিলো খাল পাড়ের সড়কগুলো। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল বয়সী মানুষের অংশগ্রহণ ছিল বেশ চোখে পড়ার মত।