বরাদ্দ না থাকায় বিসিসির উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা ॥ দুর্ভোগে নগরবাসী

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ গত বছর বর্ষা মওশুমের মত এবারের বর্ষাতেও মাঝারী থেকে ভারী বর্ষনে বরিশাল মহানগরীর ভঙ্গুর পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা গোটা নগরবাসীকে চরম দূর্ভোগে ফেলেছে। ঘন্টায় ৫ থেকে দশ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেই এ নগরীর নবগ্রাম রোডটি সর্বাগ্রে এবং বাংলাদেশ ব্যংকের সামনের রাস্তাটি প্লাবিত হয়। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্রমে আরো ছোট-বড় রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়ে নগরীর কেন্দ্রস্থল সদর রোডটিও পানির তলায় চলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বরাদ্দ না থাকায় না হচ্ছে রাস্তা সংস্কার কিংবা ড্রেনের পরিষ্কারকরণের কাজ। এছাড়াও কিছু নগরবাসী তাদের বাড়ির সামনের ড্রেন বালি এবং নির্মাণ সামগ্রী রেখে ভরাট করে ফেলছে। যার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেও ড্রেন আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়াও সিটি কর্পোরেশনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর খামখেয়ালীর কারণেও জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমনই যে, ‘ধান-নদী-খাল এ তিনে বরিশাল’এর বাস্তব চিত্র এখন বর্ষার এ নগরীর রাস্তা ঘাটে চোখ মেললেই নির্মমভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। এমনকি অতীতে যেখানে কাকলীর মোড়টি প্লাবিত হতনা, সেখানে এখন পানি থৈথৈ করে। চরম দূর্ভোগ আর দূর্গতি ইতোমধ্যে বরিশাল মহানগরবাসীর নিত্য সঙ্গী হয়ে উঠছে। বিপর্যস্ত নগর সভ্যতা।

চলতি মওশুমে গত ২১ আগষ্ট স্মরনকালের ভয়াবহ বর্ষনের পরে গত ২৮ সেপ্টেম্বর আরেক প্রবল বর্ষনে নগরীর পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হবার ফলে বেশীরভাগ রাস্তাঘাটের কংকাল গুড়ো হতে শুরু করেছে। ফলে এ নগরীর নাগরিক পরিসেবা ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদটি শূন্য পড়ে আছে গত তিন মাসাধীককাল। ফলে এখানের প্রশাসনিক কর্মকান্ড সহ সার্বিক কাজকর্মেও স্থবিরতা অব্যাহত রয়েছে।

গত ২১ আগষ্ট সকাল সাড়ে ৪টা থেকে দুপুর পর্যন্ত স্মরনকালের ভয়াবহতম বর্ষনে বরিশালে ২৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। গত ২৮ সেপ্টেম্বরও বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা মেঘমালা সকাল সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে ১২০ মিলিমিটার বৃষ্টি ঝড়িয়েছে এ নগরীতে। ফলে বিপর্যস্ত পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার এ নগরী আরো একবার ডুবেছে। তবে নগরীর রাস্তাঘাট ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার এ দূর্গতি আর নগরবাসীর দূর্ভোগ বর্তমান নগর প্রশানকেও যে ক্রমে ডোবাচ্ছে তা বুঝতে তাদের আর কতদিন সময় প্রয়োজন, সে বিষয়টি পরিস্কার নয় এখনো। বিশাল মাথা ভাড়ী প্রশাসনের বরিশাল নগর প্রশাসন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত প্রদান করতে না পারলেও তাদের কাছ থেকে কাজ আদায়ের ব্যপারেও সচেষ্ট নন।

এ নগরীর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা সহ পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা নির্বিঘœ রাখতে প্রায় দেড় হাজার দৈনিক মজুরী ভিত্তিক শ্রমিক থাকলেও তার অর্ধেকেরও বেশীর বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। তাদের কাজই বা কি, সে বিষয়টি সম্পর্কেও বরিশাল সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল মহল তেমন কিছু বলতে পারছেন না। এমনকি বছরের পর বছর ধরে নগরীর যে কয়টি রাস্তা সামান্য বৃষ্টিতেই প্লাবিত হয়ে জনদূর্ভোগ বাড়াচ্ছে, তার পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থাটি সচল রাখতেও সচেষ্ট নন নগর ভবনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। নগরীর কতিপয় নির্মানাধীন বাড়ীর মালিক গত কয়েক বছর ধরে রাস্তা ও ড্রেনের কিনারা ঘেষে বহুতল অট্টালিকা তৈরী করছেন। কিন্তু তার সব নির্মান সামগ্রী রাস্তা ও ড্রেনকে দখল করছে। ফলে অনেক ড্রেন ইতোমধ্যে ভড়াট হয়ে গেছে। নগরীর নবগ্রাম রোডের অক্সফোর্ড মিশন রোডে মুখ ও মনসুর কোয়ার্টারের সামনের অংশে বালু ফেলে ড্রেন ভর্তি করা হয়েছে গত দুবছর ধরে। বিষয়টি এলাকাবাসী বহুবার সিটি করপোরেশেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সহ পরিচ্ছন্ন বিভাগের দায়িত্বশীল মহলের নজরে আনলেও অদৃশ্য খুটির জোড়ে সমাজ বিরোধী এ কর্মকান্ড বন্ধ হয়নি। ফলে গত দুটি বর্ষা মওশুমেই সামান্য বৃষ্টিতে নবগ্রাম রোডের বিশাল অংশ পানিতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। অথচ তিন দফায় অন্তত ১০ কোটি টাকা ব্যায়ে ঐ রাস্তাটি নির্মান ও রক্ষনাবেক্ষন কাজ করা হয়েছে।

নগরীর বাংলাদেশ ব্যংকের সামনের রাস্তাটির অবস্থাও করুণ। সেখানেও সামান্য বৃষ্টিতে ব্যাংকের প্রধান ফটক পর্যন্ত পানিতে থৈ থৈ করছে। এখানে নির্মিত ও নির্মানাধীন কয়েকটি বাড়ীর নির্মান সামগ্রীর কারনে দ্বীনবন্ধু সেন সড়কের পাশের পাকা ড্রেনের প্রায় পুরোটাই ভড়াট হয়ে গেছে। অনুরূপ অবস্থা নগরীর প্রায় সবগুলো ছোট-বড় সড়কেরই।

গত ২১ আগষ্ট স্মরনকালের ভয়াবহ বর্ষনে বরিশাল মহানগরীর প্রায় সাড়ে ৬শ কিলোমিটার রাস্তার দুই-তৃতীয়াংশই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে দাবী করেছেন সিটি মেয়র আহসান হাবীব কামাল। ঐ নজিরবিহীন বর্ষনে বরিশাল মহানগরীর ৪৬৬ কিলোমিটার বিটুমিনাস রাস্তার আড়াইশ কিলোমিটারেরও বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বওে দাবী করেছিলেন। এছাড়াও নদী তীরবর্তী প্রায় ৪১ কিলোমিটার বাঁধ ও মাটির রাস্তারও ব্যাপক ক্ষতি হয় ঐ বর্ষনে। তিনি এসব সড়ক অবকাঠামো মেরামত ও পূণর্বাসনে ৬শ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে মন্ত্রনালয়ের কাছে ৪১৩ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ দাবী করেছিলেন। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোন ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ২১ আগষ্টের মাস পেরোতেই প্রায় অনরূপ আরেক প্রবল বর্ষনে নগরী আরো একবার প্লাবিত হয়েছে ২ সেপ্টেম্বর। ফলে ভাঙ্গাচোড়া রাস্তার বের হয়ে আসা হাড়গোর এখন গুরো হতে শুরু করেছে। এ নগরীর বিধ্বস্ত রাস্তায় এখন প্রতিদিন প্রসব বেদনা শুরু হচ্ছে একাধীক গর্ভবতীর।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৫ লাখ জনসংখ্যার এ নগরীতে রাস্তার পরিমান সাড়ে ৬শ কিলোমিটারের মত। যার মধ্যে এখনো কাঁচা রাস্তাই প্রায় আড়াইশ’ কিলোমিটার। ইট বিছানো-এইচবিবি রাস্তা রয়েছে ১২ কিলোমিটার এবং খোয়ার রাস্তা রয়েছে আরো ৩২ কিলোমিটার। নগরীতে এখনো ৩৬টি বাঁশের সাকো ছাড়াও কাঠের পুল রয়েছে ২২টি। আর নগরী জুড়ে পৌনে ৪শ কিলোমিটার ড্রেনের মধ্যে কাঁচা ড্রেনের দৈর্ঘ্য এখনো প্রায় ১৬৫ কিলোমিটার। আর পাকা ড্রেন ২১২ কিলোমিটারের মত। নগরীর অভ্যন্তরের প্রায় অর্ধেক ড্রেনই পাকা ড্রেন নির্মান করা হলেও এখনো জেল খাল, নবগ্রাম রোড খাল, সাগরদী খাল সহ নথুল্লাবাদ খালের অস্তিত্ব কোন ক্রমে টিকে আছে। এসব খালের দু পাশের বাসিন্দারা ক্রমশ খালগুলোকেও গ্রাস করছে। এসব বিবেকহীন বসতদারগন প্রকৃতির এ অপার দানকে গলা টিপে হত্যা করলেও তা দেখার কেউ নেই। পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষন না হবার কারনেও খালগুলো ক্রমশ অস্তিত্ব হারাচ্ছে।

তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় সম্প্রতি বরিশাল জেলখানা খালের বেশ কিছু অংশ সংস্কার ও পরিস্কার করা হলেও এখনো এর দু’পাশের জমি পুনরুদ্ধার সম্পন্ন হয়নি। জেলা প্রশাসন ও নগর ভবন যৌথভাবে জেল খাল নিয়ে অনেক পদক্ষেপ নিলেও নগরীর অন্য খালগুলোর ব্যপারে তাদের খুব একটা ভূমিকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এমনকি গত ২১আগষ্টের প্রবল বর্ষনে নগরীর পশ্চিমাংশ জলাবদ্ধতায় আটকে গেলেও নবগ্রাম রোড খালটির পানির প্রবাহ অবরুদ্ধকারী নানা অবৈধ অবকাঠামো সরিয়ে ফেলতে নগর ভবন সচেষ্ট হয়নি। অথচ বিষয়টি নিয়ে এলাকার অনেক মানুষ সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের দায়িত্বশীল মহলের দৃষ্টি আকর্ষনও করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের অনেক কাউন্সিলর এলাকায় থাকেন না। ফলে তারা এলাকাবাসীর ভালমন্দের তেমন কোন খোজ খবরও রাখেন না। বেশীরভাগ কাউন্সিলর নগর ভবনে ঠিকাদারী করেন। ফলে জনসেবার চেয়ে নগর ভবনকে তারা ব্যক্তিগত বানিজ্যিক কর্মক্ষেত্র হিসেবেই বিবেচনা করেন বেশী।

তবে এসব বিষয়ে নগর ভবনের দায়িত্বশীল মহল যথারীতি তাদের সজাগ কর্মকান্ডের কথা জানিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজরদারী সহ তৃনমূল পর্যায়ে জনসেবা অব্যাহত রয়েছে বলেও দাবী নগর প্রশাসনের দায়িত্বশীল মহলের।