বরগুনায় জেলেদের জলদস্যু’র আতংক

মীর জামাল,বরগুনা ॥ সমুদ্রের সাথে লড়াই, আরেক দিকে জলদস্যুর উৎপাত। তার ওপর রয়েছে দাদনের নীপিড়ন। অন্যদিকে প্রতিনিয়ত দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে জর্জরিত উপকূলের জেলে পরিবারগুলোর ঋণের বোঝাও দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় জেলেদের জীবিকা চলে বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকার করে। উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা এসব জেলের দুর্দশার শেষ নেই।
উপকূলের জেলেরা জানিয়েছেন, সাগরে কিছু বুঝে ওঠার আগেই (জেলে ট্রলার) বোটের পাশে জলদস্যুদের বোট লাগাইয়া অস্ত্র ঠেকাইয়া আউড়াধাউড়া (এলোপাথারি) মারধর শুরু করে। টাকার জন্য জিম্মি করে মাঝিকে ধরে নিয়ে যায় দস্যুরা। আবার কোনো কোনো সময় মাঝির সঙ্গে যুবক বয়সী থাকলে তাদেরকেও নিয়ে যায়। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, বাঁচার চেষ্টা করলে মেরে নদীতে ফেলে দিয়ে যায় তারা। বাবা ছিলেন মাঝি, ছেলে হয়েছেন জেলে ২৫ বছর ধরে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরছেন আল আমিন। দস্যুদের পিটুনি তার গা সয়ে গেছে। আতঙ্ক রয়েছে জেনেও প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকার জন্য সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন তিনি। দস্যুদের উৎপাতের কথা আক্ষেপ করে বলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই জেলেদের। এসব গায়ে সয়ে যাওয়া নির্যাতনের কথা বলতে বলতে বিরক্ত হয়ে গেছেন উপকূলের জেলেরা। সবাই শুধু শুনেই যায়, পায় না কোনো প্রতিকার। তাই এখন বলতে কষ্ট হয় তাদের কষ্টগাথা। গভীর সমুদ্রে যখন দস্যু আক্রমণ হয়, না থাকে কোস্টগার্ড, না থাকে কোনো নিরাপত্তা বাহিনী। সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো রাস্তাই থাকে না তাদের।
পাথরঘাটা উপজেলার জেলে নাসির বলেন, জীবনের নিরাপত্তা নাই জেনেও, পেটে ভাত দিতে হইলে যাইতেই হইবে গাঙ্গে। সাগরে ডাকাতি করতে আসে জলদস্যুরা ধরে পিটায়, অনেক সময় মেরে ফেলে, তারপরও সাগরে মাছ ধরতে যাই। বাপ জনমে শিখছি মাত্র জেলে কাজ। এ দিয়েই সংসার তাই জীবনের ঝুকিঁ নিয়ে মাছ ধরে খাই।
বঙ্গোপসাগরে দস্যুদের অপরহণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যে দিশেহারা হয়ে পড়েছে গোটা উপকূলীয় এলাকার জেলেরা। ইলিশ মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে দস্যুতা চালিয়ে জেলে অপহরণ ও ট্রলার জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন দস্যু বাহিনী। আর মুক্তিপণের এসব টাকা আইন-শৃঙ্খলা বাহীনির নাগালের মধ্যেই চলছে আদান-প্রদান। কর্তব্যরত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরর নিস্ক্রিয়তার কারণে দস্যুদের মুক্তিপণ বাণিজ্য অনেকটা নীরবেই মেনে নিয়েছেন এসব জেলে, ট্রলার মালিক ও মৎস্যজীবীরা।
জেলা ট্রলার মালিক সমিতি ও জেলে সমিতির হিসাবে গত বছর শতাধিক ট্রলারসহ প্রায় তিন হাজার জেলে অপহৃত হয়েছে। শেষ সম্বল ভিটে মাটি বন্ধক রেখে জেলে প্রতি ৫০/৬০ হাজার থেকে এক লাখ ও ট্রলার প্রতি তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে দস্যুদের আস্তানা থেকে অপহৃতদের ফিরিয়ে এনেছেন স্বজনরা। এদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার ওপর ভরসা নেই জেলেদের। তাই তো দস্যুদের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে মুক্তিপণ পরিশোধ করে জেলেদের ফিরিয়ে আনাতেই নিরাপদ বোধ করেন জেলে স্বজনরা।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী সমিতি সভাপতি আবদুল খালেক দফাদার বলেন, জেলেদের তো উপায় নেই, খাইতে হইলে সাগরে যাইতে হবে, আর সাগরে গেলে দস্যুর কবলে পড়বে এটা এখন নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে উপকূলীয় জেলেরা। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন সভা সমাবেশ করেও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি উপকূলীয় জেলেরা। পায়নি গভীর সমুদ্রে নিরাপত্তার ব্যবস্থার আশ্বাস।
জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, বিরূপ আবহাওয়া, দস্যুদের উৎপাতসহ নানা প্রতিকূলতা সামাল দিয়ে ইলিশ শিকার করতে হয় জেলেদের। প্রতিবছর মৌসুম শুরুতে জেলেরা ইলিশ শিকারে গেলে দস্যুদের উৎপাত বাড়ে। সাগরে মাছ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথেসাথে বৃদ্ধি পায় দস্যুদের তান্ডব। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত দস্যু ভয়কে উপেক্ষা করে সাগরে যাচ্ছে জেলেরা। দু‘বেলা দু‘মুঠো খেয়ে পরে বাঁচার জন্য।
কোস্টগার্ডের পাথরঘাটা স্টেশন কমান্ডার লে. এফ এ রউফ বলেন, জেলেদের নিরাপত্তায় আমরা সব সময় প্রস্তুত রয়েছি। প্রতিনিয়ত আমাদের টহল অব্যাহত আছে এবং গভীর সমুদ্রে নৌবাহিনীর টহল রয়েছে। কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে জেলেদের নিরাপত্তার জন্য নানামুখি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।