বরগুনায় ইলিশের আকাল

মীর জামাল, বরগুনা ॥ “ঘরে চাউল নাই গাঙ্গে ইলিশ নাই, এ্যাহন সাগরে মাছ না পড়লে মোরা খামু কি? গত এক হপ্তা (সপ্তাহ) ধইর‌্যা গাঙ্গে জাল ফালাইছি। এ্যাহন তাইক (পর্যন্ত) জালে মাছ ধরা পড়ে নায়। যে টাহা খরচ হরছি হেয় মনে হয় ওঠবে না। প্রত্যেক ফির গাঙ্গে যাইতে দেড়-দুই লাখ টাহা(টাকা) খরচ হয়। কূলে গেলেই টাহার লইগ্যা মহাজনরা তাগেদা দেয়।” এমন কথাই বললেন সাগর থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসা বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাটে নোঙ্গর করে থাকা মৎস্য ট্রলার নীল সাগর-২ এর জেলে বাদল জোমাদ্দার। সাগরে ইলিশ না পড়ায় এমনই হতাশা বিরাজ করছে বরগুনাসহ উপকূলীয় জেলেদের মাঝে।
ইলিশের মৌসুমেও মাছের দেখা নাই। জেলেরা সাগরে গিয়েও ফিরছে খালি হাতে। ছেলে-মেয়ে ও পরিবার পরিজন নিয়ে সামনের দিনগুলো কিভাবে পাড় করবেন এমন হতাশার কথা বললেন সাগর থেকে খালি হাতে ফেরা একাধিক জেলে। সাগরে ইলিশ মিলছে না তাই দিনের পর দিন জাল ফেলেও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না ইলিশ। গোন শেষে তারা ফিরে আসছে শূন্য হাতে। জালে ইলিশ ধরা পড়ার কোনো খবর না থাকায় অনেকে ইতিমধ্যে সাগরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মৌসুম শুরু হলেও জেলেরা রয়েছে অব্যাহত ভাবে লোকসানের মুখে। জেলে পল্ল¬ীগুলোতে চলছে এখন হাহাকার।
বরগুনার পাথরঘাটার একাধিক জেলে পল্ল¬ীতে ঘুরে দেখাগেছে, ইলিশের মৌসুমেও পাথরঘাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে না। এবছর জেলেরা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকার বন্ধ রাখলেও এখন পর্যন্ত এর কোন সু- ফল পাচ্ছে না জেলেরা। ফলে সাগরপাড়ের জেলে পল্লীগুলোতে হতাশা নেমে এসেছে। মহাজন, দাদন ব্যবসায়ী ও আড়ৎদারসহ মৎস্যজীবী শ্রমিকরাও দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রতিদিন জেলেরা ইলিশের সন্ধানে সাগর-নদী চষে বেড়ালেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাদের। নোঙ্গর করেই অলস সময় কাটাতে হচ্ছে ওইসব জেলেদের।
প্রতিদিন সাগর চষে বেড়ানো ট্রলার ভীড়ছে পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। কিন্তু সকলকেই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। কেউ কেউ সামান্য কিছু ইলিশ পেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ১৬ দিন সাগর চষে বেড়ানোর পর ঘাটে ভীরেছে নীল সাগর-২ নামের মৎস্য ট্রলারটি। এ নিয়ে এ মৌসুমে তিন বার সমুদ্রে গিয়েছে ট্রলারটি কিন্তু প্রতিবারই ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। তার উপরে এবার সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পরে সমুদ্রে হারিয়ে আসতে হয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকার জাল। সবমিলিয়ে এ মৌসুমে ট্রলারটির ব্যয় হয়েছে বার লাখ টাকা কিন্তু আয় হয়েছে মাত্র বিশ হাজার টাকা। এভাবে চলতে থাকলে জীবন ও জীবিকা নিয়ে মারাত্মক সংকটে পড়বে এখানকার জেলেরা।
বরগুনার পাথরঘাটার একাধিক মৎস্য আড়ৎদার জানান, প্রতি বছর এমন দিনে গড়ে প্রায় এক থেকে দেড়’শ মন ইলিশ আড়তে আসত। অথচ এখন ১০ থেকে ১৫ মন ইলিশ পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাহির থেকে ক্রেতারা মাছ ক্রয় করতে এসে অনেককেই ফিরে যেতে হচ্ছে খালি হাতে।
বিএফডিসি মৎস্য বাজার ঘাট শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান সোহেল বলেন, এমন সময় পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ক্রেতা বিক্রেতায় সরগরম থাকলেও এবার ভিন্ন রূপ। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছে এই ঘাটের শ্রমিকরা। সামনের ঈদ উদযাপন নিয়েও আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।