ববি ভিসি’র অপসারন দাবীতে একাট্টা স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ॥ সাত দিনের কর্মসূচি ঘোষনা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী কার্যকলাপের জন্য বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এসএম ইমামুল হক এর অপসারন দাবীতে একাট্টা হয়েছে বরিশালের স্বাধীনতার স্বপক্ষের বিভিন্ন সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো জোটবদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার হুশিয়ারী দিয়েছেন তারা। ৪১ পদে নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা না রাখাসহ দুর্নীতি’র প্রতিবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী ভিসির অপসারনের দাবীতে যুদ্ধও ঘোষনা করেছেন স্বাধীনতার স্বপক্ষের বিভিন্ন সংগঠন নিয়ে গঠিত ববির ভিসি অপসারনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সংগ্রাম পরিষদ এর নেতা-কর্মীরা। যুদ্ধে জয়ী না হওয়া পর্যন্ত ঘরে উঠবেন না আন্দোলনকারীরা। আর তাই ভিসি’র অপসারন চেয়ে সাত দিনব্যাপী নানা কর্মসূচিও ঘোষনা করেছেন সংগঠনটি। যার মধ্যে রয়েছে- সর্বস্তরের জনগনের অংশগ্রহনে মতবিনিময় সভা, বিক্ষোভ সমাবেশ, প্রতীকি অনশন এবং ভিসির দুনীর্তির সকল তথ্য প্রকাশ। তবে এর পরেও ভিসিকে অপসারন না করা হলে বরিশাল নগরীতে ভিসিকে ঢুকতে না দেয়াসহ ২৭টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোট বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের আওতাধীন সকল অনুষ্ঠান থেকে তাকে বর্জনের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন অনুষ্ঠানেও অতিথি করা হবে না তাকে। এছাড়াও নিয়মতান্ত্রিক ভাবে দূর্বার গণ আন্দোলন গড়ে তুলে দুনীর্তিবাজ ভিসিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে বলে হুশিয়ারী দিয়েছে সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১২ টায় বগুড়া রোডে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ও মহানগর কার্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী ববির ভিসির অপসারনের দাবীতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন এই হুশিয়ারী দেয় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ।

এসময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ববির ভিসি অপসারনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক এ্যাড. এস এম ইকবাল। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন- সম্প্রতি আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিস্যাৎ করার জন্য বর্তমানে ভিসির সরাসরি তত্ত্বাবধানে ৪১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা অনুসরণ করা হচ্ছে না। নিয়োগ বানিজ্যকে প্রতিষ্ঠানিক রুপ দেয়ার জন্য একটি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চক্র ভিসির সক্রিয় মদদে তৎপর রয়েছে। নানা অনিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানকে কলুষিত করছে। এসময় তারা নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা অনুসরনের দাবীসহ ভিসির অপসারনের দাবী জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংগ্রাম পরিষদের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসির বিরুদ্ধে নিয়োগের বিষয়ে অভিযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট (অব.) আব্দুস ছত্তার বীর উত্তম। তিনি বলেন, তার সন্তান ইমরান বর্তমানে বিশ^বিদ্যালয়ের বাসের হেলপারের চাকরি করছেন (মাস্টার রোল)। তাই বিশ^বিদ্যালয়ের ড্রাইভার পদে নিয়োগের বিপরীতে তার সন্তান আবেদন করেন। এছাড়াও এই নিয়োগের বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেন এবং তার সুপারিশ সহ একটা চিঠি বিশ^বিদ্যালয়ে এসেছিল। তারপরেও নিয়োগ পরীক্ষা দেয়ার জন্য তার সন্তানকে প্রবেশ পত্র দেয়া হয়নি। আর এই বিষয়ে জানতে তিনি ভিসির সাথে ফোনে যোগাযোগ করলে, তার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে বলে জানান মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট (অব.) আব্দুস ছত্তার। এছাড়াও আপনার দৌড় কতদূর আমার জানা আছে বলে কটাক্ষ করেছেন ভিসি।

এসময় তিনি আরো বলেন, এই ঘটনার কথা তিনি প্রধানমন্ত্রীর পিএসকে অবহিত করেন এবং তাকে আবার আরেকটি দরখাস্ত করার কথা বলা হয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে। তখন পুনরায় আবার আবেদন করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেন মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট (অব.) আব্দুস ছত্তার। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার নিয়োগের বিষয়ে সুপারিশসহ আরো একটি চিঠি বিশ^বিদ্যালয়ে এসে পৌছেছে। মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট (অব.) আব্দুস ছত্তার আরো বলেন ঐ চিঠি আসার পর তার সন্তানকে ডেকে নেয় বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি। এসময় নিয়োগের বিষয়ে সুপারিশ সহ বারবার চিঠি কে পাঠাচ্ছে বলে জিজ্ঞাসা করেন তিনি ? তখন তার ছেলে ভিসিকে বলে, তারা বাবার আবেদনের প্রেক্ষিতে এই সুপারিশ এসেছে। তখন ভিসি তার ছেলেকে এক প্রকার হুমকি দিয়ে বলে, তোমাকে ড্রাইভার পদে নিয়োগ দেয়া হবে না। দেখি তুমি কি করতে পারো। এসময় তিনি আরো অভিযোগ করে বলেছেন, ভিসির বাসভবনে ১০ বছর ধরে কাজ করছে এমন একজনকে এই ড্রাইভার পদে চাকুরি দেয়ার জন্য পায়তারা করছে বলে জানান তিনি। এসময় তিনিও এই ভিসির অপসারনের জন্য জোর দাবী জানিয়েছেন।

এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং সর্বস্তরের সাধারন মানুষের অংশগ্রহনে বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসির অপসারনের দাবীতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর এর ফলে এই সংগ্রাম পরিষদের পাশাপাশি বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নগরীর সর্বস্তরের সাধারন মানুষ।

বেলা সাড়ে ১১ টায় নগরীর অশি^নী কুমার হলের সামনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বরিশাল জেলা ও মহানগর, বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, ৭১’র ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ৭১, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড বরিশাল জেলা ও মহানগর শাখার ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। ববি ভিসি অপসারনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক এ্যাড. এস এম ইকবালের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ৭১ এর বিভাগীয় সভাপতি প্রদীপ কুমার ঘোষ পুতুল, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার শেখ কুতুব উদ্দিন আহমেদ, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ৭১ এর মহানগরের সাধারণ সম্পাদক কাজল ঘোষ, শান্তি দাস, জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সৈয়দ আনিচুর রহমান, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. একেএম জাহাঙ্গীর, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বরিশাল মহানগরের সভাপতি মশিউর রহমান মিন্টু, মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডারস আব্দুল হক বীর বিক্রম, সার্জেন্ট (অব.) আব্দুস ছত্তার বীর উত্তম, মুক্তিযোদ্ধা এনায়েত হোসেন চৌধুরী, সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সভাপতি শেখ সাইয়েদ আহম্মেদ মান্না, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুমন সেরনিয়াবাত প্রমূখ। এসময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড জেলার ডেপুটি কমান্ডার শাহজাহান হাওলাদার, মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল, মুক্তিযোদ্ধা সংন্তান কমান্ড জেল্রা সদস্য সচিব মো. শাহারিয়ার কবির রিজন, পরিমল চন্দ্র দাস, ছাত্রনেতা অনিক সেরনিয়াবাত, রইজ আহমেদ মান্নাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

এসময় মানববন্ধনে ভিসির দুনীর্তির নানা ফিরিস্তি তুলে ধরে বক্তারা বলেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮ পদে ৪১ কর্মকর্তা কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা অনুসরন করা হয়নি। এছাড়াও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের সমতা বিধান প্রজ্ঞাপনকে অবমাননার মাধ্যমে জিপিএ ২.০০ থেকে জিপিএ ৩.০০ এর কম প্রাপ্তদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেয়া হয়নি। বক্তারা অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়োগ বানিজ্য প্রতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছে। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীয় চক্রের নিয়ন্ত্রনাধীন ওই চক্রটি মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করা সহ নানা অনিয়মকে উৎসাহিত করছে। তাই স্বাধীনতা বিরোধী ভিসিকে অপসারনের জন্য জোর দাবী জানিয়েছেন তারা। পরে ভিসির অপসারনের দাবীতে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে গত সোমবার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোঠা না রাখার প্রতিবাদে নগরীতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড বরিশাল জেলা ও মহানগর।