“পড়বি তো পড় মালীর ঘাড়ে”

সাইদ মেমন ও ওয়াহিদ রাসেল ॥ আইয়ুব আলী হাওলাদার। বয়স ৫৫ বছর। নগরীর নবগ্রাম রোড ধর্মাদি এলাকার মৃত ফজলে আলী হাওলাদারের ছেলে সে। আইয়ুব আলী হাওলাদার নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। এলাকার সবাই তাকে ভালো মানুষ হিসেবে চেনে ও জানে। কিন্তু তার গোপন পরিচয় নিজেই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন তিনি। “পড়বি তো পড় মালীর ঘাড়ে” এই রকম পরিস্থিতি নিজেই তৈরি করেছে। ধর্মাদি মাদ্রাসার সামনে একটি অভিযানের উদ্দেশে অবস্থান করা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে দুই পুড়িয়া গাঁজা দিয়ে ধরা পড়ে সে। পরে তার দেহ তল্লাশী করে আরো ৪৭ পুড়িয়া গাঁজা উদ্ধার করে ডিবির এস আই গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে ডিবি পুলিশ দল। ঘটনাটি ঘটে সোমবার রাত ১১ টায়।
এস আই গোলাম মোস্তফা অভিযান সম্পর্কে বলেন, ধর্মাদি মাদ্রাসার সামনে অন্ধকারে মোটর সাইকেলের উপর একটি বিশেষ অভিযানের উদ্দেশে অপেক্ষারত ছিলেন। এই সময় ওই আইয়ুব আলী এসে তার হাতের মধ্যে দুই পুড়িয়া গাঁজা দিয়ে বলেন, ২০০ টাকা দেন। বকশিষও দেন।
বয়সে প্রবীণ, পড়নে পা পর্যন্ত পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, সম্পূর্ণ সাদা দাড়ি। আপদমস্তকে ধর্মভীরু ওই ব্যক্তির কাছে জানতে চাই কি দিলেন। জবাবে তিনি যখন বলেন, পুইররা। তখন একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করি আরো আছে। তিনি বলেন, আর নাই শেষ হইয়া গ্যাছে।
তখন তার কাঁধে হাত দিয়ে বলি আমার কাছে তো টাকা নেই। সাথে যে এসেছে তার কাছ থেকে নিতে হবে। এই জানিয়ে দলের অন্যান্যদের ডেকে তাকে আটক করা হয়।
পরে তার পড়নের পাঞ্জাবীর নিচে সুকৌশলে রাখা আরো ৪৭ পুড়িয়া গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আইয়ুব আলী জানায়, তার কাছ থেকে গাঁজা ক্রয়কারী ক্রেতা ফোন করে মোটর সাইকেলে রওনা হওয়ার কথা ও ওই স্থানে অপেক্ষা করার কথা ছিল।
সেই অনুযায়ী এসে ভালোভাবে খেয়াল না করে পুড়িয়া দিয়ে ধরা খেয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। এছাড়াও কার কাছ থেকে গাঁজা ক্রয় করে। তার নাম প্রকাশ করেছে। তাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশে ডিবির অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন ডিবির এস আই মোস্তফা।
তবে ওই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করে আইয়ুব আলী হাওলাদার জানান, তার সম্পদ আত্মসাতকারী আ’লীগ নেতার ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন করেছে ডিবি পুলিশ।
আদালত পাড়ায় আইযুব আলী জানান, রায়পাশা-কড়াপুর ইউপি শাখার এক আ’লীগ নেতার ঘনিষ্ট সহচর ছিলেন তিনি। ওই প্রভাবশালী ওই নেতার পরামর্শে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রির উদ্যোগ নেয় সে। তখন ওই নেতা দলিল লেখক সমিতির নেতা হওয়ায় কৌশলে জমি বিক্রির টাকা আত্মসাত করে। এমনকি তার ভিটে বাড়ি বিক্রি করে সেই টাকা আত্মসাত করে। পরে টাকা দাবি করলে তাকে বিলামের পোল এলাকার পরিত্যক্ত ঘরে আটকে মারধর করে। তখন এলাকা ছেড়ে নগরীতে এসে মাহেন্দ্র টেম্পু চালক হিসেবে ডিবি পুলিশের টহল ডিউটিতে থাকতো। দৈনিক ৬ লিটার তেল ও তিনবেলা আহারের বিনিময়ে কাজ করতো সে।
পরে ধর্মাদি মাদ্রাসার পাশে বোনের জমিতে ঘর করে বাস করেন। সোমবার রাতে তাকে ডিবি পুলিশ খবর দিয়ে গাড়িতে নিয়ে মোল্লার দোকানের সামনে নিয়ে যায়। পরে পকেটে হাত দিয়ে গাঁজা বের করে লোকজনকে দেখায় তার সাথে পাওয়া গেছে। এছাড়াও সে গাঁজা ব্যবসায়ী হিসেবে অভিহিত করে নিয়ে এসেছে।
অপরদিকে একই রাতে ডিবির অপর একটি টিম অপ্রত্যাশিতভাবে ৩০ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে।
ডিবির এসআই মো. আনোয়ার হোসেন জানান, রাতে তার নেতৃত্বে একটি দল নগরীর বান্দ রোড খাদ্য বিভাগের গুদামের সামনে অবস্থান করছিল। এই সময় ওই এলাকা অতিক্রম করতে ছিল ঝালকাঠির পশ্চিম চাঁদকাঠি এলাকার শরীফ নুরুল হকের ছেলে শরীফ আমিনুর হক সুমন (৪১) ও একই এলাকার রমেন্দ্র নারায়ন পালের ছেলে সন্তু পাল (২৮)।
সন্দেহজনক মনে হওয়ায় উভয়কে তল্লাশী করে ৩০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
একইভাবে সুমন ও সন্তু দাবি করে এসআই আনোয়ারের বিভিন্ন অপকর্মের খতিয়ান তুলে ধরে। পরে তারা জানায়, এসআই আনোয়ারের সেইসব কর্মের সহায়তা না করার কারণে তাদের পেয়ে ইয়াবা দিয়ে মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে।
ডিবির সহকারী কমিশনার ও মহানগর পুলিশের মুখপাত্র আবু সাইদ জানান, আইয়ুব আলী মাদক ব্যবসায় জড়িত হওয়ার কারণ ও গাঁজা সরবরাহকারীর নাম প্রকাশ করেছে। পূর্বে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল সে। পরে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। এরপর নিয়মিত ধর্মকর্মে বেশি সময় ব্যয় করতো। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। পারিবারিক অর্থ সংকটে পূর্বের পেশায় ফিরে এসেছে। বর্তমানে মাদক ব্যবসায় জড়িত হওয়ার বিষয়টি গ্রামবাসী ও পরিবার অবগত নয়। তাই সকলে বিস্মিত হয়েছে।
ডিবির এসি বলেন, আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে মহানগরীর এয়ারপোর্ট ও ঝালাকাঠির দুই জনের বিরুদ্ধে কোতয়ালী মডেল থানায় পৃথক দুই মামলা করা হয়েছে।