প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও উত্তরপত্র নিয়ে বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ নগরী থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও উত্তর পত্র সরবরাহকারী চক্রের ৪ সদস্যকে আটক করেছে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতারা প্রশ্ন না মিললে টাকা ফেরতের গ্যারান্টি দিয়ে বাণিজ্য করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এই চক্রের ৪ সদস্য আটক হলেও সন্ধ্যার পর থেকে ছাত্র নেতাদের প্রশ্ন বাণিজ্য হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছে।
আটক হওয়া চক্রের সদস্যরা হলো- নগরীর কাউনিয়া মনসা বাড়ি গলির খাঁন ভিলার ভাড়াটিয়া গোপাল চক্রবর্তির ছেলে লিটন চক্রবর্তি (২৯), উজিরপুর উপজেলার কোটরা রাঢ়ী বাড়ীর নূর মোহাম্মদ রাঢ়ীর ছেলে মো. আজিজ রাঢ়ী (২১), কলাপাড়া পৌর এলাকার ১নং ওয়ার্ড নিজামপুর এলাকার মৃত মকবুল হোসেন মুন্সীর ছেলে মো. ইউসুফ মুন্সী (২৮) ও একই এলাকার নূর মোহাম্মদ হাওলাদারের ছেলে মো. আয়নাল হক (৩৪)। তাদের কাছ থেকে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা সংক্রান্ত নগদ ১ লাখ টাকা, নমুনা উত্তরপত্র, ২৫৭ জন পরীক্ষার্থীদের তালিকাসহ আইডি নম্বর ও পাসওয়ার্ড, প্রবেশ পত্রের দুইটি রঙ্গীন ও একটি ফটোকপি, একটি কম্পিউটার, একটি ল্যাপটপ, দুইটি সাদা-কালো ও একটি রঙ্গীন প্রিন্টার, ছয়টি মোবাইল সেট, একটি ইন্টারনেট রাউটার, একটি মডেম এবং একটি পেনড্রাইভ উদ্ধার করা হয়েছে বলে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার মো. আবু সাইদ জানিয়েছেন।
তিনি জানান, ওই চক্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করার শর্তে টাকা নেয় আজ শুক্রবার প্রশ্ন ফাঁস করবে এই শর্তে। পরে সেই প্রশ্নের উত্তর অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। এই জন্য তারা ৩০০ পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সঠিক উত্তর তৈরি করার জন্য নগরীর হাসপাতাল রোড ঝাউতলা প্রথম গলি এলাকার আলতাফ হোসেনের বাসভবন ভাড়া নেয় ওই চক্র। গোপনে এই সংবাদ পেয়ে ডিবি পুলিশের একটি দল নিয়ে সেখানে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে চক্রের ৪ সদস্যসহ সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবি পুলিশ জানায়, চক্রের মূল হোতা ওই ভবনের পাশের বাসিন্দা জুয়েল মোল্লাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তাকে আটকের জন্য অভিযান চলছে।
প্রশ্ন ফাঁস ও উত্তরপত্র তৈরি এবং পরীক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো সম্পর্কে এসি আবু সাইদ জানান, চক্রটি পরীক্ষার হলে পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষকদের সাথে চুক্তি করেছে। তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস করা হবে। ঢাকা থেকে রওনা হওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা সেই প্রশ্নের উত্তর তৈরি করবে। পরে তা প্রশ্নের আকারে তৈরি করে পরীক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকদের মাধ্যমে পাঠানো হবে।
এই পন্থা ব্যর্থ হলে শিক্ষকের সহায়তায় তাদের নির্ধারিত পরীক্ষার্থীরা নিজেদের সাথে রাখা মোবাইল ফোনের ক্ষুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে পেয়ে যাবে প্রশ্নের উত্তর।
এসি সাইদ বলেন, মূল হোতা জুয়েল মোল্লা আটক না হওয়ায় কোন শিক্ষকদের সাথে চুক্তি হয়েছে তা জানা যায়নি। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার পর আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, ফাঁসের প্রশ্নপত্র নিয়ে সন্ধ্যা থেকে ছাত্রনেতাদের বাণিজ্যর দৌড়ঝাঁপ শুরু হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছে। তবে কিভাবে এই প্রশ্নপত্র পেয়েছে সে বিষয়ে নিশ্চিত করতে পারেনি অভিযোগকারীরা। ওইসব ছাত্রনেতারা নিজেদের পরীক্ষার্থী ছাড়াও মোটা অংকের টাকা দেয়া পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেবে। এজন্য বেশ কয়েক ছাত্রনেতা ইতিমেধ্যেই মোটা অংকের টাকা উত্তোলন করেছে বলেও জানায় অভিযোগকারী সূত্রটি।
ওই সূত্র জানায়, শতভাগ নিশ্চয়তার সাথে প্রশ্ন দেবে এবং তা যদি ৮০ শতাংশ না মেলে তবে টাকা ফেরত দেয়ার আশ^াসে এমন বাণিজ্য চালাচ্ছে ছাত্রনেতারা।
অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, কিছু ছাত্রনেতা অবৈধ অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মচারী কর্মকর্তাদের সহায়তায় তারা প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করতে চেষ্টা করছে। যারা তাদের ঘনিষ্ট এবং টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন পেতে তাদের মোবাইল নম্বর রেখে দিচ্ছে তারা। কোনভাবে মোবাইল ফোন কেন্দ্রে নিয়ে প্রবেশ করলে পরীক্ষার্থী এরপর নির্দিষ্ট সময়ে এসএমএস আকারে উত্তর পৌঁছে যাবে।
নগরীর অভ্যন্তরীন সকল কেন্দ্রে স্ব-শরীরে ছাত্রনেতারা ও তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে পাঠানোর চেষ্টা করবে বলেও জানায় সূত্রটি। এজন্য গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর যাবতীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন করতে দেখা গেছে একাধিক ছাত্রনেতাদের। তবে তাদের প্রাপ্ত প্রশ্ন কতটা সত্য বা প্রশ্ন দেয়ার নামে তারা নতুন কোন ঠকবাজী করছে কিনা তা নিশ্চিত করতে পারেনি তথ্য দাতা সূত্রটি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্র মতে, বরিশাল জেলায় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে মোট ২৫টি কেন্দ্রে। এতে অংশগ্রহণ করবে ২১ হাজার ৩৬৩ জন। পরীক্ষার সময় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ভিজিলেন্স টিম ও প্রশাসনের সজাগ অবস্থানে থাকার বিষয় জানায় অধিদপ্তরের সূত্রটি।