প্রবল বর্ষণে নগরীসহ দক্ষিণাঞ্চল পানির নীচে

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ এক সপ্তাহের ব্যবধানে উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা ধেয়ে এসে উপকূলভাগ সহ গোটা দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে প্রবল বর্ষণে জনজীবন সম্পূর্ণই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার পূর্ববর্তি ১৫ ঘন্টায় বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ২৭৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এসময় দেশের সর্বাধিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ভোলাতে ২৮৫ মিলিমিটার। পটুয়াখালীতে ২৩১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ১৯৬৭ সালের ১০ নভেম্বর বরিশালে ২৪ ঘন্টায় ২০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। স্মরনকালের সব রেকর্ড ভেঙে গতকালের প্রবল বর্ষন সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলকেই সয়লাব করে দিয়েছে। আবহাওয়া বিভাগ থেকে আজ ও কাল বৃষ্টিপাতের প্রবনতা প্রশমিত হলেও পরবর্তি ৫দিন তা আবার বৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের সবগুলো বড় নদ-নদী বিপদ সীমার ওপরে বইছে। বরিশাল মহানগরীর ৯৫ভাগ এলাকা এখন পানির তলায়। বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের সবকটি নদী বন্দরকে ২নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ফলে অনধীক ৬৫ ফুট দৈর্ঘের সব যাত্রীবাহী নৌযানের চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রবল বর্ষন আর ঝড়ো হাওয়ার কারনে রাজধানীর সাথে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সড়ক যোগাযোগ রক্ষাকারী দুটি ফেরি সেক্টরে যানবাহন পারাপার যথেষ্ট ব্যাহত হয়। মাওয়া ও পাটুরিয়া সেক্টরে বেসরকারি লঞ্চ ও স্পীড বোটের চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

আবহাওয়া বিভাগের মতে, সুস্পষ্ট লঘুচাপের বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় গভীর সঞ্চালণশীল মেঘমালা তৈরী অব্যাহত রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্র বন্দরসমূহের ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাবার আশংকার কথা জানিয়ে পায়রা সহ সবকটি সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। সাগর যথেষ্ট উত্তাল রয়েছে। হাজার-হাজার মাছধরা ট্রলার ও জেলে নৌকার মহিপুর-আলীপুর, গলাচিপা, চরমোন্তাজ, ঢালচর, চর কুকরী-মুকরী সহ উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরলেও অনেক ট্রলার এখনো সাগরে।

গতকালের এ দূর্যোগের মধ্যেই দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিটে জাতীয় গ্রীডে বিপর্যয়ের পাশাপাশি ৩৩ কেভী সঞ্চালন লাইন ও সাব-স্টেশন সহ ১১/.০৪ বিতরন লাইনের ত্রুটির কারনে বরিশাল মহানগরী ছাড়াও সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর দেড়টার পরে জাতীয় গ্রীড থেকে সরবরাহ শুরু হলেও বরিশালের ৩৩ কেভী মূল নব-স্টেশনটির ভেতরে পানি প্রবেশ করায় লাইন চালু করা যায়নি। দমকল বাহিনীকে নিয়ে এসে পানি সেচ করে বিকেল সাড়ে ৩টার পরে দু-একটি ফিডারে বিদ্যুৎ দেয়া হলেও রাত ৯টায় এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কিছু কিছু এলাকায় সরবরাহ ব্যবস্থা পূণর্বহাল হয়েছে। তবে দক্ষিণাঞ্চলের বেশীরভাগ এলাকাই ছিল অন্ধকারে। গতকাল বিকেল ৪টার পরে ভারি বৃষ্টি কিছুটা হ্রাস পেলেও রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চল জুড়েই হালকা থেকে মাঝারী বর্ষন অব্যাহত ছিল। গতকালের এ দূর্যোগের কারনে বরিশাল বিমান বন্দরে সরকারিÑবেসরকারি ৩টি উড়ানই যথেষ্ট বিলম্বিত হয়। প্রায় ২’শ যাত্রী বিমান বন্দরে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষমান ছিল। বিমান-এর বেলা সোয়া ১১ টার ফ্লাইট দুপুর সাড়ে ১২টার পরে এবং অন্য দুটি বেসরকারি উড়ান বিকেল সাড়ে ৩টার পরে যাত্রী নিয়ে ঢাকায় যায়।

আসন্ন অমাবস্যার ভরা কোটালকে সামনে রেখে এ দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সাগরও যথেষ্ট ফুসে উঠেছে। ফলে সমগ্র উপাকূলভাগের শত-শত দ্বীপ ও চরাঞ্চল সহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের নি¤œ এলাকা পুনরায় সয়লাব হয়ে গেছে। এমনকি এ মৌসুমের তৃতীয় দফার এ প্লাবনে কয়েক লাখ হেক্টর জমির আমন বীজতলাও রোপা আমন পুনরায় প্লাবিত হয়েছে।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বরিশাল মহানগরীর বেশীরভাগ এলাকা পানির তলায় থাকায় গোটা নগরীর নাগরিক পরিসেবা অনেকটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নগরীর বেশীরভাগ এলাকাই ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত।

রোববার ভোর থেকে এ বৃষ্টিপাত শুরু হয়। বৃষ্টির কারণে সকাল থেকেই রাস্তাঘাটে গণপরিবহনের সংখ্যা অনেকটাই কম দেখা গেছে, দোকানপাট খুললেও ক্রেতা সমাগম ছিল খুবই কম।

সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে অফিস আদালতেও তেমন কোন মানুষের ভিড় দেখা যায়নি। নগরীর নিম্নাঞ্চলসহ অনেক এলাকায় জমেছে বৃষ্টির পানি।

নগরীর পলাশপুর, আদালত পাড়া, বিএম কলেজ, মেডিকেল কলেজ, সদর রোড, গীর্জা মহল্লা, ফজলুল হক এভিনিউ, বগুড়া রোড, মুন্সীর গ্যারেজ, গোড়াচাঁদ দাস রোড, জর্ডন রোড, রাজা বাহাদুর রোড, আমানতগঞ্জ, বেলতলা, আমির কুটির, গোরস্থান রোড, কলেজ রো’, কলেজ এভিনিউ, বিএম স্কুল রোড, ফকিরবাড়ী, মল্লিক রোড, শ্রী নাথ চ্যাটার্জী লেন, অক্সফোর্ড মিশন রোড, জিয়া সড়ক, নবগ্রাম রোড, ভাটিখানা, বটতলা, পুলিশ লাইন রোড, হাসপাতাল রোড, বাজার রোড, ফলপট্টি, পোর্ট রোড, হাটখোলা, রুপাতলী, সাগরদী, ধান গবেষনা রোড, ত্রিশ গোডাউন, কেডিসি কলোনী, স্টেডিয়াম কলোনী, ভাটার খাল কলোনী সহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

বরিশাল থেকে আভ্যন্তরীণ নৌ ও সড়ক পথে বিভিন্ন গণ পরিবহনে যাত্রীদের উপস্থিতি ছিল কম। স্কুল-কলেজেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তেমন একটা ছিলনা। নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ষান্মাসিক ও দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শুরু হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির শেষ ছিলনা। দুর্যোগের কারনে অনেক প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা বাতিল করে দেয়।