পুলিশ-বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে আহত-২০ ॥ কাউন্সিলর মীর জাহিদ হাসপাতালে

রুবেল খান ॥ চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ইস্যু নিয়ে নগরীর সদর রোড রনক্ষেত্রে পরিনত হয়েছিল গতকাল। পুলিশ ও বিএনপির নেতা কর্মীদের ধাক্কাধাক্কি, লাঠিচার্জ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও যানবাহন ভাংচুরের কারনে ঘন্টাব্যাপি রণক্ষেত্রের পরিবেশ ছিল সদর রোডে। গতকাল শনিবার বেলা পৌনে ১১ টা থেকে এই ঘটনায় কমপক্ষে ২০ জনের মত নেতা-কর্মী আহত হয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে বিএনপি থেকে। আটক করা হয়েছে কাউন্সিলর মীর জাহিদসহ ৮ নেতা-কর্মীকে। এছাড়াও পুলিশ’র হাতে লাঞ্ছিত হয়েছে বিএনপি’র দক্ষিন জেলার সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁনসহ মহানগরের জেষ্ঠ্য নেতারা। এদিকে, এসব ঘটনার কারনে সদর রোড জুড়ে আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল। দীর্ঘদিন পর এমন ঘটনায় আতংকিত সদর রোডের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আটকে নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। পথচারী ও যানবাহনসহ যাত্রীরা দিক-বিদিক ছোটাছুটি করে। অপরদিকে পুলিশের বেধরক লাঠিপেটায় আহত কাউন্সিলর মীর জাহিদুল কবির জাহিদকে রাতে গুরুতর আহত অবস্থায় শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যান্য আহতদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে ওসি শাহ আওলাদ হোসেন জানিয়েছেন। আটক অন্যান্য নেতা-কর্মীরা হলো- মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহাবুবুর রহমান পিন্টু, জেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মামুন রেজা খান, যুবদল কর্মী অলিউর রহমান, আলমাছ সরদার, মো. সোহাগ, জয়নাল আবেদীন
ও সোহেল আকন। আহতরা হলো দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সভাপতি এবায়েদুল হক চান, যুবদল নেতা এ্যাড. হাফিজ আহম্মেদ বাবলু, কোতয়ালী বিএনপি’র সাধারন সম্পাদক আনোয়ার হোসেন লাবু, মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম লিপন, মশিউর রহমান মঞ্জু, জাবের আব্দুল্লাহ সাদি, বানারীপাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাইদুল ইসলাম, তাজবীর চৌধুরী, গফ্ফার মোল্লা, কামাল, নিজাম সহ ২০ জন।
বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা জানায়, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় গ্রেপ্তারী পরোয়ানার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে নগরীতে পৃথকভাবে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ এর আয়োজন করে উত্তর, দক্ষিণ জেলা এবং মহানগর বিএনপি।
এর মধ্যে সকাল সাড়ে ১০টায় সদর রোডে অশি^নী কুমার হলের সামনে উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু করে। উত্তর জেলা বিএনপি’র সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদের সভাপতিত্বে বিক্ষোভ সমাবেশে দক্ষিণ জেলার সভাপতি এবায়েদুল হক চান, সাধারন সম্পাদক আবুল কালাম শাহিন সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। মহানগর বিএনপি একই সময় দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশের প্রস্তুতি শুরু করে । এ সমাবেশে যোগ দিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের জেলার আহ্বায়ক আলহাজ্ব কেএম শহিদুল্লাহ, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মীর জাহিদুল কবির জাহিদ, মাহাবুবুর রহমান পিন্টু, আমিনুল ইসলাম লিপন ও জাবের আব্দুল্লাহ সাদি’র নেতৃত্বে একটি মিছিল আগরপুর রোড থেকে বের হয়। তারা দলীয় কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে অশ্বিনী কুমার হলের সামনে পৌছুলে প্রধান ফটকে অবস্থানরত কোতয়ালী মডেল থানা এবং মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ বাঁধা দেয়। বাঁধা উপেক্ষা করে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে নেতাকর্মীদের উপর চড়াও হয় পুলিশ। কোন কারন ছাড়াই পুলিশ অতিউৎসাহী হয়ে বেধড়কভাবে লাঠিচার্জ ও সাথে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র’র বাট দিয়ে পেটানো শুরু করে। মারমুখী ভুমিকায় থাকা কোতয়ালী মডেল থানার ওসি শাহ মো. আওলাদ হোসেনসহ পুলিশ একাধিকবার নির্বাচিত কাউন্সিলর মীর জাহিদুল কবির জাহিদ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান পিন্টুকে টানা হেচড়া করে শার্ট ছিড়ে ফেলে। পরে তাদের রাস্তার উপর ফেলে দিয়ে বেধরকভাবে পিটিয়েছে ওসিসহ তার সাথে থাকা পুলিশরা। এতে গুরুতর আহত কাউন্সিলর জাহিদ ও পিন্টুসহ জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক মামুন রেজাকে টেনে হিচড়ে পুলিশের মাহেন্দ্রতে উঠিয়ে থানায় নিয়ে যায়। দুই নেতার উপরে পুলিশের লাঠিচার্জ এবং নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে নেতা-কর্মীরা। তারা সদর রোডে যানজট নিরসনের জন্য দেয়া বাস ও লাঠিসোটা নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া করে। এক পর্যায় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। বিএনপি নেতা-কর্মীরা সদর রোডের এক প্রান্তে অবস্থান নিয়ে পুলিশের উপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এই সময় কয়েকটি গ্যাস চালিত অটোরিক্সা ভাংচুর করা হয়। তখন পুলিশ গিয়ে বাঁধা দেয় উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র বিক্ষোভ সমাবেশে। সেখানে লাঠিচার্জ করে সমাবেশ পন্ড করে দেয়। একই সাথে দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন’র হাত ধরে টানা হেচড়া করে আটকের চেষ্টা করে মডেল থানার ওসি সহ অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে নেতা-কর্মীদের বাঁধায় তারা ব্যর্থ হন। ঘন্টাব্যাপী পুলিশ’র তান্ডবে আহত হয় বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং যুবদলের কমপক্ষে ২০ জনের মত নেতা-কর্মী।
এদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সমাবেশের উদ্দেশ্যে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও মহানগর বিএনপি’র সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার দলীয় কার্যালয়ে আসেন। পরবর্তীতে তার উপস্থিতিতে মহানগর বিএনপি’র বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশের কড়া নজরদারীর মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সভাপতি এ্যাড. মজিবর রহমান সরোয়ার। বক্তব্য রাখেন মহানগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক জিয়াউদ্দিন সিকদার জিয়া, মহিলা দল মহানগর শাখার আহ্বায়ক শামীমা আকবর, মহানগর যুবদলের সভাপতি এ্যাড. আক্তারুজ্জামান শামীম, সাধারন সম্পাদক মাসুদ হাসান মামুন, শ্রমিক দল মহানগর শাখার সাধারন সম্পাদক ফয়েজ আহম্মেদ। এছাড়া শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি বশির আহমেদ, বিসিসি’র প্যানেল মেয়র শরিফ তাসলিমা কামাল পলি, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আফরোজা খানম নাসরিন, মহানগর যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক কামরুল হাসান রতন প্রমূখ।
সভাপতির বক্তৃতায় মজিবর রহমান সরোয়ার বিনা উস্কানীতে বিএনপি নেতা-কর্মীদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জের তীব্র নিন্দা এবং এর সমালোচনা করে বলেন, গনতন্ত্রহীন অবৈধ সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তারা ক্রমশই অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। বিরোধী দলের মিছিল মিটিং দেখলেই তারা আতংকিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারী নির্বাচন কেন্দ্রে কুকুর-বিড়াল আর পুলিশ গিয়ে ভোট দিয়েছে। কিন্তু কোন মানুষ ভোট দিতে যায়নি। যা মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসী সহ বিশ্ব দেখেছে। সেই অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায় ঘন্টা বেজে গেছে। তারা বেসামাল হয়ে গেছে বলেই বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করিয়েছে। ভোটার বিহীন সরকার দলীয় পুলিশ দিয়ে বিএনপি সহ সাধারন মানুষকে পিটিয়ে তাদের বাকরুদ্ধ রাখতে চাইছে।
হামলা-মামলা দিয়ে বিএনপি’কে দুর্বল করা যাবেনা বরং পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হবে বলে হুশিয়ারী দিয়ে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা মজিবর রহমান সরোয়ার আরো বলেন, অবৈধ শেখ হাসিনা সরকার আরো একবার দলীয় পুলিশ দিয়ে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসার রঙ্গিন স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এবার তাদের সেই স্বপ্ন জনগন পুরণ হতে দেবে না। বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে অবৈধ সরকারের পতন ঘটানো হবে। সর্বশেষ পুলিশের হাতে আটক হওয়া বিএনপি নেতা-কর্মীদের অবিলম্বে মুক্তির দাবী জানান তিনি।
এদিকে মহানগর বিএনপি’র সমাবেশ শেষে মজিবর রহমান সরোয়ার এর সঙ্গে নেতা-কর্মীরা দলীয় কার্যালয় ত্যাগ করেন। সরোয়ার চলে যাবার পরে নগরীর কাটপট্টি থেকে যুবদল কর্মী অলি, আলমাছ, সোহাগ, জয়নাল ও সোহেলকে পুলিশ আটক করে।
এ প্রসঙ্গে কোতয়ালী মডেল থানা’র অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বলেন, বিএনপিকে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি দিলেও মিছিল করার জন্য কোন অনুমতি দেয়া হয়নি। তাই সদর রোডে মিছিলকারীদের বাঁধা দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু তারা বাঁধা উপেক্ষা করে মিছিল করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে লাঠিচার্জ এবং আটক করা হয় বলে জানিয়েছেন তিনি। এই ঘটনায় পুলিশের সরকারি কাজে বাঁধা সহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।