পুনরায় জাতীয় গ্রীড বিপর্যয় ॥ দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুত সংকট চরমে

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বুধবার দুপুরের বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার আগেই গতকাল সকাল ৪টার পরে পুনরায় গ্রীড বিপর্যয়ে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে নুতন করে বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ভোলার ২২৫ মেগাওয়াটের কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার স্টেশনটি গতকাল বিকেল পর্যন্ত পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করা সম্ভব হয়নি গ্রীড বিপর্যয় সংক্রান্ত কারিগরি ত্রুটির কারনে। ফলে জাতীয় গ্রীড থেকে দক্ষিণাঞ্চলে চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশের বেশী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছেনা। বিদ্যুৎ নিয়ে চরম দূর্ভোগে দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষ। ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশেডিংএর কবলে পড়ছে বিস্তির্ন এলাকা। হাসপাতাল থেকে শুরু করে পানি সরবরাহ পর্যন্ত চরম বিপর্যয়ের কবলে শিল্প উৎপাদনে মারাত্মক ধ্বস নেমেছে। ব্যবসা-বানিজ্যের অবস্থাও সংকটাপন্ন। অনলাইন ও কম্পিউটার বেজড বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকগন চরম দূর্ভোগে পড়ছেন।
বুধবার দুপুরে বরিশাল-ভেড়ামাড়া ১৩২কেভী ডবল সার্কিট ট্রান্সমিশন লাইনের মাদারীপুর অংশের ১নম্বর সার্কিটের ওপর গাছ পড়ায় ফ্রিকোয়েন্সী নেমে গিয়ে গ্রীড ট্রিপ করে। সাথে সাথে দক্ষিণাঞ্চলের সবগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট একযোগে বন্ধ হয়ে যায়। ঘন্টাখানেকের চেষ্টায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হলেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকায় রাতভরই সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ লোডশেডিং অব্যাহত ছিল। এমনকি ঐ বিপর্যয়ের কারনে ভোলার ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার স্টেশনটি বুধবার রাতে চালু করাই সম্ভব হয়নি।
কিন্তু এরই মধ্যে গতকাল ভোর ৪টার পরে বরিশাল-ভান্ডারিয়া-বাগেরহাট-খুলনা ও বরিশাল-ভেড়ামাড়া ট্রান্সমিশন লাইন দুটি পুনরায় একযোগে ট্রিপ করে। ফলে মাত্র ১২ঘন্টার মাথায় দক্ষিণাঞ্চলের সবগুলো উৎপাদন ইউনিট পুনরায় বন্ধ হয়ে যায়। ‘অপারেশন ব্লাক আউট’এর আওতায় প্রায় কুড়ি মিনিট পরে বরিশাল গ্রীড সাব-স্টেশন সহ ৩৩ কেভী সাব-স্টেশনগুলোতে স্টেশন লোড পূণর্বহাল করা সম্ভব হলেও গ্রাহক পর্যায়ে সিমীত আকারে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় সকাল ৫টার পরে। কিন্তু গতকাল দিনভরই সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল চাহিদার প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ। গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বরিশাল ও ঝালকাঠীতে প্রায় ১শ’ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল। পটুয়াখালী ও বরগুনা সহ দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্রই প্রায় একই চিত্র। ফলে বুধবার দুপুরে গ্রীড ট্রিপ করার সময় যে বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, রাত পেরিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল।
বুধবার দুপুরে গ্রীড বিপর্যয়ের পরে বরিশালে সামিট পাওয়ারের ১১০ মেগাওয়াটের ইউনিটগুলো চালু করা সম্ভব হলেও ভোলার ২২৫ মেগাওয়াটের কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার স্টেশনটি গতকাল বিকেল পর্যন্ত পূর্নোদ্যমে চালু করা যায়নি। উৎপাদন কেন্দ্রটির ৭৫ মেগাওয়াটের ২টি ইউনিটের ১টি চালু করা হলেও বিকেল পর্যন্ত মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছিল। ১নম্বর ইউনিটটি সচল করার চেষ্টা চলছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। ১ ও ২নম্বর ইউনিটের ফায়ার বেজড তৃতীয় ইউনিটটি অতি সীমিত আকারে সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা। তবে আজ সকালের আগে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ গ্যাস ভিত্তিক এ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি স্বাভাবিক উৎপাদনে আসার সম্ভাবনা নেই বলে জানা গেছে।
অপরদিকে এ সংকটকালীন এ সময়েও জাতীয় গ্রীড থেকে দক্ষিণাঞ্চলে চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে না। অথচ বরিশালের সামিট পাওয়ারের ১১০ মেগাওয়াট এবং ভোলার ২২৫ মেগাওয়াটের ইউনিটগুলো পূর্ণ উৎপাদনে এলে এখানের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডের মাধ্যমে অন্যত্র সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
এসব বিষয়ে গতকাল পিজিসিবি’র বরিশাল অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, দক্ষিণাঞ্চলের সবগুলো গ্রীড ট্রান্সমিশন লাইন ও সাব-স্টেশনগুলো ৩০ বছরেরও অধিক পুরনো। ফলে এসব লাইন সরঞ্জামাদীর কর্মক্ষমতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। নতুন করে বেশ কিছু ট্রান্সমিশন লাইন নির্মানের কাজ শুরু হচ্ছে। এসব লাইনের নির্মান কাজ শেষ হলে দক্ষিণাঞ্চলে গ্রীড বিপর্যয় জনিত আর কোন সমস্যা থাকবে না বলে জানিয়ে ততদিন পর্যন্ত নির্বিঘেœ বিদ্যুৎ সঞ্চালনে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।