পুনরায় দ্বন্দ্বের আভাস নিয়ন্ত্রনহীন ছাত্রলীগ হয়ে পড়ছে বিচ্ছিন্ন

রুবেল খান॥ ভেঙ্গে পড়েছে বরিশাল ছাত্রলীগের চেইন অব কমান্ড। যার ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এখানকার ছাত্রলীগের রাজনীতি। জেলা ও মহানগরের তিন সদস্য’র কমিটিতে একাধিক গ্রুপিং। তার মধ্যে দলীয় নেতৃত্ব এবং দিক নির্দেশনার অভাবেই এমনটি হচ্ছে বলে মনে করছেন তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। এমনকি নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে দলীয় কার্যক্রম থেকেও পিছিয়ে পড়েছে ঐহিত্যবাহী এই সংগঠনটি।
জানা গেছে, ২০১১ সালের ৯ জুলাই বরিশাল জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। এ কমিটির জেলায় সুমন সেরনিয়াবাতকে সভাপতি, আব্দুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক ও রাজিব হোসেন খানকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। এছাড়া মহানগর কমিটিতে মো. জসিম উদ্দিনকে সভাপতি, অসীম দেওয়ানকে সাধারণ সম্পাদক ও তৈসিক আহম্মেদ রাহাতকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।
কমিটি ঘোষণার পূর্বে থেকেই জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের মধ্যে চলে আসছিলো দ্বন্দ্ব। নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদকের মধ্যেও তুমুল বিরোধিতা চলে আসছিলো। জেলার সভাপতি ও সম্পাদকের মতাদর্শ ভিন্ন থাকায় সেখানেও চলে অস্থিরতা। তবে সাবেক মেয়র প্রয়াত এমপি শওকত হোসেন হিরন’র আশির্বাদপুষ্ট ও তার দিক নির্দেশনা নিয়ে রাজনীতি করায় নগর জুড়ে ব্যাপক ক্ষমতার অধিকার হন নগর ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। এমনকি সেই ক্ষমতার দাপটে তখন থেকেই নগর এবং জেলা ছাত্রলীগের অধীনে থাকা শাখা কমিটি গঠন আদৌ হয়নি।
অবশ্য তখনকার সময় নগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিম উদ্দিন এক গুয়েমী করে তার নিজস্ব লোক দিয়ে সাধারণ সম্পাদক অসীমকে বাদ দিয়েই ৩০টি ওয়ার্ডে কমিটি ঘোষণা করেন। এই কমিটি অবৈধর পাশাপাশি বিলুপ্ত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি।
এদিকে নগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরন’র মৃত্যুর পর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন যাবত চলে আসা দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে, মহানগর ছাত্রলীগের কমিটিতে ঐক্যের সুর বেজে ওঠে। শুরু থেকে তুমুল বিরোধিতা থাকলেও বিরোধ ভুলে এক হয়ে যায় জসিম এবং অসীম। ঠিক তেমনি চাঙ্গা হয়ে ওঠে জেলা ছাত্রলীগ। বিশেষ করে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক এবং নগরের সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ান এর পাল্লা ভারি হয়ে ওঠে। তবে ছাত্রলীগের মধ্যে এ ঐক্য বেশিদিন টিকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবি বরিশাল ছাত্রলীগের চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে গেছে। যার ফলে এক নেতা অপর নেতার কমান্ড বা সিদ্ধান্ত মানছে না। সকালে মানলেও আবার বিকালে মত পাল্টে ফেলছেন। ইতোমধ্যে তাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে বলেও দাবী করছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।
তারা জানান, সম্প্রতি সরকারি বরিশাল কলেজে ঘোষণা করা হয় ছাত্রলীগের কমিটি। নগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিম উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ান’র যৌথ সিদ্ধান্তে আল-মামুনকে সভাপতি, জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব হোসেন খানকে সাধারণ সম্পাদক ও ইয়াদকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণার পাশাপাশি পত্রিকা অফিস গুলোতে প্রেরণ করা হয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি। তবে তাদের এই সিদ্ধান্ত বেশিদিন স্থায়ীত্ব পায়নি। নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অসীম দেওয়ানের আপত্তিতে মাত্র কয়েক ঘন্টার মাথায় সেই কমিটি বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ঐ কমিটিতে রাজিব হোসেনকে বাদ দিয়ে মাসুমকে সাধারণ সম্পাদক করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন অসীম দেওয়ান। কিন্তু তার সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছে না সভাপতি জসিম উদ্দিন। যার ফলে বিষয়টি নিয়ে ছাত্রলীগের দুই নেতার মধ্যে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চলছে বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এদিকে ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র নেতারা বর্তমান জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কর্মকান্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, ২০০২ এবং ২০০৪ সালে বরিশাল জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। ঐ কমিটির নেতা-কর্মীকে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলাতে দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমান জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটির কোন নেতাই দলের ভালো কাজে অংশ গ্রহণ করছেনা তারা শুধুমাত্র নিজেদের ভালোর দিকটাই খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর এ জন্যই ছাত্রলীগের মধ্যে একাধিক গ্রুপিং সৃষ্টি হয়েছে।
তারা আরো বলেন, ছাত্রলীগের মধ্যে একাধিক দ্বন্দ্ব থাকলেও একটি পর্যায়ে তারা এক হচ্ছেন। তা হচ্ছে টেন্ডারবাজী। সরকারি কোন দপ্তরে টেন্ডারের খবর পেলে বর্তমান ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরাই সবার আগে সেই দপ্তরে হাজির হচ্ছে। পরে সকল দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিং ভুলে টেন্ডার ভাগ বাটোয়ারা করে গুছ করে নিচ্ছে। এজন্য নিজ দলীয় নেতা-কর্মীদের মারধরের মত ঘটনাও ঘটাচ্ছে তারা। সাবেক নেতারা বলেন, ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে তারা টেন্ডারবাজী করায় কেন্দ্র থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়া হয় তাদের। এর পরেও সংযত হচ্ছে না তারা।
সিনিয়র এই নেতারা বলেন, পূর্বে সাবেক মেয়র মরহুম শওকত হোসেন হিরন’র দিক নির্দেশনা এবং তার সমর্থন নিয়ে ছাত্রলীগ পথ চলতো। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে ছাত্রলীগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে বেড়াচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বরিশাল থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতি আরো কলুষিত হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন এই নেতৃবৃন্দ।