পারাবাত-১০ লঞ্চের স্টাফ কেবিনে স্ত্রী খুন ॥ আটক-৩

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ মুঠোফোনে পরিচয়, প্রেম ও বিয়ের পর মাস না গড়াতেই স্বামী, দেবর ও দেবরের এক বন্ধুর হাতে নির্মম ভাবে খুন হয়েছে এক তরুনী। সোমবার মাঝ রাতে বরিশালের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পারাবত-১০ লঞ্চের স্টাফ কেবিনে প্রকাশ্যে এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। হত্যার সময় নিহতের ডাক চিৎকারের শব্দে পুরো লঞ্চের যাত্রী ও স্টাফরা একত্রিত হয়েও কেবিনের একটি দরজা ভেঙ্গে বাঁচাতে পারেনি নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া মিনা আক্তার (২৫) কে। মিনা কুমিল্লা’র হোমনা এলাকার মেয়ে এবং ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বাসায় গৃহকর্মি হিসেবে কাজ করত। কেবিনের দরজা বন্ধ করে নির্ভয়ে হত্যা শেষে হত্যাকারীরা বেরিয়ে এলেও তাদের কেবিনে আটকে রেখে ভোরে লঞ্চ বরিশাল ঘাটে পৌছা মাত্র পুলিশে সোপর্দ করেছে লঞ্চের স্টাফ ও যাত্রীরা।
আটককৃতরা হলো, স্বামী আনিচ পাটোয়ারী (২০), দেবর কালাম পাটোয়ারী (২২) ও তার বন্ধু তুষার (২২)। আনিচ হালিম পাটোয়ারী ও কালাম আইয়ূব আলী পাটোয়ারীর ছেলে। তারা সম্পর্কে চাচাতো ভাই ও উভয়ই শরিয়তপূর জেলার ঘোষাইঘাট এর বাসিন্দা। অপর হত্যাকারী তুষার নওগার সাঈদ হাসানের ছেলে। আনিচ সাভারে একটি জুতার কারখানার শ্রমিক এবং কালাম ও তুষার সাভারেই একটি লন্ড্রিতে কাজ করতো। আটকের সময় তাদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো চাকু উদ্ধার করেছে পুলিশ। বিস্তারিত ঘটনার বিবরন দিয়ে পারাবত-১০ লঞ্চের একাধিক কর্মচারিরা জানায়, সোমবার রাত সাড়ে ৮ টায় ঢাকা থেকে ছাড়ে লঞ্চটি। হত্যাকারিদের সাথেই ঢাকা থেকে লঞ্চে ওঠে মিনা আক্তার। লঞ্চের তৃতীয় তলায় পেছনের ছাদের সাথে থাকা সামসু মাষ্টার ও আকতার মাষ্টারের স্টাফ কেবিনটি ভাড়া করে তারা। রাত আড়াইটার দিকে হিজলা অতিক্রমকালে স্বামী আনিচ পাটোয়ারী হত্যার দায়িত্ব দিয়ে চাচাতো ভাই কালাম ও তার বন্ধু তুষারকে কেবিনের মধ্যে রেখে তদারকির জন্য কেবিন থেকে বের হয়ে যায়। এর সাথে সাথেই মিনার বুকফাটা আর্তনাদ ও প্রানে বাচার করুন আকুতিতে কেবিনের আশপাশের সকল যাত্রীরা ছুটে আসে। কিন্তু তখন ভিতর থেকে আটকে ধারালো চাকু দিয়ে মিনাকে হত্যায় ব্যস্ত ছিল দুই হত্যাকারী। দীর্ঘ সময় ধস্তাধস্তি চলায় ও বার বার দরজায় সজোরে আঘাত করার পরেও হত্যাকারীরা কেবিনের দরজা না খোলায় ও লঞ্চে কোন আনসার সদস্য না থাকায় যাত্রীরা লঞ্চের স্টাফদের ডেকে আনে কিন্তু তারা এসেও দরজা খুলতে ব্যর্থ হয়। অর্ধঘন্টার বেশী সময় ধরে হত্যাকান্ড সম্পাদনের পর খুনিরাই দরজা খুলে দেয় বলে জানায় লঞ্চের স্টাফরা। উটকো ঝামেলার আশংকায় তারা দরজা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করেনি বলেও জানায় তারা। খুনিরা দরজা খোলার পূর্বে গলা কেটে হত্যা করা মিনাকে এমন ভাবে বিছানায় শুইয়ে রাখে যেন তাকে দেখতে মৃত নয়, ঘুমন্ত মনে হয়। কিন্তু রক্তের ¯্রােতে তাদের চালাকি ধরা পড়ে এবং কেবিনের মধ্যেই তাদের আটকে রেখে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। এসময় ওই দুই হত্যাকারী নত না হয়ে উল্টো বেশী ভীড় জমালে আরও লাশ পরার হুমকিও দেয় বলে জানায় প্রত্যক্ষদর্শীরা। অন্যদিকে ঘটনার হোতা স্বামী আনিচ সহযোগিদের ধরা পরার খবরে দোতলায় প্রথম শ্রেনীর কেবিনের চলাচলের পথে একটি তোষক মুড়ি দিয়ে শুয়ে থেকে আত্মগোপনের চেষ্টা করে। তাকে খোঁজা শুরু হলে এক যাত্রী তার সন্দেহ জনক আচরন লক্ষ্য করে তাকে আটকে সহায়তা করে লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে। অতঃপর যাত্রী ও স্টাফরা আনিচকেও একই কেবিনের মধ্যে তালা বদ্ধ করে রাখে। ভোর পৌনে চারটার দিকে লঞ্চ বরিশাল ঘাটে পৌছলে আগে থেকেই অবস্থানরত কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের কাছে তাদের সোপর্দ করা হয়। কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মো. আওলাদ অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের নিয়ে হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র সহ তিন হত্যাকারীকে আটক করেন এবং মিনার লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য প্রেরন করেন। একটি সূত্রে জানা গেছে, মিনাকে হত্যার জন্য তার স্বামী আনিচ চাচাতো ভাই কালাম ও কালামের বন্ধু তুষারকে ৩০ হাজার টাকা দেয়ার চুক্তি করেছিল।
এ বিষয়ে কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মো. আওলাদ এর সাথে আলাপকালে তিনি পরিবর্তনকে জানান, কুয়াকাটা ভ্রমনে আসার নাম করে তিন যুবক হত্যার উদ্দেশ্যেই মিনাকে নিয়ে লঞ্চে উঠেছিল। তিনি জানান ঈদুল ফিতরের ৭ দিন পূর্বে মিনার সাথে মুঠোফোনে পরিচয় হয় আনিচ পাটোয়ারীর । অতঃপর তাদের মধ্যে প্রেম হয়। এর কিছুদিন পর মিনার সাথে দেখা করার জন্য আনিচ ঢাকার মোহাম্মদপুরে যায়। এসময় আনিচের অনিচ্ছা সত্বেও তাদের বিয়ে করিয়ে দেয় স্থানীয়রা। এর পর তারা সাভার এলাকায় বেশ কিছুদিন একসাথে বসবাস করে। হত্যাকারীদের ভাষ্যমতে আনিচের তুলনায় পাঁচ বছরের জ্যেষ্ট মিনার চারিত্রিক ত্রুটির কারনে অনিচ্ছার এই বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে কলহের সৃষ্টি হয় বলে জানান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মো. আওলাদ। এর পর ভাই ও তার বন্ধুকে নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে আনিচ পাটোয়ারী যা তারা বাস্তবায়ন করে সোমবার মধ্যরাতে। মিনাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয় বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি। লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং মিনার বোনদের খবর দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তারা পৌছানোর পর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা বলে জানান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মো. আওলাদ।