“পানি খাওয়ার পাত্রও পুড়ে ছাই”

সাইদ মেমন ॥ আগুন যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছে ভাটিখানাবাসী। বিদ্যুতের বাল্ব জ¦ালানোর সূক্ষ্ম তারের মধ্যে ঘর্ষণে সৃষ্ট আগুন মুহূর্তের মধ্যে কিভাবে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করতে পারে তা দেখে ভয়ে আঁতকে উঠেছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। সামান্য সময়ের ব্যবধানে দারিদ্রতার সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা হকার, যানবাহন চালক, ক্ষুদ্র ও ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী, শ্রমিক সহ ২৭ পরিবারের স্বপ্ন মুহূর্তেই কয়লায় পরিণত করে দিয়েছে আগুন। ভাড়া ঘরের আশ্রয় কেড়ে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে বাধ্য করেছে বসবাসকারীদের। দুই থেকে আড়াই’শ মানুষকে মুহূর্তেই পথে বসিয়ে দিয়েছে।
ওই ২৭ পরিবারের পানি খাওয়ার পাত্রও নেই। সব কিছু পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়ায় ২৭ পরিবারের সকলে ভাষা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। প্রতিবেশি সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাংবাদিক মাসুম শরীফ বললেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ও রক্ত পানি করে আয় করা অর্থে, অর্ধাহারে থেকে একটু একটু করে জমানো টাকায় মালামাল ক্রয় করেছেন। কেউ দিনভর নগরীতে হকারী করে, কেউ রিকসা ও অটো চালিয়ে, কেউ রাজমিস্ত্রি কাজ করতো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের কাজ করা খেটে খাওয়া এমন ২৭ পরিবার পুড়ে যাওয়া টিনশেড বাসার বাসিন্দারা এখন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিয়েছে। নগরীর আশেপাশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে এসে পরিবার পরিজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাস করছে এসব পরিবার।
পরিশ্রম করে আয় করা অর্থে কেনা জামা, কাপড়, খাট, আসবাবপত্র, স্বর্নালংকার, কাগজপত্র, বিছানা, হাড়ি পাতিল সব কিছুই পুড়ে গেছে। কোন কিছুই ব্যবহার করার মত নেই। কিভাবে এই শীতে শিশু ও বৃদ্ধাদের রাত কাটবে তার কোন উপায় জানা নেই তাদের। আগুন নিভে যাওয়ার পর পুড়ে যাওয়া বাসার মধ্যে থেকে কিছু রক্ষা পেয়েছে কিনা খুঁজে ফিরছে অসহায় পরিবারগুলো।
সব কিছু হারালেও শান্তনা পাচ্ছে এই ভেবে ২৭ পরিবারের দুই থেকে আড়াইশ বাসিন্দা শিশু, কিশোর-কিশোরী, নারী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সকলে অক্ষত রয়েছে। এই জন্য বিধাতার কাছেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
সাবেক কাউন্সিলর ও গণ জাগরণ মঞ্চ নেত্রী নিগার সুলতানা হনুফা সেই সন্ধ্যা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ২৭ পরিবারের পাশে রয়েছেন।
তিনি জানান, রাতে উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু সকলের জন্য খাবার হিসেবে খিচুরি দিয়েছেন। জেলা প্রশাসক প্রত্যেক পরিবারের মাঝে দুইটি করে কম্বল দিয়েছেন। যুবলীগের কেন্দ্রীয় ও মহানগর আ’লীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদেক আব্দুল্লাহও কম্বল দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রউফ মিয়ার কাছে ক্ষতিগ্রস্ত ২৭ পরিবার ও তাদের সদস্য সংখ্যা এবং ক্ষতির পরিমানের তালিকা দেয়া হয়েছে।
ওই এলাকার সকল বাসিন্দা একেকটি পরিবারকে রাত কাটাবার ব্যবস্থা হিসেবে নিজেদের বাসায় ঠাঁই দিয়েছে। এলাকাবাসীও যে যেভাবে পারছেন সহায়তা করছেন।
ঘটনার পরেই ছুটে গিয়েছিলেন বরিশালের জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান। তিনি বলেন, জীবনে চলার পথে এমন ঘটনা ঘটবে। তা মেনে নিয়ে নতুন করে শুরু করতে হবে।
মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে তাৎক্ষনিকভাবে তিনি ৬০টি কম্বল বিতরন করেছেন। আরো ১ টন চাল বরাদ্দ করেছেন। এছাড়াও ক্ষতিপূরন নিরুপনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। এছাড়াও তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ায় জেলা প্রশাসক ড. গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান, মহানগর আ’লীগ নেতা সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, উপজেলা চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টুকে এলাকাবাসী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।