পরীক্ষা গ্রহন পদ্ধতির দুর্বলতায় মেধাবী হয়েও ফেল করছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিরা

 

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ দৃষ্টি প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহন পদ্ধতি যুগোপযোগী না হওয়ায় ভালো ফলাফল করতে পারছে না তারা। ব্রেল পদ্ধতিতে লেখা পড়ায় অভ্যস্থ শিক্ষার্থীদের শ্রুতি লেখক এর মাধ্যমে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। এ করনে মেধাবী হয়েও পাশ করতে পারছে না তারা। এমন এক বাস্তবতার প্রমান মিলেছে সরকারি সমাজ সেবা অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত বরিশাল অন্ধ স্কুলে। মেধাবী হয়েও ফেল করতে হয়েছে দুই দৃষ্টি প্রতিবন্ধি ছাত্রীকে।

অবশ্য দৃষ্টি প্রতিবন্ধি হয়েও এসএসসি পাশ করেছে রুবেল সরদার ও মন্টু হাওলাদার। সম্প্রতি প্রকাশিত মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে তারা দু’জনই “এ” মাইনাস পেয়েছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধিদের পরীক্ষা গ্রহনে যথাযথ পদ্ধতীতে থাকলে জিপিএ-৫ পাওয়াটা দুঃসাধ্য ছিলোনা তাদের। তার পরেও তাদের স্বপ্ন এখন উচ্চ শিক্ষার আলোয় অন্ধত্বকে জয় করে নেয়া।

এদের মধ্যে মো. রুবেল সরদার গৌরনদীর চাঁদশি গ্রামের শাহ আলশ সরদারের ছেলে এবং মন্টু হাওলাদার ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার চারাখালী গ্রামের দিন মজুর ইসমাইল হাওলাদারের ছেলে। তারা দু’জনই বরিশাল নগরীর আমতলার মোড় এলাকায় সমাজ সেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন অন্ধ স্কুলের আবাসিক হলে থেকে লেখাপড়া করতো। তাছাড়া বরিশাল নগরীর বান্দ রোডে পানি উন্নয়ন বোর্ড মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগ থেকে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেছিলো। পরীক্ষা গ্রহনে বর্তমান প্রচলিত নিয়মেই তারা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলো।

গতকাল রোববার দুপুরে কথা হয় এসএসসি জয় করা দৃষ্টি প্রতিবন্ধি মো. মন্টু হাওলাদার এর সাথে। এসময় তিনি আজকের পরিবর্তনকে বলেন, আমার বাবা একজন কাঠ মিন্ত্রি। সংসারে বাবা-মা ছাড়াও আমরা চার ভাই। এর মধ্যে আমিই সবার বড়। তাছাড়া চার ভাইয়ের মধ্যে আমরা তিন ভাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধি। তাই আমি (মন্টু) ছোট ভাই নূহু এবং শফিক তিন জনই বরিশাল অন্ধ বিদ্যালয়ে থেকে লেখা-পড়া করছি।

মন্টু বলেন, আমরা দৃষ্টি প্রতিবন্ধিরা ব্রেল পদ্ধতিতে পড়া-শুনা করি। কিন্তু বোর্ড পরীক্ষা ব্রেল পদ্ধতিতে দেয়ার সুযোগ নেই। শ্রুতি লেখা এর মাধ্যমে আমাদের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। যা আমাদের ভালো ফলাফল করার একটি অন্যতম বাঁধা। তার মধ্যেও প্রচুর অধ্যাবসয় করেছি। ভালো ফলাফল এর মাধ্যমে এসএসসিকে জয় করে নিতে। কিন্তু পাশ করেছি। কিন্তু আমার আশা ছিলো আরো বেশি।

একই কথা জানিয়েছেন এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করা মো. রুবেল সরদার। গৌরনদী উপজেলার চাঁদশি গ্রামের শাহ আলম সরদারের ছেলে মো. রুবেল বলেন, পরীক্ষা পদ্ধতি আমাদের জন্য একটু সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। হলে বসে আমরা মুখে পরীক্ষার উত্তর বলে দেই আর শ্রুতি লেখক লিখে দিচ্ছেন। কিন্তুশ্রুতি লেখক হিসেবে যাদের নিয়োগ দিচ্ছে তারা এতটা ভালো বোঝে না। যে কারনে সকল উত্তর জানা সত্যেও আমরা ভালো ফলাফল করতে পারছি না। তার পরেও বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা আমাদের প্রতি ভালোভাবে নজর দেয়ায় কোন রকম পাশ করে আসতে পারছি।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল সরকারি অন্ধ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থীরা ব্রেল পদ্ধতীতে ভালো পড়াশুনা করতে পারে। কিন্তু তাদের পরীক্ষা গ্রহনে ব্রেল পব্ধতির কোন সুযোগ নেই। এমনকি ব্রেল পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহন ও খাতা দেখার কার্যক্রম এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। এটি হলে আমাদের ধারনা অন্ধ শিক্ষার্থীরা আরো ভালো ফলাফল করতে পারবে। তাছাড়া দৃষ্টি প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহনের নিয়ম হলো, শিক্ষার্থী পাশে বসে প্রশ্নের উত্তর বলবে আর শ্রুতি লেখক তা লিখবে। তাছাড়া পরীক্ষার নির্ধারিত সময় শেষেও লেখার জন্য প্রতিবন্ধিদের ২০ মিনিট সময় দিতে হবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে সেই সময় পাচ্ছে না। অবশ্য কোন কোন সময় শিক্ষকরা সময় দিয়ে থাকেন।

তিনি বলেন, বরিশাল অন্ধ বিদ্যালয় হতে এ বছর মোট ৪ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র দু’জন পাশ করেছে। বাকি দু’জন গনিতে ফেল করেছে। তারা হলেন, সাবিনা ইয়াসমিন লাকি ও তার ছোট বোন শিল্পি। তাদের ফেল করার কারন হচ্ছে শ্রুতি লেখক এর দুর্বলতা। যারা কেবল মাত্র অস্টম শ্রেণিতে উর্ত্তীন, তারাই শ্রুতি লেখক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছে। কিন্তু এদের নবম-দশম শ্রেণির লেখা পড়া সম্পর্কে কোন ধারনাই নেই তাদের। আর তাই ফেল করতে হচ্ছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থীদের।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান সময়ে অনেক দৃষ্টি প্রতিবন্ধি শিক্ষক রয়েছে। যারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধিদের পরীক্ষার খাতা মুল্যায়ন করতে পারে। অথচ তাদের দিয়ে খাতা দেখার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে না। তাদের দিয়ে অন্ধ শিক্ষার্থীদের খাতা দেখানো এবং ব্রেল পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থীরা আরো ভালো ফলাফল করবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন ওই প্রধান শিক্ষক।