পরিমানে কম ও ভেজাল তেল বিক্রয় পাম্প মালিক-কর্মচারীদের সিন্ডিকেটের প্রতারনার শিকার যান চালকরা

জুবায়ের হোসেন ॥ নগরীসহ আশপাশের প্রায় সবকটি পেট্রোল পাম্প মালিক ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে পরিমাপে কম দেয়াসহ ভেজাল তেল বিক্রয়ের অভিযোগ মিলেছে। দিনভর ক্রেতাদের বোকা বানিয়ে পাম্প মালিকদের পরোক্ষ ইশারায় কর্মচারীরা ওই অপকর্ম করছে। পাম্প মালিক কর্মচারীদের যোগসাজসে প্রতারনা শিকার ক্রেতাদের সাথে প্রায় প্রতিদিনই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। অপকর্মের শিকার নিরীহ ক্রেতারা বেশি প্রতিবাদী ভুমিকা না রাখলেও যারা একটু কঠোর হয়। সেইসব ক্রেতাদের নাজেহাল করা ছাড়াও মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছে সোপর্দের হুমকিও দেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ সম্পর্কে ছোটখাটো চুরির বিষয়টিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া জানিয়ে বড় চুরি যান্ত্রিক ত্রুটি হিসেবে দাবি করছে মালিকসহ পাম্প কর্মচারীরা।
অন্যদিকে ক্রেতাদের অধিকার লঙ্ঘন হওয়া সত্ত্বেও এখানকার ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এ নিয়ে তেমন কোন মাথা ব্যাথা নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দপদপিয়া জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে নগরীসহ রহমতপুর পর্যন্ত ১৪টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। আশপাশেরগুলো বাদ রেখেও নগরী পাম্পগুলোর ওপর নির্ভরশীর হাজারো যানবাহন চালক। তবে ওই সকল প্রতিটি পাম্পের বিরুদ্ধেই গ্রাহকদের তেলের পরিমান কম দেয়ার অভিযোগ হর হামেশা মেলে। গ্রাহকদের অভিযোগের আওতায় থাকা পাম্পের মধ্যে রয়েছে, দপদপিয়া এলাকায় তুর্য্য ও বেলী ফিলিং স্টেশন, রূপাতলী বাসস্ট্যান্ডের লিলি ফিলিং স্টেশন, সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম এর মালিকানাধিন পাওয়ার হাইস সংলগ্ন রূপাতলী ফিলিং স্টেশন, শাওন এর মালিকানাধিন ডোস্ট ও রাব্বি ফিলিং স্টেশন, নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন অটো সার্ভিস পেট্রোল পাম্প, সুরভী ফিলিং স্টেশন এবং নতুন বাজার এলাকার ইসরাইল তালুকদার ফিলিং স্টেশন ও ভুইয়া ফিলিং স্টেশন। এ সকল পাম্পের প্রতিটির বিরুদ্ধেই পরিমাপে কম দেয়াসহ ভেজাল তেল বিক্রয়ের একাধিক অভিযোগ করেছে ক্রেতারা।
তবে এদের মধ্যে ইসরাইল তালুকদার ও ডোস্ট ফিলিং স্টেশনের অবস্থা ভয়াবহ। অন্যান্যরাও পিছিয়ে নেই। গত ২/৩ দিনের তেল চুরির ও হাতে নাতে ধরা পড়ার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে ইসরইল তালুকদার ফিলিং স্টেশনে। বাবুগঞ্জ এলাকার রাজিব অভিযোগক করে জানান, দুই দিন পূর্বে ইসরাইল তালুকদার পাম্প থেকে সে তার সুজুকি বাইকের ট্যাংকিতে ১২ লিটার পেট্টোল নেয়। বাইকের যন্ত্রাংশে বড় ধরনের ত্রুটি হওয়ায় মেকারের শরনাপন্ন হয় সে। মেকার তাকে জানায়, ভেজাল পেট্টোলের কারনে বাইকের সমস্যা হয়েছে।
ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাসের মালিক মামুন অভিযোগ করেন, বুধবার রাতে ওই পাম্প থেকে মাইক্রোবাসে ৬৮ লিটার পেট্টোল নেয়। ওই পরিমান পেট্টোলে যতদুর যাতায়াত করা যায় তার তিনের দুইভাগ পথও অতিক্রম করতে পারেননি তিনি। তাকে পাম্প থেকে কমপক্ষে ৫/৭ লিটার কম দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগে জানান তিনি।
কলেজ এভিনিউ এলাকার শাহজাদা অভিযোগ করে জানান, বুধবার রাতে তার বাইকের পেট্টোল পুড়িয়ে যাওয়ায় পাম্পে যান। সেখান থেকে ১০০ টাকার পেট্টোল বাইকের ট্যাংকিতে দেয় পাম্প কর্মচারী। পাম্প থেকে কিছুদুর গিয়ে পেট্টোল না থাকায় বাইক বন্ধ হয়ে যায়। তার সাথে করা প্রতারনার অভিযোগ কোনভাবেই মেনে রাজি হয়নি কর্মচারী। সে শাহজাদার সাথে তর্কে জড়িয়ে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এবং কতিপয় সাংবাদিক এসে বিষয়টি মিমাংসার নামে মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে ঘটনাস্থল পাম্প ত্যাগ করে। এমন অভিযোগ ডোস্ট ফিলিং স্টেশনের বিরুদ্ধেও রয়েছে। ইতিপূর্বে ডোস্ট, লিলি ও ইসরাইল তালুকদার পাম্পে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে পরিমাপে কম দেয়ায় জরিমানাও করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা বন্ধ থাকায় সিন্ডিকেট করে এমন চুরিতে মেতে উঠেছে তারা। এ বিষয়ে অভিযুক্ত বিভিন্ন পাম্পে গেলে তারা বিষয়গুলোকে কিছুটা স্বীকার করেছে। কেউ কেউ বলেছে সরকারই নাকি তাদের পরিমাপে কম দেয়ার নিয়ম করে দিয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছে চুরি না করলে লাভ হবে কি করে।
হাতে নাতে চুরির সময় ধরা পড়া ইসরাইল তালুকদার ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার আব্দুর রব বলেন, সব পাম্পেই একটু ঝামেলা আছে তবে তা বেশি নয়। বাদ বাকি নাকি মেশিনের সমস্যা বলে দাবি করে সে।
তবে এই সমস্যায় তেল কখনো বেশি আসে না কেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি মুচকি হেসে বিষয়টি মিটমাট করার প্রস্তাব দেন। এমন চুরিতে পাম্প মালিকদের নিরব ইন্ধন আছে বলেও অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আর তা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে।
ক্রেতা প্রতারিত হওয়ার বিষয়টিতে ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর বরিশাল অঞ্চলের সহকারী পরিচালক সুমি রানি মিত্র’র সাথে আলাপকালে তিনি করেছেন অবাক করার মত আচরণ। এটি তাদের প্রধান কাজ হওয়া সত্ত্বেও তিনি জানান তারা সিডিউলের বাইরে গিয়ে কিছু করেন না। এটি তাদের তাদের সিডিউলের মধ্যেই নেই। এর চাইতে বেশি কোন সাহায্যর দরকার হলে অফিসের আরও উচ্চ পদস্থদের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ বরিশাল অঞ্চলের সাবেক সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান বলেছেন, এমন দুর্নীতি রোখাই তাদের কাজ। যেখানে ভোক্তা অধিকার লংঘন হবে সেখানেই অভিযান পরিচালনা করতে বদ্ধপরিকর ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, এটি অবশ্যই অন্যায়। পূর্বেও হয়েছে এবং শীঘ্রই আবার ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হবে। সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।