পপুলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চার শিক্ষকের কোচিং বাণিজ্যে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ প্রাইভেট ও কোচিং বানিজ্যে মেতে উঠেছেন বরিশাল সদর উপজেলার রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়নের পপুলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষক। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। তার পরেও পরীক্ষায় ফেল করার ভয়ে শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্যের শিকার হচ্ছে অসহায় শিক্ষার্থীরা। এমনকি শিক্ষাবৃত্তিকারী শিক্ষকদের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন অভিভাবকরাও। তবুও এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না স্কুল কর্তৃপক্ষ।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, সদর উপজেলার রায়পাশা কড়াপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পপুলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা সাফল্যে রয়েছে গৌরবজ্জল ইতিহাস। কিন্তু এখানকার শিক্ষকদের রাজনৈতিক মনোভাব এবং কোচিং বানিজ্যের ফলে সেই ইতিহাস মুছতে শুরু করেছে। কোচিং বানিজ্য ছাড়াও শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের জিম্মি করে করছেন ঘুষ বানিজ্যও।
স্কুলের একাধিক শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা অভিযোগ করে বলেন, পপুলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সেই আগের শিক্ষার মান এখন আর নেই। এখানকার শিক্ষকরা ক্লাশে ঠিক ভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠ দান করাচ্ছে না। তারা যতক্ষন ক্লাশে উপস্থিত থাকছেন ততক্ষন অযাচিত সময় পার করছেন শিক্ষকরা। ক্লাশে তারা পাঠ দানে অমনোযোগি হলেও কোচিং বানিজ্যের পেছনেই বেশি সময় দিচ্ছেন এখানকার শিক্ষকরা। বিশেষ করে স্কুলটির গনিত শিক্ষক মোঃ নুরুল ইসলাম রিয়াদ, মোঃ সাইদুল ইসলাম, বিজ্ঞান শিক্ষক মোঃ মাহমুদুর রহমান ও কম্পিউটার শিক্ষক মোঃ দেলোয়ার হোসেন মুন্না।
এরা যোগদানের পর থেকেই ক্লাশের শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ধস নেমে আসে। অনিয়মকে নিয়মে পরিনত করে ক্লাশ সময়ে স্কুল কক্ষেই কোচিং এর নামে শিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। যে শিক্ষক বাধা দিবেন তার হয় যাবে চাকুরী। আর না হয় হবেন বদলী। তাছাড়া অভিভাবকরা বাধা দিলে কৌশলে হাতে টিসি ধরিয়ে দিয়ে কেড়ে নেয়া হচ্ছে তাদের সন্তানদের ছাত্রত্ব। যার ফলে ঐ চার শিক্ষকের নির্যাতন এবং শিক্ষা বানিজ্য নিরবেই সহ্য করে যাচ্ছেন তারা।
এমন অবস্থা চলতে থাকলে বেশ কিছুদিন পূর্বে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জিয়াউল হক ও শিক্ষা কর্মকর্তারা পপুলার স্কুল পরিদর্শনে যান। এসময় তারা শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোন প্রকার কোচিং বানিজ্য না করার নির্দেশ দেন। সেই সাথে স্কুলে প্রাইভেট বানিজ্য বন্ধ করে দেন। প্রয়োজনে ক্লাশ সময়ে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় নিয়ে পাঠদানের নির্দেশ দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সহ অন্যান্য শিক্ষকদের। কিন্তু চোর না শোনে ধর্মের কাহিনী। ঠিক সেভাবেই বিদ্যালয়ের চার প্রভাবশালী ও শিক্ষাব্যবসায়ী শিক্ষক নুরুল ইসলাম রিয়াদ, সাইদুল ইসলাম, মাহমুদুর রহমান ও দেলোয়ার হোসেন মুন্না কোচিং বানিজ্য চালিয়েই যাচ্ছেন। তবে স্কুলের মধ্যে নয়। স্কুল থেকে প্রায় একশ গজের মধ্যে এ্যাড. মানিক এর নতুন ভাড়া বাড়িতে। সেখানে প্রতিদিন পপুলার স্কুলের ৫০ শিক্ষার্থী ঐ চার শিক্ষকের কোচিং বানিজ্যের শিকার হচ্ছে। গতাকাল শনিবার সকালে সরেজমিন পরিদর্শন কালে এর সত্যতা পাওয়াগেছে। তবে শিক্ষার্থীরা ঐ শিক্ষকদের ভয়ে মুখ খোলার সাহস না পেলেও কথা হয়েছে অন্যতম শিক্ষাব্যবসায়ী শিক্ষক মোঃ নুরুল ইসলাম রিয়াদ এর সাথে।
তিনি দাবী করে বলেন, কোচিং পড়ানোর নিয়ম রয়েছে। মন্ত্রনালয়ের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৪০জন ছাত্র-ছাত্রীকে কোচিং করানো যাবে। তাছাড়া তিনি বলেন, শুধু তো আমরাই কোচিং করাই না। ঐতিহ্যবাহী জেলা স্কুলের মধ্যেই কোচিং করানো হয়। সেখানে আমার ছেলেও পড়ে। জেলা স্কুলের শিক্ষকরা কোচিং করিয়ে যদি ভুল না করে তবে আমাদেরও কোন ভুল হচ্ছে না বলেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ঐ চার শিক্ষক বিদ্যালয়ের সব থেকে বদ মেজাজী এবং অর্থ লোভি শিক্ষক। সম্প্রতি ব্যবহারিক পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৮’শ টাকা করে উৎকোচ গ্রহন করে। এ অপরাধ প্রমানিত হওয়ায় গনিত শিক্ষক মোঃ নুরুল ইসলাম রিয়াদকে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া অপর শিক্ষক মোঃ দেলোয়ার হোসেন মুন্নাকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আত্মসাতকৃত টাকা ফেরত দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন ম্যানেজিং কমিটি। অন্যথায় তাকেও বহিস্কার করা হবে বলেও জানিয়েছেন ম্যানেজিং কমিটির এক সদস্য। আর তাই চতুর শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন মুন্না দুর্নীতি ধরা পড়ে এখন চুপচাপ আছেন। নাক-চুল কাটার ভয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এড়িয়ে চলতে তিনি অসুস্থতার ভান করে ছুটিতে আছেন। ডাক্তার ভাস্কর সাহাকে ৫’শ টাকা সম্মানি দিয়ে তার কাছ থেকে একটি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে ১৫ দিনের শয্যা বিশ্রাম লিখিয়ে নিয়েছেন। সেই ব্যবস্থাপত্র জমা দিয়ে গত ১৪ অক্টোবর থেকে ছুটি কাটাচ্ছেন দেলোয়ার হোসেন। কিন্তু অসুস্থতার কথা বলে ছুটি কাটালেও স্কুলের পাশেই মাহিন মেডিকেল হল নামক তার ওষুধের দোকানে রাত-দিন ব্যয় করছেন। আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার কড়াপুর বাজারে গেলে এর সত্যতা পাওয়াগেছে।
এদিকে একদিকে বিদ্যালয়ে পাঠদানে শিক্ষকরা করছেন অনিয়ম। অন্যদিকে কম্পিউটার শিক্ষকের অনুপস্থিতি। এই দুই নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি মহা বিপাকে আছেন অভিভাবকরাও। বেশ কয়েকজন অভিভাবক বলেন, কদিন বাদেই পরীক্ষা। আর এই মুহুর্তে অসুস্থতার অজুহাতে শিক্ষক দেলোয়ার কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ায় অনেকটা ক্ষতির আশংকা করছেন অভিভাবকরা।
এ বিষয়ে পপুলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শিক্ষক কর্মকর্তারা বিদ্যালয়ে এসে কোচিং বানিজ্য বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। তবে বাইরে কেউ কোচিং করায় কিনা তা আমার জানানেই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো। অসুস্থতার অজুহাতে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, আমার কাছে একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা পত্র জমা দিয়ে শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন ছুটিতে যান। আমি ঐ চিকিৎসা ব্যবস্থা পত্রটি ম্যানেজিং কমিটির কাছে হস্তান্তর করব। সেখানেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।