পদ্ম ফুলের হাসি দেখতে সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষের ভিড় বাড়ছে রাজাবাহাদুর সড়কে

জুবায়ের হোসেন ॥ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার কেউ কথা রাখেনি কবিতায় বলেছিলেন, মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, “বড় হও দাদাঠাকুর-তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো, সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে”। পদ্মের বন কি অদ্ভ্তু সুন্দর। পড়ন্ত নিস্তব্দ দুপুর, নীল আকাশে সাদা সাদা তুলোর মতো মেঘের সামিয়ানার নিচে কাকচক্ষু জলের সেই পদ্ম পুকুরপারে ঝিরঝিরে পাতার শিরিষ আর হিজলের বন। মৃদু বাতাসে দু একটা শিরীষের পাতা বা হিজলের লালচে ফুলের পানিতে ঢলে পড়া। গাঙ ফড়িং এর চঞ্চল উড়াউড়ি, তার ভেতরে পদ্মপাতায় সাপ আর ভ্রমরের খেলা,কি অপার্থিব সুন্দর। বর্তমানে সাদা বা লাল রং শাপলা ভরা দীঘি আর বিল চোখে পড়লেও আমাদের দেশে কিন্তু এমনই পদ্ম দীঘি মোটামুটি বিরলই বলা যায়। জানা গেছে,পদ্ম ফুল শুধু সৌন্দর্য্যরে দিক থেকেই নয়, প্রাচীন সভ্যতার ধর্ম আর মিথ্যে এর গুরুত্বপূর্ন অবস্থান ছিল। তাছাড়া বৌদ্ধ আর হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী পদ্ম হলো সৌন্দর্য্য আর বিশুদ্ধতার প্রতীক। ঠিক তেমনই একটি স্থান নগরীর ঐতিহ্যবাহী বিরল প্রজাতীর শ্বেতপদ্ম পুকুর। বরিশাল বি.আই.ডব্লিউ.টি.এ এর নির্বাহী প্রকৌশলী’র দপ্তরের পার্শ্বে ছায়াঘেরা পল্লীরমত হিমনীড়, ছায়ানীড়, শিলানীড় ও চান বাংলোর এই পুকুরে আবার ফুটেছে পদ্মফুল। তবে বিআইডব্লিউটিএর কর্মচারীদের কারনে গত পাঁচ বছর ধরে ঐতিহ্যবাহী পুকুরটির পদ্মফুল ফোটেনি। চুন আর কীটনাশক’র প্রভাব কাটিয়ে পুকুর আবার ভরে উঠে পদ্ম’র সবুজ পাতায়। প্রস্ফুটিত পদ্মের হাসি দেখতে সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষ প্রতিদিন ভিড় করেন নগরীর বান্দ রোডের পার্শ্বে এই পুকুর পাড়ে।
জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে স্টিমার কোম্পানির কর্মকতাদের জন্য নগরীর রাজাবাহাদুর সড়কে বেলস পার্কের উওর প্রান্তে হিমনীড় বাড়ি তৈরী করা হয়। ১৯৪২ সালের দিকে নির্মিত হিমনীড় ও পশ্চিম পাশের চাঁনবাংলোয় বি.আই.ডব্লিউ.টি.এ এর কার্যক্রম শুরু হয়। এ বাড়ি চত্বরে খনন করা হয় ওই পুকুর। সুউচ্চ মাচানে তৈরী করা হয় একটি বাংলো। চারপাশে নানারকম ফুল আর বনজ গাছাগাছালি রোপন করা হয়। ধীরে ধীরে এ বাড়ির ঘিরে থাকে ফুল- পল্ল¬বে। এছাড়াও আরো জানা গেছে, সৌন্দর্য প্রিয় কেউ একজন পুকুরে পদ্ম গাছ রোপন করে। এছাড়া পুকুরের চারপাশে কাঠাল চাপা, গোলাপ, রাধাচুড়া, হাসনাহেনা, নয়নতারা, ডালিয়া, জিনিয়াসহ নানা প্রজাতির দুর্লভ ফুল গাছও রোপন করা হয়েছিল। বাড়ির আঙিনা জুড়ে হরেক প্রকার পুস্পরাজি আর পুকুরের পদ্মফুল’র সৌন্দর্যের সমারোহের কারনে এরশাদ সরকার আমলে হিমনীড়ে বিআইডব্লি¬উটিএ’র সদর দফতর স্থাপন করা সিদ্বান্তও নেয়া হয়। পরে তা বাস্তবে রুপ দেয়া হয়নি। বাড়িটি ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। অযন্ত-অবহেলায় গাছ মরে যায়। বাড়িটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা পূরনো বৃক্ষ গোপনে বিক্রি করে দেয়। এছাড়াও লাভের আশায় পদ্ম পুকুরে হাইব্রিড জাতের মাছ চাষ করার জন্য পুকুরের পানি সেচ দিয়ে চুন ও কীটনাশক প্রয়োগ করে। এতে পদ্মফুলের গাছ মারা যায়। যার কারনে গত ৫ বছরে পদ্মফুল আর ফোটেনি। এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে সৃষ্টি হয় নানা প্রতিক্রিয়ার। তবে গত বর্ষায় পদ্মপুকুরে পদ্ম গাছগুলো আবার প্রকৃতির নিয়মে জেগে উঠতে শুরু করলেও ফুল ফোটেনি। কিন্তু এবার আবারো শে^তপদ্ম প্রস্ফুটিত হয়। নতুনভাবে প্রস্ফুটিত পদ্ম দেখতে প্রতিদিনই ভিড় জমান সৌন্দর্যপ্রেমীরা।
এদিকে ঐতিহ্যবাহী এই পদ্মপুকুর টি দেখতে আসা ফয়সাল আহমেদ নামের এক দর্শনার্থী জানান, এই পুকুর ঘিরে যে স্থানটি রয়েছে একটি সংরক্ষিত এলাকা। এখানে যততত্র ভাবে কেউ আসতে পারে না। তাছাড়া পদ্ম ফুল ফোটে মার্চ মাস থেকেই আর মার্চের শেষ থেকে মে মাস পর্যন্ত এ দৃশ্য দেখা যায়। তাই আর কি মাসের শেষ সময়ে এসেছি পরিবার পরিজন নিয়ে এই পুকুরটিতে ফোটা শ্বেত পদ্ম ফুল দেখতে। আর এই দৃশ্য দেখে আসলেই আমরা মুগ্ধ। এই পুকুরকে কেন্দ্র করে পর্যটন স্পটে রুপান্তর করার জোর আহবান জানান তিনি। এসময় তিনি আরো জানান, শুধু বরিশালের মানুষই নয় বিভিন্ন জেলা থেকে যে সকল ভ্রমনপিপাসু মানুষ এই সময়টিতে বরিশালকে দেখতে আসে। তারা এই শ্বেত পদ্মপুকুরটি পরিদর্র্শনে ভুল করেন না।
এদিকে বি.আই.ডব্লিউ.টি.এর এক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, বি.আই.ডব্লিউ.টি.এ এর এ দপ্তরটি কালের স্বাক্ষী হিসাবে আজও মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে। তাছাড়ও প্রতিদিনই এখানে প্রচুর মানুষ আসে এই পুকুরটি দেখতে। তাছাড়া এখানের ঐতিহ্যবাহী চান বাংলোয় রয়েছে ভি.ভি.আই.পি এর বিশ্রামাগার। শিলানীড় ও ছায়ানীড়ে রয়েছে কর্মকর্তা ও কর্মচারীগনের বসবাস।