নিয়ম মানে না ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা, ভোগান্তিতে রোগীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ অপ্রতিরোধ্য হয়েগেছে ওষুধ কোম্পানির বরিশালের মেডিকেল প্রতিনিধিরা। নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে কোম্পানির ওষুধ বিক্রি বৃদ্ধির নামে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছেন তারা। এতে করে সাধারন রোগীরা সু-চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারন চিকিৎসকরাও। তবে অপ্রতিরোধ ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রতিরোধ করতে দেখা যাচ্ছে না কোন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যার ফলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে নগরীর সরকারী এবং বেসরকারী হাসপাতালে রোগ দেখাতে আসা রোগীদের মাঝে।
সরেজমিনে দেখাগেছে, নগরীর মধ্যে অন্যতম সরকারী চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বৃহত্তর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর (জেনারেল) হাসপাতাল। এখানে প্রতিদিন বহিঃর্বিভাগের মাধ্যমে শত শত রোগী চিকিৎসা গ্রহন করছেন। আর প্রতিদিন প্রতিষ্ঠান দুটিতে রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে ¯্রােতের গতিতে। সেই সাথে বাড়ছে বরিশালে কর্মরত বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য। সকাল থেকে গভির রাত পর্যন্ত বহিঃর্বিভাগ এবং ওয়ার্ড গুলো চশে বেড়াচ্ছেন কয়েকশ মেডিকেল প্রতিনিধি। তাদের অত্যাচারে ঘরে ঘুমানোর সুযোগও পাচ্ছেন না সাধারন চিকিৎসকরা। রাতে ঘুমানোর সময় এমনকি ঘুম থেকে জাগতে হয় মেডিকেল প্রতিনিধিদের ডাক শুনে। প্রতিদিন সকালে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালের ইন্টার্নি ডক্টর্স হোস্টেলের সামনে গেলে এমন বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করতে পারবেন যেকোন মানুষ। কোম্পানির শত শত প্রতিনিধি এবং তাদের মোটর সাইকেল ও ব্যাগের ভিরে পথ চলতে গিয়েও বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন চিকিৎসক ও পথচারীরা
এরপর আবার হাসপাতালগুলোতেও একই বিরম্বনা। কখনো রোগী দেখার সময় চিকিৎসকদের চেম্বারে অনুমতি ছাড়া ঢুকে পড়ছেন প্রতিনিধিরা। রোগীকে চিকিৎসা দেয়ার মধ্যেই ঘন্টার পর ঘন্টা চা-চক্রে মিলিত হচ্ছে তারা। আবার কখনো কখনো কোম্পানির ওষুধ লেখানোর জন্য ওষুধের নমুনা এবং উপহার নিয়ে চিকিৎসকের কানের কাছে মৌমাছির মত ভ্যান ভ্যান করছে। বিশেষ করে কোম্পানির নারী মেডিকেল প্রতিনিধিদের দিয়েই করানো হচ্ছে এমন কাজ। যার ফলে একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে সু-চিকিৎসা থেকে বঞ্ছিত হচ্ছে রোগীরা।
এদিকে শুধু ডাক্তারের চেম্বারের মধ্যেই নেয়। চেম্বারের বাইরে দাড়িয়েও রোগীদের ভাগান্তিতে ফেলছেন কোম্পানির প্রতিনিধিরা। চিকিৎসকের কাছ থেকে ব্যবস্থা পত্রে ওষুধ লিখে বের হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় ওষুধ কোম্পানির অপ্রতিরোধ প্রতিনিধিদের রোগীর হাতে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে টানা টানি। চিকিৎসক তাদের ওষুধ লিখলো কিনা তা দেখার জন্য একজন প্রতিনিধি অপর জনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছেন ব্যবস্থাপত্রটি। অনেক সময় টানা-টানি করতে গিয়ে ছিড়ে যাচ্ছে ব্যবস্থাপত্রটি। বহিঃর্বিভাগের পাশাপাশি ওয়ার্ড গুলোতেও এক চিত্র দেখাগেছে। কোম্পানির প্রতিনিধিরা ডাক্তার সেজে ওয়ার্ডে রোগীর শয্যা পাশে গিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র চেক করছেন। নার্সের কক্ষে প্রবেশ করে পুলিশ কেসের ফাইল সহ সকল চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র তছনছ করছে। কোন কোন সময় কোম্পানিকে দেখানোর জন্য হাসপাতাল থেকে রোগীর ব্যবস্থাপত্র গায়েবকরে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিধিরা। এ নিয়ে অনেক সময় রোগীর স্বজনদের সাথে প্রতিনিধিদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটতে দেখাগেছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সদর হাসপাতালে ঘুরে এমন চিত্র দেখাগেছে। শুধু বরিশালেই নয়, দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিটি সরকারী এবং বেসরকারী হাসপাতালের কোম্পানি প্রতিনিধিদের একই চিত্র ফুটে উঠেছে।
এদিকে কোম্পানি প্রতিনিধিরে এমন অপ্রতিরোধ্য আচরনের জন্য কিছু সংখ্যক অর্থলোভি চিকিৎসকদের দায়ী করছেন রোগী এবং তাদের স্বজনরা। তারা জানান, কোম্পানির ওষুধ লেখার জন্য ঐসব অর্থলোভি চিকিৎসকদের লাখ লাখ টাকা এবং উপহার প্রদান করছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। যার ফলে রোগী ভালো হোক আর নাই হোক টাকা খেয়ে নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লিখছেন তারা। এসব অসাধু চিকিৎসকদের ফায়দা লোটায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে অন্যান্য সাধারন চিকিৎসকদের।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগ সূত্রে জানাগেছে, কোম্পানির প্রতিনিধিদের চিকিৎসক ভিজিট ও হাসপাতালে প্রবেশের জন্য সময় নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে। দুপুর দেড়টার পড় তারা বহিঃর্বিভাগে প্রবেশ করতে পারবে বলে নোটিশ টানিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এই নোটিশ ও নির্দেশ মানছে না।
জানতে চাইলে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. মু. কামরুল হাসান সেলিম বলেন, আমরা কোম্পানিতে ভিজিটের সময় নির্ধারন করে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তার পরেও রোগী বেশে কিছু প্রতিনিধি চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করছে। চিকিৎসকের পাশাপাশি ভোগান্তিতে ফেলছে রোগীদেরও। তিনি বলেন, এমন চিত্র তার চোখে ধরা পড়েছে। যার ফলে গতকাল মঙ্গলবার তিনি নিজেই বহিঃর্বিভাগের চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনে সামনে ঘুরে কোম্পানি প্রতিনিধিদের বাইরে বের করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে নির্দেশ অমান্য করে প্রতিনিধিরা হাসপাতাল অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।