নিহতের বোনকেও দেয়া হচ্ছে হত্যার হুমকি বাবুগঞ্জে ছেলেকে হারিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় মা-বাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ বাবুগঞ্জের চাঁদপাশা ইউনিয়নের ঘটকের চর গ্রামে মিজানুর রহমান হত্যাকান্ডের পর তার পিতামাতাকে অনবরত হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছেলে হারিয়ে এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে নিহতের পিতামাতা। এমনকি এ ঘটনায় নিহতের বোন আফরোজা সুলতান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলেও ঘাতকদের হুমকির কারনে আদালতে হাজির হতে না পারায় এবং হত্যাকান্ডকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে পুলিশ রিপোর্ট দেয়ায় মামলাটি খারিজ করে দেয়া হয়। খারিজের বিরুদ্ধে বাদী আবার আদালতে আর্জি করলেও সে অনুপস্থিত থাকায় তাও খারিজ হয়ে যায়। ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা পেতে নিহতের বোন আফরোজা পিতামাতাকে ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করছেন। মিজান একই এলাকার আব্দুল মাজেদ হাওলাদারের একমাত্র ছেলে। নিহতের একমাত্র বোন আফরোজা সুলতানা জানান, ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর রাতে মিজান সিগারেটের জন্য ঘর থেকে বের হয়। এরপর সারারাত তার কোন খোঁজ মেলেনি। পরদিন ফজরের নামাজের জন্য তার মা ঘর সংলগ্ন পুকুরে গেলে মিজানকে ভাসতে দেখে ডাক-চিৎকার দেন। সকলে ছুটে এসে মিজানের লাশ তীরে তোলেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা দেখতে পান মিজানের গলায় আঘাতের চিহ্ন। তারা ধারনা করেন রাতের যে কোন সময় মিজানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি পুলিশে জানালে তারা ঘটনাস্থলে গেলেও প্রভাবশালী ঘাতকদের কারণে লাশের ময়নাতদন্ত দূরের কথা সুরতহাল রিপোর্ট পর্যন্ত করেনি। ঘাতকদের সিদ্ধান্ত নেশা আসক্ত হয়ে পুকুরে পড়ে মারা গেছে মিজান। কবর দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। সেই নির্দেশ মোতাবেক হত্যার শিকার মিজানকে কবর দেয়া হয়। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন গোটা পরিবারের সদস্যরা। বাকরুদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে তাদের জিম্মি করে ফেলে ঘাতকরা। থানায় কোন অভিযোগ পর্যন্ত দিতে পারেননি। এ বছর ২২ ফেব্রুয়ারী চুপিসারে মিজানের বোন আফরোজা সুলতানা বাদী হয়ে ১৬ জনকে আসামী করে বরিশাল আদালতে মামলা দায়ের করেন। আপন চাচা লিয়াকত আলী হাওলাদারকে প্রধান আসামী করা হয়। অপর আসামীরা হচ্ছে ঃ লিয়াকতের স্ত্রী পরী বেগম, ছেলে কালাম, সালাম, আলো, ফারুক, মেয়ে রানী ও রুমি, ভাগ্নে কিবরিয়া, নিহতের চাচাতো ভাই নুরু ও ছোট চাচা আতাহার হাওলাদার, তার স্ত্রী রেনু বেগম ও মেয়ে হীরা বেগম, নিহতের চাচা সিরাজ আহমেদ, চাচাতো ভাই শিল্পী এবং বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মকবুল আহমদ। আদালতের বিচারক বিমান বন্দর থানার ওসিকে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেন। থানা থেকে এসআই শ্যামল মিত্রকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। সম্প্রতি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিজান পুকুর পাড়ের গাছ থেকে পড়ে মারা গেছে বলে রিপোর্ট দেন। এমনকি মিজানের পিতামাতাকে জিম্মি করে লিখিত আনা হয় তাদের ছেলে নেশাগ্রস্ত হওয়া পুকুরে পড়ে মারা গেছে। তাদের মেয়ের দায়েরকৃত মামলায় যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। এ কারণে মামলা থেকে সকল আসামীকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য ১৬ মার্চ ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেন। বাদী অভিযোগ করেন ঘাতকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। মিজানের লাশের ময়নাতদন্ত হলে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তিনি আরো জানান, ঘটনার পর থেকে তার বাবা-মাকে ঘাতকরা জিম্মি করে রেখেছে। তাকেও হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এ কারণে তিনি বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারছেন না। পিতামাতার সাথে যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে আদালত ওই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে এবং বাদী হাজির না হওয়ায় মামলটি খারিজ করে দেন। ওই খারিজের বিরুদ্ধে বাদী না-রাজী দিলে তাও খারিজ হয়ে যায় বাদীর অনুপস্থিতির কারণে। বাদী আরো জানান, ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচারে তিনি উচ্চাদালতে লড়বেন। আফরোজা বলেন, জমিজমা নিয়ে চাচাদের সাথে দ্বন্দ্ব চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। গত তিন বছর পূর্বে জমিজমা লিখে দেয়ার জন্য তার বাবাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে আবার ফেরত দেয়। তার পিতার মৃত্যুর পর একমাত্র ভাই মিজান সকল জমির অংশীদার। এ কারণে পরিকল্পিতভাবে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তদন্তকারী কর্মকর্তা বরিশাল মেট্রোপলিটন বিমান বন্দর থানার এসআই প্রদীপ মিত্র জানান, দীর্ঘ তদন্তে দেখতে পান মিজান পুকুর পাড়ের গাছ থেকে পড়ে মারা গেছে। তাছাড়া বাদী সম্পূর্ণ সুস্থ নয় বলে তার ধারণা। এ কারণে মামলা থেকে আসামীদের অব্যাহতি চেয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়া হলে আদালত তা আমলে নিয়ে মামলাটি খারিজ করে দেন।