নিষেধাজ্ঞা শেষে পোর্ট রোড মোকাম ইলিশে সয়লাব

রুবেল খান ॥ প্রজনন মৌসুম’র শিকার নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশে সয়লাব হয়ে গেছে নগরীর পোর্ট রোড’র মৎস্য অবরতন কেন্দ্র। গতকাল সোমবার সকাল ৬টার পর থেকে ইলিশ মাছ বোঝাই ট্রলার এসে ভেড়া শুরু করে। তাই গত ২২ দিন ধরে অলস সময় কাটানো শ্রমিকদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। মোকামে আসা ইলিশ মাছের সিংহভাগ ডিমওয়ালা। এসব মাছের দামও নাগালের মধ্যে ছিল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোকামে আসা ইলিশ নিষেধাজ্ঞার সময় শিকার করে বরফ দিয়ে রাখা ছিল। এ কারনেই দাম নাগালের মধ্যে। পোর্ট রোডে আসা মাছের মধ্যে দুই হাজার মন’র বেশি মাছ দেশের বিভিন্নস্থানে পাঠানো হয়েছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানাগেছে, প্রজনন মৌসুম হওয়ায় গত ১ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত মা ইলিশ নিধন, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। তাই গত ২২ দিনে বরিশালের বৃহত্তর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশের দেখা মিলেনি। দিন রাত অলস সময় কাটাতে হয়েছে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের শ্রমিকদের।
এদিকে সরকারের দেয়া ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়েছে রোববার রাত ১২টায়। নিষেধাজ্ঞার পর পরই ইলিশ শিকারে নেমে পড়েন বিভাগের প্রায় ৭০ হাজার জেলে। মাছ ধরার ট্রলার এবং জাল নিয়ে নদ-নদী ও সমুদ্রে যাত্রা শুরু করে তারা। আর তাই গতকাল সোমবার সকাল থেকেই পোর্ট রোডের মোকামে আসতে শুরু করে বিভিন্ন সাইজের ইলিশ।
পোর্ট রোডের আড়ৎদাররা জানিয়েছেন নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর দিন হওয়ায় মোকামে ইলিশের আমদানী বেশি। কাংখিত’র চেয়ে প্রথম দিনে অনেক বেশি পরিমান ইলিশ মোকামে এসেছে। তবে আজ থেকে কমে যাবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
আড়তদার ইয়ার হোসেন সিকদার জানান, সোমবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার মন ইলিশ এসেছে পোর্ট রোডের মোকামে। যা ট্রাক এবং ট্রলার যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছে। দিনের শেষে রফতানিকৃত ইলিশের পরিমান চার হাজার মন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশাব্যক্ত করেন তিনি। রোববার দিনগত গভীর রাতে এসব ইলিশ বিভিন্ন নদী থেকে শিকার করা হয়েছে বলে দাবি করেন। আজ মঙ্গলবার থেকে সাগরে শিকার করা ইলিশ আসতে শুরু করবে।
তিনি জানান, মোকামে আসা ইলিশ মাছের মধ্যে গ্রেট ও ঝাটকা সাইজের পরিমান বেশি। সকাল থেকে এক কেজি বা তার অধিক ওজনের প্রতিমন ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকায়, ৬শ থেকে ৯শ গ্রামের এলসি সাইজের প্রতিমন বিক্রি হয়েছে ২২ থেকে ২৫ হাজারের মধ্যে, ৪শ থেকে ৫ গ্রামের মধ্যে ভেলকা সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকায়, ২৫০ গ্রাম ওজনের গোটলা সাইজের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার এবং জাটকা বিক্রি হয়েছে প্রতিমন ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায়।
ইলিশ নিয়ে আসা জেলে মেহেন্দিগঞ্জের দড়িরচর খাজুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন ঘরামী জানান, সকাল থেকে তারা যে পরিমান ইলিশ মোকামে নিয়ে এসেছেন তা শুধুমাত্র কীর্তনখোলা, মেঘনা, কালাবদর, তেতুলিয়, সন্ধ্যা, আড়িয়াল খাঁ, গজারিয়া ও পায়রা নদী থেকে শিকার করা। চলতি মৌসুমে এসব নদ-নদীতে ইলিশের পরিমান তুলনামুলক বেশি। তাই সাগরে না গিয়ে আপাতত নদীতে ইলিশ শিকার করছেন তারা।
এদিকে সরেজমিনে দেখাগেছে, মোকামে যেসব ইলিশ আসছে তার বেশিরভাগই ডিমওয়ালা। নিষেধাজ্ঞা শেষে মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে যে পরিমান ইলিশ মোকামে আমদানী হয়েছে তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও অসাধু জেলেরা ইলিশ শিকার করে তা বরফ দিয়ে মজুত রাখে এবং নিষেধাজ্ঞা শেষে তা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন সংশ্লিষ্টরা। এমন অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন বেশ কয়েকজন আড়ৎদার। তবে তাদের দাবী মজুতকৃত মাছের পরিমান তুলনামুলক কম।
অপরদিকে ইলিশের আমদানী বেশি থাকলেও বরফ উৎপাদন নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন আড়তদার ও জেলেরা। স্থানীয় বরফ কল থেকে উৎপাদিত বরফের চাহিদা পুরন না হওয়ায় খুলনা থেকে বরফ আনা হয়েছে। পোর্ট রোডের খান আইস ফ্যাক্টরীর ইনচার্জ মো. জাহাঙ্গির হোসেন বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার এক দিনের মাথায় যে পরিমান ইলিশ আমদানী শুরু হয়েছে তাতে বরফের চাহিদাও কয়েক গুন বেড়েছে। কিন্তু বরিশালে থাকা ৭টি বরফ কলে উৎপাদিত বরফ দিয়েও চাহিদা পুরন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই অনেক জেলে এবং আড়তদাররা খুলনা, পাথরঘাটা, কলাপাড়া এবং ভোলার মনপুরা থেকে বরফ এনে চাহিদা পুরনের চেষ্টা করছেন।
এদিকে সাগরে ইলিশ সিকারের উদ্দেশ্য যাত্রা করা ভোলার মনপুরার জেলে সরদার আফজাল হোসেন বলেন, সোমবার ভোর রাতে বরফ নিয়ে ইলিশ শিকারের জন্য সাগরের উদ্দেশ্য যাত্রা করেছেন তারা। প্রথম পর্যায় ১০ দিনের টার্গেট নিয়ে সাগরে যাবেন। বেশি ইলিশ পেলে এর আগেও মোকামে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, সকাল থেকে আমি নিজেই পোর্ট রোডে ইলিশ মোকাম পরিদর্শন করেছি। এবছর নদীতে প্রচুর ইলিশ থাকায় মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ব্যাপক পরিমান ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়ছে। তাছাড়া সোমবার যে পরিমান ইলিশ বাজারে উঠেছে তা সবই তাজা এবং লোকাল নদীর ইলিশ। এটি সরকারের যুগপযোগি সিদ্ধান্তেরই একটি ফসল বলে দাবী তার।
মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ইলিশ সাধারণত ৪টি সময়ে ডিম ছাড়ে। ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় দুটি সময়ে ইলিশ ডিম ছাড়তে পেরেছে। তাই ইলিশের পেটে এখানো ডিম থাকা স্বাভাবিক। তবে সার্বিক দিক বিবেচনায় দেখা গেছে, ২২ দিনের জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষা এবং বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের যে নিষেধাজ্ঞা ছিলো তা সফল হয়েছে। এর পর আগামী ৯ দিন পরে জাটকা ইলিশ শিকারের নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। আশা করি জেলেরা সেই নিষেধাজ্ঞা ও সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক ভুমিকা রাখবে।