নিরাপদ ঈদ যাত্রা এবং নির্বিঘ্ন ঈদ উদযাপনে প্রস্তুত মেট্রো ও রেঞ্জ পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ পবিত্র ঈদ উল আযহাকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীসাধারনের নিরাপদ যাত্রা এবং শান্তিপূর্নভাবে ঈদ উদযাপনের লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন এবং রেঞ্জ পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার মেট্রো ও রেঞ্জ পুলিশ পৃথক পৃথক স্থানে লঞ্চ ও বাস মালিকদের পাশাপাশি নাগরিক সেবাদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানগনদের সাথে এই মতবিনিময় করেন। এসময় যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা এবং শান্তিপূর্ন ঈদ উদযাপনের লক্ষ্যে নানান প্রস্তাব উত্থাপন এবং পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়।
এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নগরীর চাঁদমারী এলাকায় পুলিশ অফিসার্স মেসের সভা কক্ষে ঘরে ফেরা মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত ও নগরবাসীকে শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ পালনে করনীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নগর পুলিশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশ কমিশনার এস এম রুহুল আমিন।
সভায় ঈদে ঘরমুখো এবং ঈদ আনন্দ শেষে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘœ করনের বিষয়ে আলোচনা হয়। সেই সাথে সড়ক পথে কোরবানীর পশু বহনকারী ট্রাক থেকে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে আলোচনা হয়।
মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহনকারীদের দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ কমিশনার এসএম রুহুল আমিন বলেন, কোরবানীর পশুবহনকারী কোন যানবাহন রাস্তায় থামিয়ে হয়রানি কিংবা চাঁদাবাজী চলবে না। সুনির্দিষ্ট এবং শতভাগ তথ্য ছাড়া পশুর ট্রাকে তল্লাশী করা যাবে না। এ বিষয়টি তদারকির জন্য মেট্রোপলিটন এলাকার সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জদের দায়িত্ব দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। তাছাড়া বরাবরের মতই মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখানো হবে। সন্ত্রাসী এবং চাঁদাবাজরা ঘরমুখো মানুষের ঈদ যাত্রায় বাঁধা প্রদান করলে তাদের ছাড় দেয়া হবে না। এদের বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার অনুরোধ জানানো তিনি।
তাছাড়া বাসে কিংবা লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বন্ধে মালিক পক্ষকে সতর্কতার পাশাপাশি লঞ্চে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা অথবা লঞ্চ ও বাস ছাড়ার পূর্বে যাত্রীদের ছবি তুলে রাখার পরামর্শ দেন পুলিশ কমিশনার। লঞ্চের ছাদে যাত্রী পরিবহন বন্ধের জন্য বলেন। এর পাশাপাশি লঞ্চের টিকেটে যাত্রীর নাম ও মোবাইল নম্বর লিখে রাখার পরামর্শ দেন পুলিশ কমিশনার। তবে টিকিটের বিষয়ে বিরোধিতা করেন লঞ্চ মালিকরা। এছাড়া নির্বিঘেœ ঈদ উপহার দিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রহন করা নানা বিষয় পদক্ষেপের তথ্য তুলে ধরা হয় মতবিনিময় সভায়।
বাস ও লঞ্চ মালিক সহ অংশগ্রহনকারীরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। এর মধ্যে বরিশাল জেলা বাস-মালিক গ্রুপের নেতৃবৃন্দ বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক দ্রুত সংস্কারের দাবী জানান। তখন সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সংস্কার কাজ নিয়ে নানা দিক তুলে ধরে বলেন, মাদারীপুর থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়ক ফোর লেন প্রকল্পের পরিকল্পনা হয়েছে। কোন দাতা সংস্থা পেলে কাজ শুরু করা হবে। তাই এই মুহুর্তে বড় ধরনের কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সাগরদী ব্রিজ প্রশস্ত করন কাজের পরিকল্পনা হয়েছে। সড়কের পূর্ব পাশে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেয়া হয়েছে। খুব শীঘ্রই উচ্ছেদ কাজ করা হবে। তাছাড়া ব্রিজ প্রশস্ত করনের লক্ষে সাগরদী ব্রিজের পাশে থাকা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের একটি পানির পাইপ সরিয়ে নিতে চিঠি দেয়া হয়েছে। তাছাড়া সাগরদীর ওই রাস্তাটি টিকিয়ে রাখতে পর্যপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা জরুরী বলেও জানিয়েছেন সওজ এর নির্বাহী প্রকৌশলী। এর বাইরে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক দ্রুত সংস্কার করা হবে জানিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, বৃষ্টির কারনে মেরামত কাজে বিলম্ব হয়েছে। তবে ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রাস্তার ক্ষতিগ্রস্থ স্থানগুলো চলাচল উপযোগী করে দেয়া হয়েছে।
বরিশাল-পটুয়াখালী মিনিবাস মালিক সমিতি মহাসড়কে থ্রি-হুইলার বন্ধের দাবী জানান। এ নিয়ে মাহেন্দ্র মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ অনেকটা উত্তেজিত হন। সভায় তারা রূপাতলী মিনিবাস মালিক সমিতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, মেট্রো এলাকায় থ্রি-হুইলার মাহেন্দ্র চলাচল করতে পারবে। কিন্তু সেখানেও বাস মালিক সমিতি নগ্ন হস্তক্ষেপ করছে। তাদের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ কমিশনার এসএম রুহুল আমিন বলেছেন, মহানগরী এলাকায় মহাসড়ক থাকলে তাতে মাহেন্দ্র চলাচল করতে পারবে। এতে বাস মালিক সমিতি কোন ভাবেই বাঁধা দিতে পারবে না। তাছাড়া বরিশাল-পটুয়াখালী মহাড়কের শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতুর ঢালে রূপাতলী বাস মালিক সমিতির চেক পোষ্টের কোন অনুমতি নেই বলে দাবী করেছেন বিআরটিএ এবং ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা।
অপরদিকে লঞ্চ মালিক সমিতি ঘরমুখো ও ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এসময় তারা লঞ্চে ও বাসে অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করার বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ওজোপাডিকো’র বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী ঈদের সময় নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের আশা ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমানে মহানগরী এলাকায় পিক আওয়ারে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এর প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু সেখানে সরবরাহ পাচ্ছেন ৭০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট। এছাড়া অফ পিকে ৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এর চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাচ্ছেন মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ মেগাওয়াট। এর ফলে লোডশেডিং হচ্ছে। তাছাড়া মহানগরী এলাকায় ট্রান্সফর্মার বিকল হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটছে। পল্লিবিদ্যুৎ সমিতির আওতায় বরিশালে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এর চাহিদা থাকলেও সেখানে ৩০ থেকে ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়া হচ্ছে বলেও দাবী জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তার পরেও ঈদে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষে আগামী ২৬ আগস্ট ট্রান্সফর্মার পরিবর্তন এবং সংস্কার কাজ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক আজমল হুদা সরকার মিঠু জানিয়েছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে তাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দুটি মেটাল ডিটেক্টর এবং দুটি আর্চওয়ে গেট ক্রয় করা হয়েছে। তবে এগুলো পরিচালনার জন্য নেই দক্ষ জনবল। যে কারনে অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এটি দক্ষ এবং প্রশিক্ষত লোকের মাধ্যমে ব্যবহার হলে ভালো হবে। এজন্য পুলিশের সহযোগিতা চান তিনি। এছাড়া ঈদের আগে তাদের সংস্থার দু’জন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ঢাকা সদর ঘাটে ডেপুটেশনে দায়িত্ব পালন করবেন। ঈদ পরবর্তী ওই দু’জন বরিশাল নৌ বন্দরে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তদারকি এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন।
ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক ফারুক হোসেন জানিয়েছেন, ঈদে যে কোন দুর্যোগ মোকাবেলায় তাদের ৯টি টিম প্রস্তুত রয়েছে। বাস এবং লঞ্চ টার্মিনালে তাদের তদারকি থাকবে। বড় কিংবা ছোট যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ফায়ার সার্ভিস কাজ করবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ছাড়াও নাগরিক সেবা প্রদানকারী মেট্রোপলিটন পুলিশ, নৌ-পুলিশ, র‌্যাব-৮ সহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা কোরবানীর ঈদ নিয়ে তাদের প্রস্তুতির বিষয়ে অবহিত করেন।
সভায় অন্যান্যদের মাঝে ডিজিএফআই বরিশালের প্রধান কর্ণেল শরীফ, বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার গোলাম রউফ খান, উত্তম কুমার পাল, হাবিবুর রহমান খানসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অপরদিকে বেলা ১২ টায় পুলিশ লাইনের ড্রিল শেডে ঈদ উল আযহা উপলক্ষে স্থল ও নৌ পরিবহন মালিক সমিতির সাথে মতবিনিময় সভা করেছে রেঞ্জ পুলিশ। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল রেঞ্জ এর ডিআইজি শফিকুল ইসলাম। তিনি ঈদ যাত্রীদের নিñিদ্র নিরাপত্তা এবং যথাযথ সেবা প্রদানের জন্য বাস ও লঞ্চ মালিকদের আহ্বান জানান। সকল জেলা এবং উপজেলায় হাসপাতাল ও ক্লিনিক গুলোতে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে আসা যাত্রীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত এর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া গভীর রাতে লঞ্চে আসা যাত্রীদের গন্তব্যে পৌছে দিতে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে অতিরিক্ত বাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে বলেন তিনি। তাছাড়া চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সজাগ দৃষ্টি রাখতে বাস ও লঞ্চ মালিক সহ সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় অতিরিক্ত ডিআইজি আকরাম হোসেন, ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান, বরিশাল জেলার পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম, পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার মুশফিকুর রহমান, বরগুনার পুলিশ সুপার বিজয় বশাক, ভোলা জেলার পুলিশ সুপার মোক্তার হোসেন এবং পিরোজপুর জেলার পুলিশ সুপার ওয়ালিদ হোসেন সহ ৬ জেলার বাস ও লঞ্চ মালিক এবং তাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।