নানা সংকটে মা ইলিশ রক্ষায় ঢাকঢোল পেটানো কর্মসূচীর প্রয়োগ কম

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগে-পড়ের ১৫দিন ইলিশের প্রজনন মৌসুমে দেশের উপকূলীয় ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মাছ আহরণ সহ দেশব্যাপী ইলিশ পরিবহন ও বিপননে নিষেধাজ্ঞা এখনো পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। চলমান এ অভিযানে পুলিশ, কোষ্ট গার্ড ও নৌ বাহিনী সহ প্রশাসনের সহযোগিতায় মৎস অধিদপ্তর মা ইলিশ রক্ষায় নানামুখি অভিযান পরিচালনার কথা। মৎস বিজ্ঞানীদের সুপারিশের আলোকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৯অক্টোবর পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় ভাটি মেঘনার ভোলা ও লক্ষ্মীপুর জেলার মধ্যবর্তি ঢালচর, মনপুরা, মৌলভীর চর ও কালির চর এলাকার ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্রজনন ক্ষেত্রে হিসেবে সব ধরনের মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
কিন্তু এ বিশাল উপকূলীয় ঝঞ্ঝাট বিক্ষুব্ধ এলাকায় বর্তমান অশান্ত মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় সরেজমিনে যেকোন ধরনের অভিযান পরিচালনা করা যেমনি দুরুহ ব্যাপার তেমনি এজন্য প্রয়োজনীয় জনবল সহ নৌযান ও যানবাহনেরও ঘাটতি রয়েছে। যদিও মৎস অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগ সহ দেশের প্রায় সবকটি জেলা ও উপজেলার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবধরনের ছুটি বাতিল করেছে। কিন্তু অধিদপ্তরের পক্ষে এধরনের অভিযান পরিচালনা করার আইনগত কোন অধিকার নেই, তেমনি তাদের পক্ষে তা সম্ভবও না। কিন্তু এধরনের কর্মকান্ডে প্রশাসনের সহায়তায় আইনÑশৃংখলা বাহিনীকে কাজে লাগানোর মত সামর্থও নেই মৎস অধিদপ্তরের। এজন্য যেমনি প্রয়োজনীয় তহবিলের সংকট রয়েছে, তেমনি উপকূলীয় এলাকায় চলাচলাক্ষম টেকশই ও নিরাপদ নৌযান সহ অন্যান্য যানবাহনের সংকটও প্রকট। ফলে রাজধানী ঢাকা ও বরিশাল বিভাগীয় সদরে বসে যতটা ঢাকঢোল পিটিয়ে মা ইলিশ রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে ততটা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি মৎস অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় অফিসে মা ইলিশ রক্ষায় চলমান কর্মসূচীর বিষয়টি মনিটরিং করা হলেও তহবিল সংকটে বাস্তব কর্মকান্ড অনেকটারই অনুপস্থিত। বিভাগীয় উপ-পরিচালক কিছুটা দৌড়ঝাপ করলেও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খুব একটা হেলদোল নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে মাঠ কর্মীদের পক্ষ থেকে এ অভিযানে অংশ নেয়ার মত নৌযান সহ যানবাহনের সংকটের সাথে তহবিল সংকটের বিষয়টি জোড়ালভাবে শোনা যাচ্ছে। এমনকি পুলিশ ও কোষ্টা গার্ডের জন্য যে তহবিল বরাদ্ধ করা হয়েছে এ অভিযানে তাও সময়মত ছাড় করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের উপজেলাগুলোতে এ অভিযানের জন্য সর্ব সাকুল্যে বরাদ্ধ ৫০Ñ৬০ হাজার টাকা করে হলেও তার কোন অর্থ গতকাল পর্যন্ত ছাড়া হয়নি। বিভিন্ন উপজেলা মৎস কর্মকর্তাগণ ব্যক্তিগত তহবিল থেকে কিছু টাকা খরচ করে সীমিত অভিযান পরিচালনা করলেও কবে সে অর্থ পাবেন তা জানেন না। নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক একাধিক উপজেলা মৎস কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মা ইলিশ রক্ষার এ কার্যক্রমে নদ-নদী ও বাজার সমূহে অভিযান পরিচালনা করতে যে যানবাহন প্রয়োজন তা তাদের নেই। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন থেকে এসব যানবাহন সহায়তা নেয়া হলেও জ্বালানী দিতে হবে মৎস বিভাগকে। কিন্তু সে অর্থ ছাড় হয়নি এখনো। ফলে এসব অভিযান কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে ওয়াকিবাহাল মহলে।
অপরদিকে চলমান মা ইলিশ রক্ষায় ইলিশ আহরণ বন্ধের এ সময়ে ভোলা সহ কয়েকটি জেলায় আইন অমান্যকারী জেলেদের জেল-জরিমানার আদেশ প্রদান করা হয়েছে। তবে কোন কোন স্থানে জেলেদের ৬মাস পর্যন্ত জেল দেয়া হয়েছে। বিষয়টি মানিবক দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনার আর্জি জানিয়েছেন বিভিন্ন মানবধিকার কর্মী। তাদের মতে, ‘ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মা ইলিশ রক্ষায় বর্তমান সাময়িক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। তবে এর মধ্যে পেটের দায়ে সব প্রতিকূলতা নিয়ে যেসেব জেল নদীতে নামে, তাদের যদি ৬ মাস জেলে থাকতে হয়, তবে তার পরিবার পরিজনকে নিশ্চিত মানবিক বিপর্যয়ে ঠেলে দেয়া হবে’। গতকাল পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে পরিচালিত অভিযানে জেলেদের বিরদ্ধে ৩৩০টি মামলা দায়ের ছাড়াও ২৩ জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডাদেশ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৩০ হাজার টাকা জরিমানাও আদায় করা হয়েছে বলে বিভাগীয় মৎস অফিস সূত্রে জানা গেছে।
আমাদের মৎস সম্পদ সহ জাতীয় অর্থনীতিতে ইলিশ যথেষ্ট গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মৎস বিজ্ঞানীদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীন নদ-নদীতে মা ইলিশ সারা বছর জুড়েই কমবেশী প্রজনন করলেও আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগেÑপড়েই ৬০-৭০ ভাগ ইলিশ ডিম ছেড়ে থাকে। আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশের অবদান প্রায় ১২Ñ১৩%। এমনকি জিডিপি’তে এ মাছের একক অবদান ১%-এরও বেশি। গোটা বিশ্বে আহরিত ইলিশের ৫০Ñ৬০% উৎপাদন হচ্ছে বাংলাদেশে। ২০Ñ২৫% মায়নমারে এবং অবশিষ্ট ১০-১৫% ভারত আহরিত হয়ে থাকে।
ভাটি মেঘনার সাগর মোহনার ৪টি এলাকার ৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় প্রতিবছর আশ্বিনের বড় পূর্ণিমার আগে-পড়ে সাগর থেকে ছুটে আসা মা ইলিশ ডিম ছেড়ে আবার উপকূলীয় এলাকা সহ গভীর সমুদ্রের বিচরণস্থলে চলে যায়। অভিপ্রায়নি মাছ ইলিশ প্রতিদিন গড়ে ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত ছুটে চলে। মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর বিজ্ঞানীদের দাবী ২০১৩-এর আশ্বিনের পূর্ণিমার আগেÑপড়ের মোট ১১দিন আহরণ বন্ধ থাকায় প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ মা ইলিশ আহরণ থেকে রক্ষা পায়।
অপরদিকে গতবছর প্রজনন মৌসুমের ১১ দিনে আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়ে ১ কোটি ৬৩ লাখ মা ইলিশ আহরণ থেকে রক্ষা পায়। আহরণ থেকে রক্ষা পাওয়া এসব ইলিশ থেকে ১ কোটি ১৮ লাখ কেজি ডিম উৎপাদিত হয় বলে মৎস অধিদপ্তরের প্রকাশনায় বলা হয়েছে। ঐসময় সব ধরনের মৎস আহরন নিষিদ্ধ থাকায় ডিমের ৫০ভাগ পরিস্ফুটনের সুযোগ লাভ করলেও ইলিশ জনতায় ২ লাখ ৬১ হাজার ১০ কোটি রেনু উৎপাদিত হয়েছে বলে মনে করেন মৎস বিজ্ঞানীগণ। যার মাত্র ১০ ভাগও যদি বাঁচার সুযোগ লাভ করে, তবে ২৬ হাজার ১শ কোটি নতুন ইলিশ পেনা বা জাটকা ইলিশ সম্পদে যুক্ত হয়েছে বলে দাবী মৎস বিজ্ঞানীদের। যা ২০০৫ সালের তুলনায় ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২ ও ২০১৩ সালে যথাক্রমে ১৬৩%, ১৪৫%, ১৬০%, ১৮৯%, ১৯১%, ১৯৫% ও ২২৩% বেশী ছিল। গতবছর নি¤œ মেঘনায় কারেন্ট জালে ঘন্টায় প্রতি ১শ মিটারে ৩.০৪ কেজি পর্যন্ত জাটকা ধরা পরে।