নাগরিক সেবা বঞ্চিত নগরবাসী প্রশ্নবিদ্ধ আন্দোলন নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ প্রায় দেড়শ কোটি টাকা দেনা নিয়ে কর্পোরেশনে যোগ দিয়ে বেহাল অবস্থায় পড়েছে বর্তমান মেয়র সহ সিটি পরিষদ। একদিকে দেনা অন্যদিকে বরাদ্দের অভাবে বেহাল দশায় পড়েছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে না পেরে প্রতিদিনই নাজেহাল হচ্ছেন সিটি কর্পোরেশনের সিনিয়র কর্মকর্তাবৃন্দ। এমনকি সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল সহ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাও এক শ্রেণির কর্মচারীদের রোষানলের মুখে রয়েছেন। এমনকি কয়েক বছরের ব্যবধানে অনেকাংশে ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাড়াতে পারেনি আদায়ের হার। তার মধ্যেই আবার বকেয়া বেতন এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকার জন্য বিক্ষোভ শুরু করেছেন তারা। পাশাপাশি বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কেটে দিচ্ছে বৈদ্যুতিক সংযোগ। এসব মিলিয়ে এক কঠিন সংকট মোকাবেলা করতে গিয়ে অনেকটা হাপিয়ে উঠেছেন মেয়র আহসান হাবিব কামাল সহ বর্তমান সিটি পরিষদ।
এদিকে বকেয়া বেতনের দাবীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশ্নবিদ্ধ আন্দোলন নিয়ে নগরবাসীর মাঝে নানা প্রশ্নের জট বেধেছে। বিশেষ করে বেশিরভাগ কর্মকর্তারাই এই আন্দোলনে সায় দিচ্ছেন না। তাদের দাবি এই আন্দোলন অযৌক্তিক। সাবেক মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন এর আমলে বেতন বকেয়া সহ বিভিন্ন সংকট দেখা দিলেও তখন নিশ্চুপ ছিলেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তখনকার সময়ে নীরবতার কারনেই বর্তমান সময়ে মহা সংকটের সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের। অবশ্য তৎকালীন মেয়র এর আমলে বেতন ভাতার বাইরে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগকারীদের অবৈধ আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারাই সাধারন কর্মচারীদের ক্ষেপিয়ে তুলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে করে সাধারন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাভবান হওয়ার সুযোগ না থাকলেও সুবিধাবাদী কর্মকর্তারাই আছেন নতুন সুযোগের অপেক্ষায়।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানাগেছে, ২০১৩ সালের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র আহসান হাবিব কামাল সহ বর্তমান সিটি পরিষদ দায়িত্ব গ্রহন করেন। এর পূর্বে সিটি পরিষদের প্রধান এবং মেয়র ছিলেন প্রয়াত এমপি শওকত হোসেন হিরন। তিনি দায়িত্বে থাকাকালে নানা উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে বরিশাল নগরীকে একটি আধুনিক এবং সবুজ নগরীতে রূপান্তরিত করেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ায় তিনি মেয়র থাকাকালে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে বরাদ্দ ছিলো তুলনামুলক বেশি। বছর বছর বিলাসবহুল বাজেট ঘোষনার কালচার তিনিই চালু করেছিলেন। বিলাসবহুল আকাশচুম্বি বাজেট উন্নয়নবান্ধব হলেও হয়নি নগর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী বান্ধব। যে কারনে সেই থেকেই অর্থনৈতিকভাবে পেছনে পড়তে হয় বরিশাল সিটি কর্পোরেশনকে। তৎকালিন মেয়র শওকত হোসেন এর নেতৃত্বাধীন সিটি পরিষদের সদস্য এবং সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র আলতাফ মাহমুদ সিকদার, সাবেক প্যানেল মেয়র-২ আলহাজ্ব কেএম শহীদুল্লাহ, কাউন্সিলর সৈয়দ জাকির হোসেন জেলাল সহ অন্যান্য কাউন্সিলররাই এর বাস্তব স্বাক্ষী।
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র এর দায়িত্ব পালন করা বর্তমান কাউন্সিলর আলহাজ্ব আলতাফ মাহমুদ সিকদার এর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, মেয়র মো. আহসান হাবিব কামাল এর নেতৃত্বাধীন আমরা বর্তমান সিটি পরিষদ নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে দায়িত্ব গ্রহন করেছিলাম। প্রায় দেড়শ কোটি টাকা দেনার বোঝা মাথায় নিয়ে পথ চলা শুরু হয় আমাদের। আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছি তখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২ মাসের বেতন বকেয়া ছিলো। তাছাড়া সাবেক মেয়র এর আমল থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে রাখা টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা হতো না। আমরা বর্তমান পরিষদ যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম তখন বেতনের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ২২ মাসের টাকা জমা পড়েনি।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাই নয়, তৎকালীন মেয়র এর আমলেই বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের পাহাড় সৃষ্টি হয়। আমরা দায়িত্ব গ্রহনকালে দেখতে পাই তখনকার সময়ে ১৪ থেকে ১৫ মাসের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ছিলো। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহনের পরে পর্যাপ্ত ফান্ড এবং আদায় না থাকায় বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। বিধায় বর্তমানে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল এর পরিমান দাড়িয়েছে প্রায় ২৭ কোটিতে।
আলতাফ মাহমুদ সিকদার বলেন, বর্তমান সিটি পরিষদ দায়িত্ব গ্রহনের পরে এ পর্যন্ত বৃহৎ অংশে বিসিসি’র ব্যয় বেড়েছে। যেখানে শওকত হোসেন হিরন এর আমলে মাসে ব্যয় ছিলো এক কোটি ১০ লাখ টাকার মত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ব্যয়ের পরিমান বেড়ে বর্তমানে তা দাড়িয়েছে এক কোটি ৫০ লাখের কাছাকাছি। তাছাড়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে বর্তমানে প্রতি বছর ব্যয় হচ্ছে ৩৬ থেকে ৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে সর্বোচ্চ ২১ কোটি টাকার উপরে আদায় দেখাতে পারছেনা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তিনি বলেন, বিসিসি’র বিভিন্ন খাতে কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র হোল্ডিং ট্যাক্সই বকেয়া রয়েছে ১৫ কোটির টাকার বেশি। অর্থচ বকেয়া টাকা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মক্ষেত্রে অমনোযোগী এবং তাদের অবহেলার কারনেই বকেয়া টাকা আদায় হচ্ছে না বলে দাবী করেন তিনি। তারপরেও বিভিন্ন খাত থেকে সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া পরিশোধের চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে তিনি কয়েক মাসের বকেয়া এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের কয়েক কিস্তি টাকাও জমা দিয়েছেন। কিন্তু এর পরেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শান্ত হচ্ছে না।
বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের বিষয়ে সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র আলতাফ মাহমুদ সিকদার বলেন, আন্দোলন শুরুর পূর্বে গত বৃহস্পতিবার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে নগর ভবনে সমঝোতার চেষ্টা করেছি। না খেয়ে তাদের দাবী পুরনের জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকতে হয়েছে আমাদের। আন্দোলনকারীদের বলা হয়েছে আপাতত তাদেরকে বকেয়া এক মাসের বেতন এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৫টি কিস্তি জমা দেয়া হবে। বিভিন্ন খাতে থাকা বকেয়া আদায় করে সেই টাকা দিয়ে বাকি বকেয়া বেতন এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ জমা করে দেয়ার প্রস্তাব দেন মেয়র আহসান হাবিব কামাল সহ অন্যান্য কাউন্সিলররা। কিন্তু তা মেয়ে নেয়নি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের সিদ্ধান্ত ঠিক রাখতে সোমবার থেকে কর্মবিরতি দিয়ে নগর ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করছে। এতে করে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ জমে আছে। লেবাররা ধর্মঘটে থাকায় নগর ভবন ভিত্তিক সকল নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্ছিত হচ্ছেন নগরবাসী।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের ন্যায় কর্মবিরতি এবং অবস্থান ধর্মঘট শুরু হলে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মেয়র আহসান হাবিব কামাল এর পক্ষ হয়ে আন্দোলনকারীদের আশ্বস্থ করার চেষ্টা করেন ২১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র আলহাজ্ব আলতাফ মাহমুদ সিকদার, প্যানেল মেয়র আলহাজ্জ কেএম শহীদুল্লাহ, ২০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এসএম জাকির হোসেন। এসময় সাধারন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কিছুটা নিবৃত হলেও তাদেরকে উস্কানি নিয়ে পূনরায় খেপিয়ে তোলেন নগর পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা দীপক লাল মৃধা। এর ফলে তাদেরকে শুধু ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসাই নয়, নানা সংকটের কথা তুলে ধরতে গিয়ে নগর পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা দীপক লাল মৃধা ও তার সহযোগিদের কাছ থেকে অনেকটা লাঞ্ছনাও শুনতে হয়েছে কাউন্সিলরদের। তাদেরকে মেয়র এর দালাল বলে আখ্যায়িত করেন দীপক লাল মৃধা সহ তার অনুগত সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অথচ দীপক লাল মৃধা সহ কতিপয় কর্মকর্তারাই তৎকালিন আমলে সাবেক মেয়র এর কাছ থেকে নানা সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন। যে কারনে তখন বেতন ভাতা বকেয়া থাকলেও বিষয়টি তাদের গুরুত্বে আসেনি। কিন্তু বর্তমানে তাদের অবৈধ সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে নিজেদের আখের গোছাতে সাধারন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দৈনিক মজুরী ভিত্তিক কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন, মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে এক প্রকার অভুক্তই রয়েছেন। তাদের দাবি, আমাদের বেতন দিন, আমরা কাজে যোগদান করব। ক্ষুধা পেটে নিয়ে কাজ করা যায়না বলেও এই প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেন।