নববর্ষের ইলিশের পরিবর্তে তেলাপিয়া মাছ ক্রয়

জুবায়ের হোসেন॥ ইলিশের দামে দুই মাস তিন সদস্যের সংসার চলে আমার। একটি ইলিশের যে দাম তা আমার বাসা ভাড়ার থেকেও কিছুটা বেশি। আগ থেকেই মাছের বাজারে আসার সাহস পাচ্ছিলাম না, কিন্তু সন্তানের আবদার পূরনের জন্য এসেছিলাম। তবে এবারও পারব না। তাই ইলিশ সদৃশ্য অন্য মাছ কিনেই বাসায় ফিরতে হচ্ছে। ৩ বছরের মেয়ে আমার, ও বুঝবে না এগুলো ইলিশ নয়। তবে খুশি হবে অনেক। আসলে আমরা বাঙালি কিন্তু বাংলা নববর্ষ আমাদের জন্য নয়। কারণ এখনকার নববর্ষ উদযাপনের সামর্থ নেই আমাদের। এখন এটি পয়সাওয়ালাদের দিন। গতকাল রাতে নগরীর চৌমাথা মাছের বাজারে ইলিশ কিনতে এসে তেলাপিয়া মাছ কিনে যাওয়ার সময় হাসির ছলেই এমন ক্ষোভের কথা গুলো বলেন এক ভদ্রলোক। আলাপকালে জানায়, পেশায় তিনি একজন বিক্রয়কর্মী। নাম আনোয়ার হোসেন। নগরীর চকবাজারের এক তৈরি পোশাক বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন তিনি। তবে এমন ঘটনা তার একারই নয় এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে নগরের নি¤œ ও মধ্য আয়ের প্রায় মানুষ। যেখানে নববর্ষের আগমনের এই মানুষগুলোর নিজের আত্মসম্মানবোধ রক্ষার্থে হিমশিম খেতে হচ্ছে ঠিক একই সময় নানা আয়োজনে ব্যস্ত এই শহরে ধন্যাঢ্যরা। আয়োজনের মধ্যে রয়েছে শোভাযাত্রা, পান্তা ইলিশ, রংবেরংয়ের নতুন পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি। আর এজন্য ইতিমধ্যেই ব্যস্তও রয়েছেন তারা। বিশেষ করে তরুন তরুনীরা। নগরীর বিভিন্ন স্থানের পোশাক বিক্রেতাদের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়ই তার উজ্জ্বল প্রমান। ঐ সকল দোকানগুলোতে ঘুরে প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারীদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, বাংলা নববর্ষ প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্যই একটি বিশেষ দিন। এই দিনে পুরোনো বছরের সব হিসেব নিকেশ সমাপ্ত করে খোলা হয় নতুন হিসেব। হালখাতা উৎসব প্রতিটি
বাঙালী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান উৎসব। তাই ওই উৎসবের ব্যস্ততা তো রয়েছেই এর মধ্যে রয়েছে নববর্ষের পোশাক ক্রেতাদের ভিড়। সিংহভাগ ক্রেতাই হচ্ছে নারীরা। এর মধ্যে তরুনীরাই বেশি। এবার বৈশাখে রকমারি পোশাক বিক্রি হচ্ছে নারী পুরুষের। পুরুষদের বিভিন্ন ধরনের পাঞ্জাবী, ফতুয়া, টি-শার্ট এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও নারীরা কিনছেন রকমারি পোশাক। এবার পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নারীদের যে সকল পোষাক বেশি বিক্রি হচ্ছে এর মধ্যে রয়েছে, গোল কামজী সুতি কামিজ, কাপড়ের মধ্যে রয়েছে রাজ কোট, জোট কাতান, বেনারশি কাতান, সুতি এপলিক, সুতি ব্লক, তশর সিল্ক, ছোট মেয়েদের সুতি ব্লক ইত্যাদি। এ সকল পোশাক বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। ছেলেদের পোশাকগুলো ১ থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যেই বিক্রি হচ্ছে। শিশুদের পোশাকেরও রয়েছে বেশ চাহিদা। সেই পোশাকের জন্য হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হচ্ছে বলেও জানান তারা। তবে ক্রেতার কোন অভাব নেই। বেশির ভাগই উচ্চ বিত্ত শ্রেণির ক্রেতা আসছে জানিয়ে তারা আরও বলেন, এই দিনটি বাঙালীদের জন্য একটি বিশেষ দিন তাই সবাই চায় যার যার সাধ্য অনুযায়ী উদযাপন করতে। পহেলা বৈশাখের প্রধান আকর্ষন ইলিশের দুরাবস্থা নিয়ে চৌমাথা মৎস্য বাজারের মাছ ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, ইলিশ এখন সবার জন্য না। নি¤œ ও মধ্যবিত্তরা এখন পান্তা ইলিশ খাওয়ার শখ ত্যাগ করলেই ভাল। মাছ শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইলিশ এর দাম মণ প্রতি বেড়েছে ৬০-৭০ হাজার টাকা। বেশি দামে কেনা তাই বেশি দামেই বিক্রি করতে হয়। প্রতিদিন বাজারে ইলিশ কেনার আগ্রহে অনেক মানুষই আসেন তবে তারা দামের কাছে হার মেনে চলে যান। এখন শুধু উচ্চ বিত্তরাই পারবে সন্তানদের পান্তা ইলিশের শখ পূরণ করতে। অন্যদিকে নগরী জুড়ে বর্ষবরনে নানা আয়োজন থাকলেও দরীদ্র ও পথশিশুদের জন্য নেই কোন বিশেষ কিছু। এ সকল শিশুরা সবাই নামে চেনে পান্তা ইলিশ, তবে কখোনো চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তাদের। ধনিদের ছোড়া পান্তা ইলিশের উচ্ছিষ্টই হয়ত এবারো পূরণ করবে তাদের শখ। বাংলা বছর পরিবর্তন হয়ে ১৪২১ থেকে ১৪২২ এ পদার্পনের পথে। তবে বছর পাল্টালেও পাল্টাবে না দরিদ্রদের ভাগ্য, বরাবরের ন্যায় পূরণ হবেনা বর্ষপূতির আনন্দ নেয়ার শখ।