নগর ভবনে প্রহরীদের সাথে অটোরিক্সা শ্রমিকদের সংঘর্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক॥ ব্যাটারী চালিত অবৈধ অটোরিক্সা আটক করাকে কেন্দ্র করে সিটি কর্পোরেশন ও অটোরিক্সা শ্রমিকদের মধ্যে দফায় দফায় সংর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসময় অটোরিক্সা শ্রমিকরা আটককৃত ৩০টি অটোরিক্সা ছিনিয়ে নেয়ার পাশাপাশি সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও নগর ভবনে হামলা করেছে। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যায় দফায় দফায় এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ১১ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৬ জনকে শের-ই-বংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। এর পূর্বে র‌্যাব ও পুলিশ লাঠি চার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।
তবে নগর ভবনে শ্রমিকদের হামলা ও অটোরিক্সা ছিনতাই’র ঘটনাটি বিসিসি ও ট্রাফিক বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজসে পরিকল্পিত ভাবে করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। আহতরা হলো- বিসিসি’র নিরাপত্তা বাহিনীর সুপারভাইজার নিকর চন্দ্র দাস, নিরাপত্তা কর্মী সুজন হাওলাদার, মনির হোসেন, রফিকুল ইসলাম, সোহেল, সুজন (২), ও যানবাহন লাইসেন্স শাখার আব্বাস উদ্দিন, বরিশাল জেলা ও মহানগর ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা শ্রমিক কল্যান সংস্থার উপদেষ্টা মাসুদুর রহমান, সংস্থার সভাপতি মনিরুজ্জামান, সাধারন সম্পাদক লেদু সিকদার ও হাবিবুর রহমান। বিসিসি’র যানবাহন লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক মানিক জানান, নগরীতে বিভিন্ন ভাবে অবৈধ অটোরিক্সা চলাচল করছে। এগুলো বন্ধের জন্য একাধিকবার নোটিশ এবং মাইকিং করা হয়ে হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকরা লাইসেন্স বিহীন এবং নিষিদ্ধ পাঁচ ব্যাটারীর অবৈধ অটোরিক্সা বন্ধ না করে নগরীতে বহাল তবিয়তে যাত্রীবহন করছে। এর ফলে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনা বাড়ছে।
মানিক আরো বলেন, গতকাল সোমবার সকালে তারা অবৈধ অটোরিক্সা আটক অভিযানে নামেন। এসময় লঞ্চ ঘাট এলাকা থেকে বোরাক মডেলের ৩০টি অবৈধ অটোরিক্সা আটক করে নগর ভবনের সামনে এবং পেছনে গ্যারেজে রাখেন। এর কিছুক্ষন পরে বরিশাল জেলা ও মহানগর ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা শ্রমিক কল্যান সংস্থার উপদেষ্টা এবং আওয়ামীলীগ নেতা পরিচয়দানকারী মাসুদুর রহমান ও সংগঠনটির সভাপতি মনিরুজ্জামানসহ বেশ কয়েকজন নগর ভবনে এসে জোর করে অটোরিক্সা ছাড়িয়ে নিতে চায়। এসময় কর্পোরেশনের নিরাপত্তা কর্মীরা তাদের বাধা দিলে মাসুদ ও অন্যান্যরা তাকে দেখিয়ে দেয়ার হুমকি এবং আটক করা ৩০টি অটোরিক্সা ছিনিয়ে নেয়।
কর্মীদের বাধায় দুই পক্ষের মধ্যে সংর্ঘষ বাধলে বিবিসি’র নিরাপত্তা কর্মীরা মনির ও মাসুদকে মারধরের পরে নগর ভবনের মধ্যে তুলে নিয়ে আটকে রাখে। খবর পেয়ে অন্যান্য শ্রমিকরা নগর ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। তারা রাস্তা অবরোধ করে যানচলাচলের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে শ্লোগান দিতে থাকে।
লাইসেন্স শাখার তত্ত্বাবধায়ক মাঈনুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে কোতয়ালী মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে বিসিসি’র নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায় শ্রমিকদের হামলার পাশাপাশি নিরাপত্তা কর্মীদের উপরে লাঠি চার্জ করে পুলিশ। পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে গেলে ত্রিমুখী সংঘর্ষ বাধে। পুলিশ এবং শ্রমিকদের হামলায় বিসিসি’র নিরাপত্তা সুপারভাইজার সহ ৭জন কর্মী আহত হয় বলে জানান নিরাপত্তা সুপারভাইজার নিকর চন্দ্র দাস।
খবর পেয়ে বরিশাল র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (ব্যাব)-৮ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌছে শ্রমিক এবং নিরাপত্তা কর্মীদের ছাত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে তারা এ বিষয়ে প্রয়োজনিয় ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
অটোরিক্সা শ্রমিক কল্যান সংস্থার সভাপতি মনিরুজ্জামান জানান, সকালে বিসিসি’র নিরাপত্তা কর্মীদের নিয়ে যানবাহন লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক মানিক লঞ্চঘাট এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে ৩০টি লাইসেন্স বিহীন অটোরিক্সা (বোরাক) আটক কর্পোরেশনের সামনে নিয়ে রিক্সা প্রতি ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে। শ্রমিকরা জরিমানা না করার জন্য বললে বিসিসি’র নিরাপত্তা কর্মীরা উত্তেজিত হয়ে তাদের উপরে হামলা চালায়। এক পর্যায় সংগঠনের উপদেষ্টা মাসুদ সিকদারকে ধরে নিয়ে যায়।
কোতয়ালী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন জানান, অবৈধ অটোরিক্সা আটক করাকে কেন্দ্র করে শ্রমিক ও বিসিসি নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে সংর্ঘষ বাধে। পরে তারা এসে লাঠি চার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন।
বিসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিখিল চন্দ্র দাস জানান, নগরীতে লাইসেন্স বিহীন বহু অটোরিক্সা চলাচল করছে। অবৈধ অটোরিক্সা গুলো নগরীতে চলাচল না করার জন্য একাধিকবার মাইকিং এবং নোটিশ দেয়া হয়েছে। তার পরে শ্রমিকরা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অটোরিক্সা চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, সোমবার সকালে যানবাহন লাইসেন্স শাখা অবৈধ অটোরিক্সা আটক অভিযান চালায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শ্রমিকরা অভিযানকারীদের উপর হামলা চালায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে নগর ভবনে অটোশ্রমিকদের নিয়ে সমঝোতা বৈঠক করা হয়।
এসময় প্যানেল মেয়র-১ আলহাজ্ব কেএম শহিদুল্লাহ অটোরিক্সার লাইসেন্স প্রদানের জটিলতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে আগামী সপ্তাহে অটো মালিক, শ্রমিক এবং বিসিসি’র কর্তৃপক্ষের সাথ বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত হয়। শ্রমিকরা তা মেনেও নিয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে নগর ভবন থেকে তারা বাইরে বের হয়ে তৃতীয় দফায় বিক্ষোভের পাশাপাশি অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ করে দেয়। এমনকি নিজেদের অটোরিক্সায় এবং নগর ভবনের গেটে হামলা ভাংচুর করে। পুলিশকে সংবাদ দিলে তারা এসে পূনরায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।
শ্রমিকদের একাধিক সূত্র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে জানিয়েছেন, গতকাল সোমবার যে হামলার ঘটনা ঘটেছে তা পূর্বপরিকল্পিত ভাবে হয়েছে। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, নগর ভবনের কয়েক কর্মকর্তার ইন্ধনে এই ঘটনা ঘটেছে।
তারা উল্লেখ করে বলেন, বিসিসি লাইসেন্স প্রদান না করলেও ট্রাফিক বিভাগের টিআই এবং সার্জেন্টদের এক হাজার টাকা করে মাসিক বিট মানি দিয়ে অবৈধ অটোরিক্সা রাস্তায় চলাচল করছে। এজন্য ঐসব অবৈধ অটোরিক্সা রাস্তায় চলাচল করলে ট্রাফিক বিভাগের বাধার সম্মুখীন না হলেও তারা লাইসেন্সধারী বৈধ অটোরিক্সা মালিক ও শ্রমিকদের মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।
সূত্রগুলো আরো জানায়, পুলিশ যেসব অবৈধ অটোরিক্সা থেকে বিট মানি আদায় করে বৈধতার অনুমতি দিয়েছে সেই সব অবৈধ অটোরিক্সা আটক করে বিসিসি। এজন্য ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হয়ে যান। এরই অংশ হিসেবে পুলিশের উস্কানি এবং পরামর্শে গতকাল শ্রমিক নেতারা অতি উৎসাহী হয়ে নগর ভবনে শ্রমিকদের উপর হামলা এবং বিক্ষোভ করেছে বলে অভিযোগ সূত্রগুলোর।
শুধু তাই নয়, ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের টিআই এবং সার্জেন্টদের সাথে বিসিসি’র কিছু কর্মকর্তাদেরও যোগসাজস রয়েছে বলে জানিয়েছেন অটো শ্রমিকদের নেতৃত্বদানকারী বেশ কয়েকজন শ্রমিক নেতা। তারা বলেন, এক সময় সাবেক সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরন’র কাছ থেকে যেসব কর্মকর্তারা ব্যাপক ভাবে সুবিধাভোগ করেছিলেন সেই কর্মকর্তারাই এখন বর্তমান মেয়র আহসান হাবিব কামালের পেছনে লেগেছেন। তারা মেয়র আহসান হাবিব কামালের সুনাম ক্ষুন্ন এবং তাকে নগরবাসীর কাছে অযোগ্য প্রমান করতে একের পর এক কৌশল অবলম্বন করছে। গতকাল অটোরিক্সা শ্রমিকদের হামলা, আন্দোলন এবং বর্তমান মেয়রের পদত্যাগ চেয়ে শ্লোগান দেয়াও তাদের কৌশলের একটি অংশ বলে নিশ্চিত করেছেন শ্রমিক এবং নগর ভবনের কয়েকটি বিশ্বস্ত সূত্র।