নগরী জলাবদ্ধতার প্রধান অন্তরায় খাল ও জলাশয় দখল, ভরাট

রুবেল খান॥ একের পর এক পুকুর ভরাট আর খাল দখলই নগরীর জলাবদ্ধতার প্রধান কারন। সেই সাথে রয়েছে খালগুলোতে অপরিকল্পিত ব্রিজ এবং কালভার্ট নির্মান। আর এ কারনেই গত ক’দিনের প্রবল বর্ষনে জমে থাকা পানি নিস্কাশনে সৃষ্টি হচ্ছে বিলম্ব। গতকাল নগরীর বিভিন্ন খাল সরেজমিন পরিদর্শনে এসব তথ্য এবং চিত্র দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, গত কয়েকদিন যাবত নগরী সহ বরিশালের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। আর এ বৃষ্টিপাতের পরিমান রেকর্ড ভঙ্গ করে গত ৪৮ বছরের। যে কারনে খুব সহসাই নগরীর জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও নি¤œ অঞ্চল পানিতে ডুবে যায়। আর গৃহবন্দি হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার থেকে রাত-দিন ২৪ ঘন্টা চেষ্টা চালিয়েও নগরী থেকে জলাবদ্ধতা নিরসন করতে পারছে না নগর কর্তৃপক্ষ। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ড্রেন পয়ঃনিস্কাশন করলেও পানি নামছে না। এর কারন খুঁজে দেখতে গিয়ে বেরিয়ে আসে জলাবদ্ধতার প্রধান কারন। খাল, নদী দখল, পুকুর-জলাশয় ভরাট এবং অপরিকল্পিতভাবে ব্রিজ-কালভার্টই জলাবদ্ধতার মূল কারন হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখাগেছে, বরিশাল নগরীতে এক সময় বহু খাল এবং পুকুর ও জলাশয় ছিলো। কিন্তু সেগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। কেননা ঐসব খাল এবং জলাশয়ের বেশিরভাগই ভরাট হয়ে গেছে। তাছাড়া যেগুলো রয়েছে তাও দখলবাজরা অবৈধভাবে দখলে নিয়ে নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে। আবার ময়লা আবর্জনা ও বর্জ্রের ভাগারে পরিনত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খালের মুখগুলো। এ কারনে খালগুলো প্রায় মরতে বসেছে। যে কারনে ড্রেন থেকে পানিগুলো খাল পর্যন্ত পৌছালেও তা নদীতে পর্যন্ত পৌছাতে পারছে না।
আবার নগরীর জেল খালের কয়েকটি স্থানে নির্মান করা হয়েছে কালভার্ট। সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণ’র আমলে এসব কালভার্ড নির্মান করা হয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, যেকটি কালভার্ট নির্মান করা হয়েছে সেসব কালভার্টের নিচ থেকে পানি নামছে ধীর গতিতে। তাই এসব স্থান থেকে বর্ষায় জমে থাকা পানি খুব সহজেই নামছে না।
শুধু জেল খালই নয়, একই পরিস্থিতি দেখাগেছে নগরীর ভাটারখাল এবং চাঁদমারীর খালের। ভাটার খালটি সামনে থেকে দেখতে অনেক বড় দেখালেও জিলা স্কুলের মোড় থেকে এর আয়তন একেবারেই ছোট হয়ে গেছে। সার্কিট হাউসের পেছন থেকে খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মানের পর রাস্তা করায় সেখান থেকে ভালোভাবে পানি নামছে না। জমে থাকা পানি খুব দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে খালের উপরে রাস্তায় জমে থাকছে পানি।
এদিকে চাঁদমারী খালেরও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। এই খালটির একটি অংশ আটকে দেয়া হয়েছে বরিশাল নার্সিং কলেজের সামনে থেকে। সেখানে একাডেমিক ভবন নির্মান করায় খাল আটকে ড্রেনে রুপান্তর করা হয়েছে। এছাড়া খালটি ব্যপ্টিস্ট মিশন রোডের অংশ মরে গেছে বললেই চলে। কেননা এখানে ব্যপ্টিস্ট স্কুলের শিক্ষার্থী এবং সেখানে বসবাসকারীদের বর্জ্যে ভরাট হয়ে আছে সেখানকার খাল। শুধু তাই নয়, এর থেকেও করুন পরিনতি দেখা গেছে চাঁদমারীতে। স্টেডিয়ামের মূল ফটক থেকে শুরু করে কীর্তনখোলা নদী পর্যন্ত সম্পূর্ণ খাল দখল হয়ে আছে লাকড়ি আর গাছ ব্যবসায়ীদের কাছে। এরা খালের মধ্যে গাছ ফেলে রেখে পানি নিস্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে।
তাছাড়া পোর্ট রোড অংশে জেল খালের মুখ ফল, কাঁচাবাজার এবং মাছ ব্যবসায়ীদের ফেলা বর্জ্যে ভরে গেছে। এ কারনে সেখান থেকেও নামতে পারছে না নগরীতে জমে থাকা পানি।
আবার নগরীর বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে বেশ কিছু পুকুর জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। এক সময় এসব পুকুর জলাশয়ের সাথে ড্রেন সংযুক্ত ছিলো। কিন্তু সেগুলো ভরাট হওয়ায় আশাপাশের পানি নিস্কাশনের জায়গা পাচ্ছে না। এটাও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং পানি নিস্কাশন না হওয়ার অন্যতম কারন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন স্থানীয়রা। এক সময় কুলুকুলু শব্দে বয়ে যাওয়া চৌমাথা থেকে বটতলা বাজার পর্যন্ত নবগ্রাম খাল এখন সংকীর্ণ ড্রেনে পরিণত হয়েছে। খালের পুরোটা ভরাট করে সেখানে ছোট আকারে ড্রেন নির্মান করা হয়েছে। যার কারনে বটতলা, মুনসুর কোয়ার্টার, পুরানো পাসপোর্ট গলি, অক্সফোর্ড মিশন রোড, সার্কুলার রোড ও গোরস্থান রোডের মুখে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা গিয়েছে। গত তিন দিনেও এসব এলাকার পানি সরেনি।
তবে নগরীর থেকে একটু ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে নগরীর বর্ধিত এলাকায়। টিয়াখালী, নবগ্রাম, কালিজিরা, চরবাড়িয়া সহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব স্থানে পানি জমেছিলো। কিন্তু তা খুব অল্প সময়ে নেমে গেছে। সেখানে তেমন ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা সত্বেও দ্রুত পানি নিস্কাশনের কারন নদী এবং খাল। এসব এলাকাগুলোর আশপাশে পর্যাপ্ত খাল, পুকুর এবং জলাশয় থাকায় পানি জমে থাকছে না। তাই অতিসত্বর খাল দখলদার মুক্তর পাশাপাশি খনন ও পূনরুদ্ধারের দাবী জানিয়েছেন নগরবাসী। এটা সম্ভব হলে নগরবাসী জলাবদ্ধতা মুক্ত পাবে বলেও আশা ব্যক্ত করেছেন তারা।