নগরীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে বেড়েছে রোমিও-বখাটেদের উৎপাত

রুবেল খান ॥ নগরীর স্কুল কলেজ এলাকায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর রোমিও এবং ইভটিজার পাকরাও অভিযানে কিছুটা ভাটা পড়েছে। ফলে সেই সুযোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে ফের আড্ডা জমেছে রোমিও এবং বখাটে ইভটিজারদের। তাদের দ্বারা নানা ভাবে ইভটিজিং এবং যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা। এ নিয়ে প্রায়ই ঘটছে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা। সম্প্রতি মেধাবী ছাত্র সায়েদুর রহমান হৃদয় হত্যা কান্ডের পেছনেও রয়েছে ইভটিজিং এর ঘটনা। অথচ এক সময় নগরীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকাবার সাহসও পেতো না রোমিও এবং ইভটিজাররা। তখনকার সময়ে র‌্যাব, পুলিশ এবং গোয়েন্দা নজরদারী ছিলো চোখে পড়ার মতো। অভিযান চালিয়ে বহু রোমিও এবং ইভটিজারদের আটক করেন তারা। কিন্তু হঠাৎ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেই রোমিও পাকড়াও অভিযান বন্ধ হয়ে যাওয়া উৎকন্ঠায় দিন কাটাতে হচ্ছে ছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের।
জানা গেছে, নগরীতে সরকারি মহিলা কলেজের সংখ্যা একটি । তবে গার্লস স্কুলের সংখ্যা অনেক বেশি। বেশ কয়েকটি স্কুল এবং কলেজ রয়েছে যেখানে ছাত্র-ছাত্রী একই সাথে লেখা-পড়া করছে। স্কুল-কলেজ গুলোর সামনে ইদানিং রোমিও এবং বখাটেদের আনা গোনা চরম আকার ধারন করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলবব্ধ ভাবে অবস্থান নিচ্ছে তারা। ক্লাশ শুরু এবং ছুটির পূর্বে বিদ্যালয় গুলোর সামনে অবস্থান নিচ্ছে রোমিও এবং বখাটে ইভটিজার বাহিনী। পথে ঘাটে ছাত্রীদের প্রেম নিবেদন, হাত ধরে টানা হেচড়া এবং আপত্তিকর মন্তব্য করছে তারা। ফলে ছাত্রীদের স্কুল-কলেজ এবং কোচিংএ আসা যাওয়া এখন দায় হয়ে পড়েছে। শঙ্কায় থাকতে হচ্ছে তাদের অভিভাবকদেরও।
বিশেষ করে নগরীর বগুরো রোডে সরকারি গার্লস স্কুল, কালিবাড়ি রোডে স্ব¦রস্বতী স্কুল, বগুরা রোড এবং ফকিরবাড়ি রোডের সরকারি মহিলা কলেজ, আমতলার মোড়ে এআরএস গার্লস স্কুল, রূপাতলী এলাকায় এ ওয়াহেদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জাগুয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বান্দ রোডে ব্যাপ্টিস্ট মিশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, কাউনিয়া এ. কাদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় সহ জিলা স্কুলের বর্ধিত কলেজ ভবনের শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত (রূপাতলী) সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং শহীধ আরজু মনি (কাউনিয়া) সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সহ অনান্য স্কুল-কলেজের সামনে রোমিও এবং বখাটেদের আনাগোনা বেশি আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। এসব স্থানে মোটরসাইকেলে এসে ভাব জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে তারা। পাশাপাশি সুন্দরী মেয়ে দেখলেই আপত্তিকর মন্তব্য এবং প্রেম নিবেদন করছে। গায়ে ফুল এবং ইটের কুচি নিক্ষেপ, এমনকি হাত ধরে টানা হেচড়ার ঘটনাও ঘটাচ্ছে বখাটেরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে চা-সিগারেটের দোকানে ঘন্টার পরে ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে আড্ডা দিতে দেখা গেছে বখাটেদের। ছাত্রীদের দেখা মাত্রই ঝাপিয়ে পড়ছে তারা। সাথে বাবা-মায়েরা থাকলেও প্রতিরোধ করা যাচ্ছেনা তাদের। বাবা-মা এবং স্বজনদের সামনেই মেয়েকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করছে বখাটে রোমিওরা।
এদিকে সম্প্রতি নগরীর পরেশ সাগর মাঠে মেধাবী স্কুল ছাত্র সায়েদুর রহমান হৃদয় হত্যাকান্ডের জন্য ইভটিজিংকেই দায়ি করছেন সংশ্লিষ্টরা। তার সাথে বিরোধের সূত্রপাত ইভটিজিং থেকেই শুরু হয় বলে জানিয়েছেন তার সহপাঠিরা। তারা বলেন, হত্যাকারীরা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলো। তার পরেও তারা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাদ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে এসে আড্ডা দিতো। বিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রীকে প্রতিনিয়ত ইভটিজিং করতো তারা। এদের মধ্যে থেকে রাহাত নামের বখাটে ইভটিজার দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সেই ছাত্রী ছিলো হৃদয়ের বন্ধুর পছন্দের মেয়ে। যে কারনে বিষয়টি রাহাত এবং হৃদয়ের দ্বন্দ্বের কারন হয়ে দাড়ায়। সেই দন্দ থেকেই রাহাত এবং তার বখাটে সহযোগিরা হৃদয়কে একা পেয়ে নির্মম ভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।
স্কুলের শিক্ষার্থীরা বলেন, দীর্ঘ দিন ধরেই বখাটেরা দলবব্ধ ভাবে স্কুলের সামনে এবং পরেশ সাগর মাঠে আড্ডা দিতো। যা স্কুল কর্তৃপক্ষও জানতেন। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, দুটি স্কুল এক স্থানে থাকলেও সেখানে পুলিশের নজরদারীও তেমন ছিলো না। যে কারনে বখাটেরা নির্দিধায় স্কুলের আশপাশে আড্ডার পাশাপাশি ছাত্রীদের ইভটিজিং এবং প্রেম নিবেদন করতে সাহস পেয়েছে। প্রশাসনের টহল এবং নজরদারী থাকলে ইভটিজাররা আড্ডা দেয়ার সুযোগ পেতনা আর হৃদয় হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটনাত না বলে মন্তব্য করেন তার সহপাঠি শিক্ষার্থীরা।
এদিকে সরকারি মহিলা কলেজের বেশ কয়েকজন ছাত্রী অভিযোগ করে বলেন, তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ এবং বাইরের প্রধান পথ হলো আগরপুর রোড (সাংবাদিক মাঈনুল হাসান সড়ক)। এ সড়কটিতে কলেজ ছুটি এবং শুরুর সময় বহিরাগত ছেলেরা এসে আড্ডা দেয়। মেয়েদের দেখে নানা অশালিন মন্তব্য করে। বিশেষ করে ছুটির সময় এদের উৎপাত বেশি থাকে। চোখে সানগ্লাস, হাতে মোবাইল এবং মোটরসাইকেলে এসে নানা ভাবে সমস্যার সৃষ্টি করে মেয়েদের। তাছাড়া কলেজে প্রবেশ গেটের আশ পাশে চায়ের দোকানগুলোতেও চা পানের নামে আড্ডা জমাচ্ছে তারা। অথচ কলেজ শুরু কিংবা ছুটি কোন সময়েই পুলিশের টহল দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন মেয়েরা।
ঠিক একই ভাবে অভিযোগ করেছেন নগরীর বগুরো রোডের সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত বেশ কয়েকজন ছাত্রীর অভিভাবকরা। তারা বলেন, স্কুলের আশ পাশে চায়ের দোকান কিংবা খাবারের দোকানে বখাটেরা দাড়িয়ে থাকে। মেয়েদের নিয়ে স্কুলে আসা কিংবা নিয়ে যাবার সময় নানা ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য করে তারা। এমনকি অনেক অনেক সময় অভিভাবক সাথে থাকলেও তাদের সামনে বসেই প্রেম নিবেদন এবং মেয়েদের পেছনে পেছনে বাসা এবং স্কুল পর্যন্ত চলে আসে। অথচ মেয়েদের স্কুলের সামনে প্রশাসনের তেমন কোন নজরদারীর দেখা মিলছে না বলেও অভিযোগ অভিভাবকদের।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটা সময় নগরীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রোমিও এবং ইভটিজারদের উপরে বেশ নজরদারী রাখতো র‌্যাব, পুলিশ এবং ডিবি। মহিলা কলেজ এলাকা সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আড্ডা দেয়া অবস্থায় বখাটে ইভটিজার এবং রোমিওদের পাকরাও করেছিলেন তারা। প্রশাসনের এমন নজরদারীর কারনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে থেকে বখাটেদের উৎপাত কমে যায়। নির্দিধায় শান্তিপূর্ণ ভাবে মেয়েরা বিদ্যালয় এবং ক্যাম্পাসে আসতে পারতো। প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারনে মা-বাবারা তাদের মেয়েকে একাও আসতে দিতেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে চলছে পুরোই উল্টোটা। মা-বাবারা তাদের মেয়েকে স্কুল কলেজে একা ছাড়তেও ভয় পাচ্ছে। কেননা রাস্তায় হায়েনার মতোই ওৎ পেতে থাকছে বখাটে ইভটিজার এবং রোমিওরা। তাই পুণরায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনের নজরদারী এবং রোমিও পাকরাও অভিযান শুরুর দাবীও তুলেছেন শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা।