নগরীর গরুর মাংসের বাজার বিপর্যস্ত

সিদ্দিকুর রহমান ॥ ভারত সস্তায় চোরাই পথে অবাধে গরু পাঠিয়ে, দেশের খামারীদের গরু পালন বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছে। এখানকার ব্যবসায়ী ও কসাইদের ভারত নিজেদের গরুর উপর নির্ভরশীল করেছে। যখন তারা বুঝতে পারছে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের এদেশে গরুর মাংসের চাহিদা কমবে না। এদেশের ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে গরু না এলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে ভারত গরু পাচার বন্ধে কঠোর হয়েছে। গরু পাচার বন্ধ রাখা ভারতের কৌশল বলে অভিহিত করেছে নগরীর ব্যবসায়ী ও কসাইরা। এর কারন হিসেবে তারা জানান, সেদেশের প্রতিটি পরিবারে ও বড় বড় খামারে গরু পালন করা হয়। কিন্তু সেখানে দেবতার মর্যাদায় থাকা গরু জবাই ও মাংস ভক্ষন প্রায় রাজ্যেই নিষিদ্ধ। লাভের টাকার ষোল আনা পকেটে পুড়তে অভ্যস্ত ভারতীয়রা গরু মারা যাওয়ার পর দাহ বা দাফন করবে না। বিক্রি করে টাকা বা রুপীর জন্য কখনো গরু পাচার বন্ধ রাখতে পারবে না। আগের চেয়ে বেশি বা প্রায় দ্বিগুন দামে বিক্রি করার জন্য কঠোরতার কৌশল অবলম্বন করেছে। যার কারনে বাংলাদেশের মাংসের বাজারে গরুর সংকট দেখা দিয়েছে। এতে গরুর মাংসের কেজি প্রতি প্রায় ৩০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিক্রেতাদের দাবী। ব্যবসায়ীরা দেশীয় গরুর প্রতিপালন কম এবং ভারতীয় গরুর প্রতি নির্ভরশীলতার ফলে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছেও বলে জানিয়েছেন। এই কারনে নগরীর নতুন বাজার, বাজার রোড, পোর্ট রোড, চৌমাথা বাজার, চরকাউয়া খেয়াঘাট সংলগ্ন মাংসের দোকান ঘুরে ব্যবসায়ীদের চেহারায় ক্ষতি ও ব্যবসা বন্ধের ছাপ দেখা গেছে। প্রায় বাজারে মাংস শূন্য দোকান খুলে বসে থাকতে দেখা গেছে তাদের।
নতুন বাজারের মাংস ব্যবসায়ী মাকসুদা বেগম জানান, এক সপ্তাহ আগে কেজি প্রতি গরুর মাংস ৩০০-৩২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি। হঠাৎ ভারতীয় গরু আমদানি বন্ধ হওয়ার খবর শুনে মাথায় হাত উঠে গেছে। তিনি জানান, দেশীয় গরুর মাংস বিক্রি করে সংসার চালানো যায় না। ভারতীয় গরুর মাংস বিক্রি করে সংসারের ভরণ পোষণ করেন। বর্তমানে গরু আমদানি বন্ধ হওয়ায় দেশী গরু দ্বিগুন হওয়ায় বিক্রি করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। দেশী গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করতে হওয়ায় বর্তমানে কেজি প্রতি ৩০-৫০ টাকা বেশি দাম নিতে হচ্ছে। এইরকম অবস্থা চললে মাংসের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশংকা করছেন তিনি।
অন্যদিকে চরকাউয়া খেয়াঘাট সংলগ্ন মাংস ব্যবসায়ী রুস্তুম হাওলাদার একই অভিযোগ করে বলেন ভারতীয় গরু আমদানি না হওয়ার ফলে দোকান ১ দিন খোলা হলেও ৩ দিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। যার কারনে এই প্রভাব পড়ছে আমাদের সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে। তিনি বলেন বাংলাদেশের গরু পালন বেশি হলে এবং অন্য দেশের প্রতি নির্ভরশীল না হলে আজ আমাদের এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হত না। আগে কেজি প্রতি ৩২০ টাকা বিক্রি করলেও বর্তমান গরুর সংখ্যা কম হওয়ায় তা এখন ৩৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। যার ফলে ক্রেতাদের সাথে প্রায়ই তর্কের সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়াও দ্বিগুন দামে ক্রয়ের ফলে ও লাভতো হচ্ছেই না বরং সব সময় ক্ষতির শংকা বিরাজ করছে।
এদিকে নি¤œবিত্ত সাধারন আয়ের মানুষরা জানান, ভারতীয় গরু আমদানি বন্ধের ফলে মাংসের দাম যে পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে বেশি দূরে নয় যেদিন নি¤œ বিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয় ক্ষমতার উর্ধ্বে চলে যাবে।
জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা একরামুল করীম চৌধুরী জানান, ভারতীয় গরুর প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও এদেশে কোন ধরনের প্রভাব সৃস্টি হবে না। কারণ হিসেবে জানান, ভারতীয় গরু আসা বন্ধ হলে এদেশের কৃষকরা গরু প্রতিপালনে এগিয়ে আসবে। এতে ক্ষতি পুষিয়ে এদেশ থেকে গরু রপ্তানি করা যাবে না।
এছাড়াও প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের বর্তমান অবস্থায় গরু উৎপাদন স্বয়ংসম্পূর্ন রয়েছে। তারপরেও কোন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হলেও তা দূর করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহনে মন্ত্রনালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দেশের সাধারন খামারীদের গরু প্রতিপালনে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতিনিয়ত কর্মশালা হচ্ছে।
এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধ হলে ভারত সরকারের বছরে ৩১ হাজার কোটি রুপি বাড়তি খরচ হবে। গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতে বিভিন্ন পশু খামারে থাকা কোটি কোটি গরু স্বাভাবিক ভাবে মারা না যাওয়া পর্যন্ত লালন পালন করতে ওই টাকা ব্যয় হবে। ভারতীয় গরু সাধারণত ১৫-২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। মৃত্যুর ৫ বছর পূর্বে গরু দুধ দেয়া বন্ধ করে দেয়। দেবতা তুল্যে এসব গরু না মরা পর্যন্ত মেরে ফেলবে না। এতে খামার ব্যবস্থাপনা, খামার কর্মীদের বেতন, পশুর খাবার ও চিকিৎসা খরচ প্রতিটির জন্য বছরে প্রায় ২৫ হাজার রুপি বেড়ে যাবে। তা ভারতের খামারীরা মেনে নেবে না। ভারত থেকে বছরে প্রায় ২৫ লাখ গরু অবৈধ ভাবে এদেশে প্রবেশ করছে। কঠোরতায় একটু কম হবে কিন্তু বন্ধ হবে না। এই তথ্য জানার পর ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ সরকারকে ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ রাখতে কঠোর হয়ে দেশে গরু পালনে নানা উদ্যোগ গ্রহনের আহবান জানিয়েছেন। এতে ভবিষ্যতে কখনও সমস্যায় পড়তে হবে না বলে মন্তব্য করেছেন গরু ব্যবসায়ী ও কসাইরা।