নগরীর আবাসিক হোটেলে খুন হওয়া নাঈমা এ গ্রেড পেয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ সন্তানের সাফল্যে গর্বিত হয়না এমন পিতা মাতা হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। পড়াশুনা চলাফেরায় একের পর এক সাফল্য সন্তান লাভ করলেও তাতে বুক ফুলিয়ে গর্বিত হয় অভিভাবকরা। তাদের এই গর্ব ভুলিয়ে দেয় শত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে কোলে পিঠে করে সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করার চেষ্টার অতিতগুলোকে।
অভিভাবকের সব কষ্ট তখন তুচ্ছ হয়ে যায় সন্তানকে জীবনে সাফল্যের চরম শিখরে দেখার সুখের কাছে। কিন্তু নিয়তির পরিহাস যখন এই সাফল্যকেই পিতা মাতার গ্লানির কারনে পরিনত করে তখন তা সৃষ্টি করে এক নির্মম দৃশ্যপটের। যা হয়ত নাড়া দেবে প্রতিটি সচেতন পিতা মাতা ও প্রকৃতপক্ষে সাফল্যের সিড়ি বেয়ে উপরে ওঠার প্রবল ইচ্ছা শক্তিসমৃদ্ধ সন্তানের মনে। তবে এই সাফল্যই আজ এক পরিবারের কাছে ফের লজ্জার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
যখন দেশের হাজারও পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের এইচএসসির ফলাফলে উচ্ছাসিত ও আনন্দিত, তখন নগরীর এক অসহায় পিতামাতা ফলাফল জানানোর লজ্জায় ছিল আত্মগোপনে। যে সন্তানের ফলাফলের আনন্দে আজ তাদের আনন্দিত হওয়ার কথা সেই সন্তানের কারণেই আজ মানুষের কাছে তারা লজ্জার পাত্র। নগরীর একটি আবাসিক হোটেলে হত্যা বা আত্মহত্যার অনিশ্চয়তায় থাকা হাতেম আলী কলেজে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা ছাত্রী নাঈমা ইসলামের পরিবারে ছিল আজ শুধুই হতাশা।
কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে নাঈমা ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে। তার এই ফলাফল পরিবার কোনভাবে জানলেও বাসভবনের দরজা আটকে তা লুকানোর চেষ্টা করেছে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশি সকলের কাছ থেকেই। মিষ্টি বিতরণের এই দিনে সন্তানের কারণেই হয়ত কেঁদেছেন সকলের আড়ালে।
গত ১০ আগস্ট বুধবার বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ের ক্লাসে অংশগ্রহণের কথা বলে চলে যায় নাঈমা। সেখান থেকে আর বাসায় ফেরা হয়নি একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার স্বপ্ন নিয়ে চলা এই তরুণীর। ফলপট্টির একটি আবাসিক হোটেল থেকে রহস্যজনকভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় তার লাশ। ঘাতক হিসেবে সায়েম আলম নামের একজনকে সন্দেহ করা হলেও আটক করা যায়নি কাউকেই। এদিকে নাঈমার পরিবার থেকে নির্দিষ্ট কাউকে শনাক্ত করে মামলা না করা হলেও হয়েছে একটি অপমৃত্যুর মামলা। গত বৃহস্পতিবার তার বাবা নগরীর গোরস্থান রোডের বাসিন্দা ইব্রাহিম খান বাদি হয়ে মামলাটি করেন।
গতকাল দেশব্যাপি এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। সেই ফলাফলে ছিল মৃত নাঈমার ফলাফলও। তবে তা আগ্রহ নিয়ে দেখতে যায়নি কেউই। পরিবারের সদস্যরা জেনেছে কোনভাবে তার বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে। হয়ত তারা জানতেও চাননি, কাউকে জানাতেও চাননি। লজ্জায়, কষ্টে নিজেদের পুরোনো ফোন নাম্বার গুলো পরিবর্তন করেছে তারা। নাঈমার ফলাফল জানতে গতকাল তার গোরস্থান রোডস্থ বাসভবনে যাওয়া হলে প্রতিবেশিরা জানান বিষয়গুলো।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টার প্যারাগনে গেলে বিজ্ঞান বিভাগের এই মেধাবী ছাত্রীর কোন তথ্য তাদের কাছে নেই বলে জানান তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘ক’ ইউনিটের জন্য কোচিংয়ে অংশ নেয়া নাঈমার সব তথ্য গোয়েন্দা বিভাগ তার মৃত্যুর পর নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে তারা। পরে সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষকের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, নাঈমা ইসলাম এ গ্রেড পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ক্লাসে মেধাবী ছাত্রী নাঈমার ভাল ফলাফলের কথা তারা আগে থেকেই ধারণা করেছিলেন।
তবে অনাকাক্সিক্ষত এই ঘটনা এমন একটি তাজা প্রাণকে কেড়ে নিবে তা ভাবেননি কখনও। তাই আজ নাঈমার ভালো ফলাফল ফের কাঁদিয়েছে তার স্বজনদের। হয়ত তার এমন অস্বাভাবিক মৃত্যুতে তৈরি হওয়া লজ্জা ও গ্লানি সকলের আড়ালেই রেখেছে সেই চোখের পানিকে। হয়ত তারা বুকফাটা কষ্ট আড়াল করে বারবার একটি বার্তা দিতে চেয়েছে, আর যেন কোন মেয়েকে নাঈমার মত বয়সের ভুলে ঝরে যেতে না হয়।